এশিয়ার অন্যতম বড় অর্থনীতি ইন্দোনেশিয়া আবারও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা বাড়ছে দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর নীতিকে ঘিরে। বাড়তি সরকারি ব্যয়, জ্বালানি ভর্তুকি, রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং দুর্বল আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে দেশটির ভেতরে ও বাইরে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৯৮ সালের এশীয় অর্থনৈতিক সংকটের ভয়াবহতা কাছ থেকে দেখার পরও প্রাবোও যেন সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারছেন না। সেই সংকটেই ক্ষমতাচ্যুত হন তার শ্বশুর ও সাবেক শাসক সুহার্তো। অথচ এখনকার পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও এমন কিছু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা আবারও বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
সরকারি ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ
প্রাবোও সরকারের সবচেয়ে আলোচিত দুটি প্রকল্প হলো বিনামূল্যে স্কুল খাবার কর্মসূচি এবং ৮০ হাজার গ্রামীণ সমবায় গড়ে তোলার পরিকল্পনা। এই দুই প্রকল্পেই জাতীয় বাজেটের বড় অংশ ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও তেলের দামের অস্থিরতার মধ্যে এই ব্যয়কে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন।

অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, সরকার যদি ব্যয় কমাতে না পারে, তাহলে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। ইন্দোনেশিয়ায় আইনি সীমা অনুযায়ী বাজেট ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ শতাংশের মধ্যে রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সীমা ভাঙার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমছে
ইতোমধ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। গত কয়েক মাসে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি মূলধন দেশ ছেড়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইন্দোনেশিয়ার মুদ্রা রুপিয়াহর মানও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজেট ঘাটতির সীমা ভাঙা হলে ঋণের সুদ আরও বেড়ে যেতে পারে এবং আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থাগুলো দেশের ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দিতে পারে। এতে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে।
গণতন্ত্র নিয়েও প্রশ্ন
অর্থনৈতিক উদ্বেগের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিস্থিতিও সমালোচনার মুখে পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রাবোও প্রশাসন ধীরে ধীরে বিরোধী কণ্ঠ সীমিত করছে। আইনসভায় বিরোধীদের প্রভাব কমে গেছে এবং আঞ্চলিক গভর্নরদের সরাসরি নির্বাচন বন্ধের মতো প্রস্তাবও সামনে এসেছে।

সমালোচকদের মতে, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের ওপর চাপ বাড়লে ভিন্নমত প্রকাশের পথ সংকুচিত হয়। আর সেই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে।
জ্বালানি ভর্তুকি বড় চ্যালেঞ্জ
ইন্দোনেশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানিতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়া হয়। এতে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পেলেও অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার বাড়ছে। বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সময়ে এই ভর্তুকি সরকারকে বড় আর্থিক চাপে ফেলছে।
এ ছাড়া সবার জন্য বিনামূল্যে খাবার কর্মসূচির বদলে দরিদ্র পরিবার, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের লক্ষ্য করে সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। এতে কম খরচে বেশি কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নতুন মোড়ে ইন্দোনেশিয়া
গত ২৫ বছরে ইন্দোনেশিয়া অর্থনীতি ও গণতন্ত্র—দুই ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও তুলনামূলক শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অর্জন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বহুজাতিক ও বিস্তৃত একটি দেশকে কেবল কঠোর নিয়ন্ত্রণে চালানো সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে সরকারকে সমালোচনা শোনা, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















