ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর নেতৃত্বে দেশটির রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একদিকে বিশাল জনকল্যাণমূলক প্রকল্প, অন্যদিকে বাড়তে থাকা বাজেট ঘাটতি, সেনাবাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধি এবং বিরোধী রাজনীতিকে দুর্বল করে দেওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতিকে ঘিরে বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
প্রাবোও কখনও নিজেকে গণতন্ত্রের সমর্থক হিসেবে তুলে ধরছেন, আবার কখনও বিদেশি শক্তি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে তীব্র অবস্থান নিচ্ছেন। সমালোচকদের মতে, এই দ্বৈত অবস্থান ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক সংস্কারকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে
প্রাবোও সরকার স্কুলশিশুদের জন্য বিনামূল্যে খাবার কর্মসূচি এবং গ্রামভিত্তিক কৃষি সমবায় গড়ে তোলার মতো বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এসব উদ্যোগের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় আয়ের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। একই সময়ে কয়লা, নিকেল ও পাম তেলের দামের পতনে কর আদায় কমে গেছে।

গত বছরের বাজেট ঘাটতি দেশটির ইতিহাসে অন্যতম বড় ঘাটতিতে পৌঁছেছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ঋণের পরিমাণ এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে, তবে ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই ধারা চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক ঋণমান কমে যেতে পারে।
তেলের বাজারেও নতুন চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সরকারকে ভর্তুকিতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে বাজেট ঘাটতি আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরকার ব্যয় কমাতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিনামূল্যের খাবার কর্মসূচির সময় কমানো হয়েছে এবং ভর্তুকিযুক্ত জ্বালানি ব্যবহারে সীমা আরোপ করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ বড় সংকট মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।
ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের অভিযোগ

প্রাবোও সরকার সংসদের অধিকাংশ দলকে নিজেদের জোটে নিয়ে এসেছে। ফলে কার্যকর বিরোধী দল প্রায় নেই বললেই চলে। সমালোচকদের মতে, এটি গণতান্ত্রিক ভারসাম্য দুর্বল করছে।
প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে যে বিরোধী রাজনীতি ইন্দোনেশিয়ার সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না। তিনি সহযোগিতামূলক রাজনীতির কথা বললেও বিরোধীরা মনে করছে, এটি মূলত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার কৌশল।
সেনাবাহিনীর বাড়তি ভূমিকা
প্রাবোও একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা হওয়ায় তার আমলে সামরিক বাহিনীর প্রভাব বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি কর্মচারীদের সামরিক প্রশিক্ষণে পাঠানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে সেনাবাহিনীকে যুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া নতুন আইনের মাধ্যমে কর্মরত সেনা কর্মকর্তাদের বেসামরিক পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে অনেকের মধ্যে সাবেক শাসক সুহার্তোর আমলের স্মৃতি ফিরে এসেছে, যখন সেনাবাহিনী প্রশাসনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করত।
অতীতের ছায়া

প্রাবোওর অতীতও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সুহার্তোর শাসনামলে বিরোধী কর্মীদের অপহরণের অভিযোগে তিনি একসময় সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। যদিও পরে তিনি রাজনীতিতে ফিরে আসেন এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
সমর্থকদের দাবি, তিনি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তববাদী এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই কাজ করছেন। তবে সমালোচকদের মতে, তার বর্তমান পদক্ষেপগুলো ধীরে ধীরে ইন্দোনেশিয়াকে আবারও কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতোমধ্যেই অস্বস্তি বাড়ছে। দেশটির মুদ্রার মান কমেছে এবং বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়লে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে।
একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের অসন্তোষও বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি, চাকরি সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নতুন বিক্ষোভের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পর্যবেক্ষকদের মতে, ইন্দোনেশিয়া এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক পরিবর্তন একসঙ্গে বড় অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















