আফ্রিকার অন্যতম দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত থামাতে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ শুরু হলেও কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে এখনো সহিংসতা থামেনি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া “ওয়াশিংটন অ্যাকর্ডস” নিয়ে শুরুতে আশার আলো দেখা গেলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো ভয়াবহ। হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর দখল বিস্তৃত হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষের জীবন ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে।
গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রুয়ান্ডা ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের নেতাদের এক টেবিলে বসিয়ে শান্তি চুক্তিতে সম্মত করান। বহু বছর ধরে চলা সংঘাত বন্ধে এটিকে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাস না যেতেই স্পষ্ট হয়ে যায়, যুদ্ধ থামানো এত সহজ নয়।
সংঘাতের কেন্দ্রে পূর্ব কঙ্গো
কঙ্গোর পূর্বাঞ্চল বহু বছর ধরেই অস্থিতিশীল। সেখানে সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, আর সেই সুযোগে শতাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এম২৩ বিদ্রোহী গোষ্ঠী, যাদের বিরুদ্ধে রুয়ান্ডার সমর্থন পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এই গোষ্ঠী বর্তমানে উত্তর ও দক্ষিণ কিভুর বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এলাকাটিতে তারা কার্যত আলাদা প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। অনেক পরিবার নিরাপত্তাহীনতার কারণে এখনো নিজ বাড়িতে ফিরতে পারছে না।
খনিজ সম্পদ ঘিরে নতুন উত্তেজনা
বিশ্লেষকদের মতে, কঙ্গোর বিপুল খনিজ সম্পদ এই সংঘাতকে আরও জটিল করেছে। কোবাল্ট, তামা ও অন্যান্য মূল্যবান খনিজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর আগ্রহও বেড়েছে।
সমালোচকদের একাংশের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি খনিজ সম্পদে বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করতেও আগ্রহী। ট্রাম্প প্রশাসন কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট ফেলিক্স শিসেকেদির সঙ্গে একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খনিজ খাতে বিশেষ সুযোগ তৈরির আলোচনা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

রুয়ান্ডার ওপর চাপ, কিন্তু যথেষ্ট নয়
যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে রুয়ান্ডার সেনাবাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট পল কাগামেকে এম২৩–এর প্রতি সমর্থন কমাতে চাপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রুয়ান্ডার ভাবমূর্তির ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
তবে শুধু রুয়ান্ডার ওপর চাপ দিলেই পরিস্থিতির সমাধান হবে না বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কারণ এম২৩ এখন অনেকটাই স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে কাজ করছে। কাতারের মধ্যস্থতায় কঙ্গো সরকার ও এম২৩–এর মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখন স্থবির অবস্থায় রয়েছে।
নিরপেক্ষ ভূমিকার প্রশ্ন
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই এই সংঘাতের স্থায়ী সমাধান চায়, তাহলে তাকে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকতে হবে। কেবল একটি পক্ষকে সমর্থন দিলে শান্তি প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

কঙ্গোর রাজনীতিতেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিরোধী নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনাকে অনেকেই রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন। এতে করে কঙ্গোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্য আরও নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
শান্তির আশা এখনো আছে
সব জটিলতার পরও কূটনৈতিক উদ্যোগ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়নি। মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, সীমান্ত উত্তেজনা কমানো এবং যুদ্ধবিরতির আলোচনাকে আবারও সচল করার চেষ্টা চলছে। তবে বাস্তব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু চুক্তি নয়, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা জরুরি হয়ে উঠেছে।
কঙ্গোর মানুষ এখনো অপেক্ষায় আছে এমন এক ভবিষ্যতের, যেখানে যুদ্ধের পরিবর্তে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ফিরে আসবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















