বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে আপাত শান্ত পরিবেশ দেখা গেলেও বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই স্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিশ্ববাজারে ইতোমধ্যে ইতিহাসের অন্যতম বড় তেল সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে, আর এর প্রভাব আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করা হচ্ছে।
বর্তমানে বিশ্বের বার্ষিক তেল সরবরাহের প্রায় ৫ শতাংশের সমপরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিদিন আরও প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা থমকে যাওয়ায় দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনাও কমে গেছে।
তবুও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আশঙ্কার তুলনায় অনেকটা স্থির রয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৫ ডলারে নেমে এসেছে, যা এপ্রিলের প্রায় ১২০ ডলারের উচ্চতা থেকে কম। এমনকি ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর সময়কার সর্বোচ্চ দামের চেয়েও এটি নিচে অবস্থান করছে।

অস্থায়ী স্বস্তির পেছনে দুই বড় শক্তি
বিশ্লেষকদের মতে, এই সাময়িক স্বস্তির পেছনে মূল ভূমিকা রাখছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের তুলনায় দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল বেশি তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি করছে। দেশটির কৌশলগত তেল মজুত ব্যবহার এবং দ্রুত সরবরাহ সক্ষমতা বিশ্ববাজারকে কিছুটা স্থিতিশীল রেখেছে।
অন্যদিকে চীন আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল কম তেল আমদানি করছে। উচ্চমূল্যের কারণে জ্বালানির চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশটির সরকার স্থানীয় মজুত ব্যবহারে জোর দিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ সাময়িকভাবে কমেছে।
গরিব দেশগুলোতে জ্বালানি রেশনিং, বাজারে নতুন চাপ
অনেক দরিদ্র দেশ ইতোমধ্যে জ্বালানি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। এই চাহিদা কমে যাওয়াও বাজারকে কিছুটা শান্ত রেখেছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এই ভারসাম্য ভেঙে পড়বে।
বিশ্ব তেল মজুত দ্রুত কমে আসছে। যুদ্ধ শুরুর সময় যেসব দেশ বড় মজুত নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছিল, সেগুলোর রিজার্ভও জুনের মধ্যে বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে। সমুদ্রপথে সংরক্ষিত অতিরিক্ত তেলের মজুতও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

ডিজেল ও জেট জ্বালানিতে বাড়ছে সংকট
বিশেষ করে পরিশোধিত জ্বালানি যেমন ডিজেল, পেট্রোল ও জেট ফুয়েলের সংকট আগে থেকেই স্পষ্ট হচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন দেশে রিফাইনারির উৎপাদন কমে যাওয়ায় এসব জ্বালানির মজুত দ্রুত কমছে।
ফলে অদূর ভবিষ্যতে এসব জ্বালানির দাম হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে যেতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য রক্ষা করতে বাজারকে আরও উচ্চমূল্যের দিকে যেতে হতে পারে।
চীনের বাজারে ফেরা ও ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্ববাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে চীনের সম্ভাব্য অবস্থান পরিবর্তন। দেশটির হাতে বিপুল পরিমাণ তেল মজুত থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে তারা সেই মজুত পুরোপুরি ব্যবহার করতে চাইবে না। ফলে চীন আবার আন্তর্জাতিক বাজারে বড় পরিসরে তেল কিনতে শুরু করলে দামের ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। দেশটির বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন তেল রপ্তানি সীমিত বা নিষিদ্ধ করার পথে যেতে পারে বলে আলোচনা চলছে। এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক বাজারে বড় ধাক্কা লাগবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও দ্রুত বাড়বে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোও আমদানিনির্ভর হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে চাপ তৈরি হবে।
বিশ্ব অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়
বর্তমানে জ্বালানি বাজারে যে শান্ত পরিবেশ দেখা যাচ্ছে, তা অনেকটাই সাময়িক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখনো বড় ঝড়ের মধ্যেই রয়েছে। ভুল নীতি বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি ব্যাঘাত এবং বড় অর্থনীতিগুলোর একতরফা পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলেও সতর্ক করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















