দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেলেও পাকিস্তানের বড় একটি জনগোষ্ঠী এখনও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়ে গেছে। দেশটির জনসংখ্যা ২৪ কোটির বেশি, স্মার্টফোন ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে এবং ডিজিটাল অবকাঠামোও উন্নত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে এখনও বড় ঘাটতি রয়েছে।
স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৫৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এখনও আর্থিক সেবার বাইরে। একই সঙ্গে মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষের আনুষ্ঠানিক ঋণসুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনও নগদ লেনদেন, অনানুষ্ঠানিক ঋণ এবং কম কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
ডিজিটাল লেনদেনে অগ্রগতি
গত এক দশকে পাকিস্তানে ডিজিটাল আর্থিক সেবায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিশেষ করে ব্রাঞ্চলেস ব্যাংকিং, পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর, ইলেকট্রনিক মানি ইনস্টিটিউশন এবং ডিজিটাল রিটেইল ব্যাংকিং কাঠামো চালুর মাধ্যমে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ‘রাস্ত’ নামের রিয়েল-টাইম পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সহজ করেছে।
বর্তমানে পাকিস্তানের খুচরা লেনদেনের প্রায় ৮৮ শতাংশই ডিজিটাল মাধ্যমে হচ্ছে। ‘রাস্ত’ প্ল্যাটফর্ম চালুর পর থেকে ৪৪ ট্রিলিয়ন রুপির বেশি লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, এই ডিজিটাল অগ্রগতি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পেরেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের ডিজিটাল ব্যাংকিং মূলত পেমেন্টকেন্দ্রিক ছিল। অর্থাৎ, কত মানুষ ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার করছে বা কত পরিমাণ লেনদেন হচ্ছে, সেটিকেই সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়েছে। কিন্তু কেবল অর্থ পাঠানো বা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হলেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয় না।
ঋণ ও অর্থনৈতিক সুযোগের সংকট
অনেক পাকিস্তানি এখনও সঞ্চয়, বীমা কিংবা উৎপাদনমুখী ঋণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যও সহজ অর্থায়নের ব্যবস্থা সীমিত। এর ফলে অনেকেই অনানুষ্ঠানিক ঋণদাতা বা উচ্চসুদের ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন।
এই প্রেক্ষাপটে মাইক্রোফাইন্যান্স খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সীমিত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এই খাত দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সেবা দিয়ে আসছে। পাকিস্তানের জনপ্রিয় দুই ব্রাঞ্চলেস ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম ইজিপাইসা ও জ্যাজক্যাশও মূলত মাইক্রোফাইন্যান্সভিত্তিক কাঠামো থেকেই গড়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন প্রয়োজন এমন ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যেখানে শুধু লেনদেন নয়, বরং সঞ্চয়, ঋণ, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ডিজিটাল হলেও দরকার বাস্তব অবকাঠামো
পাকিস্তানের মতো নগদনির্ভর অর্থনীতিতে কেবল মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ডিজিটাল ব্যাংক সফল হওয়া কঠিন বলেও মত উঠে এসেছে। দেশটিতে বর্তমানে ৬ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি ব্রাঞ্চলেস ব্যাংকিং এজেন্ট রয়েছে, যা নগদ অর্থকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানে সফল ডিজিটাল ব্যাংক হতে হলে শুধু প্রযুক্তিনির্ভর হলেই হবে না, বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাস্তব উপস্থিতি ও নগদ রূপান্তর সক্ষমতাও থাকতে হবে। এজন্য শাখা, খুচরা অংশীদার ও এজেন্ট নেটওয়ার্ককে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
নতুন লক্ষ্য অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ
বর্তমানে কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকিং-অ্যাজ-এ-সার্ভিস মডেলের মাধ্যমে অংশীদারভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। এতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গ্রাহক সংগ্রহ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও খাতভিত্তিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কে সবচেয়ে বেশি লেনদেন করছে তার ওপর নয়, বরং কে সাধারণ মানুষের উৎপাদনশীলতা, আর্থিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে পারছে তার ওপর।
এই নিবন্ধে পাকিস্তানের ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। লেখাটি লিখেছেন শিল্পখাতের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা কবির নাকভি, যিনি বর্তমানে অভি গ্রুপের ডিজিটাল ব্যাংক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাকিস্তানে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
Sarakhon Report 



















