ভারতে ছত্রাকজনিত সংক্রমণ ধীরে ধীরে বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হচ্ছে। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে দেশে ছত্রাক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, আর চিকিৎসা ও গবেষণার সীমাবদ্ধতায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষ বিভিন্ন ধরনের ছত্রাক সংক্রমণে ভুগছেন, কিন্তু এই রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য এখনও পর্যাপ্ত দক্ষতা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
গরম-আর্দ্র আবহাওয়ায় বাড়ছে ঝুঁকি
ভারতের মতো উষ্ণ ও আর্দ্র দেশে ছত্রাক খুব সহজে বৃদ্ধি পায়। ত্বক, চোখ, ফুসফুস, এমনকি মস্তিষ্কেও ছত্রাক সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, চোখের ছত্রাক সংক্রমণের ঘটনা এখন অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও উপকূলীয় অঞ্চলে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
করোনার সময় ‘ব্ল্যাক ফাঙ্গাস’ নামে পরিচিত মিউকরমাইকোসিস আতঙ্ক তৈরি করেছিল। সেই অভিজ্ঞতার পরও দেশে ছত্রাকজনিত রোগ নিয়ে সচেতনতা ও গবেষণা এখনও সীমিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত দেশগুলোর তুলনায় ভারতে এই সংক্রমণের হার বহু গুণ বেশি।
চিকিৎসায় দেরি বাড়াচ্ছে জটিলতা
অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা প্রথমে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসা পান। পরে যখন অবস্থার উন্নতি হয় না, তখন ছত্রাকের চিকিৎসা শুরু হয়। এই বিলম্বের কারণে সংক্রমণ শরীরের গভীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং চিকিৎসা কঠিন হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বহু পরীক্ষাগারে এখনও ছত্রাক শনাক্তের উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই। যেসব রোগীর যক্ষ্মা ধরা পড়ে না, তাদের অনেককেই অন্য পরীক্ষা ছাড়াই যক্ষ্মার ওষুধ দেওয়া হয়। অথচ তাদের মধ্যে অনেকের ফুসফুসে ছত্রাক সংক্রমণ থাকতে পারে।
![]()
পরীক্ষা ও শনাক্তকরণে বড় ঘাটতি
ছত্রাক শনাক্ত করতে সাধারণত রোগীর নমুনা বিশেষ কালচার প্লেটে রাখা হয়। কিন্তু ফল পেতে কয়েক দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এর পাশাপাশি পরীক্ষায় দূষণের ঝুঁকিও থাকে। ফলে আসল সংক্রমণ আর বাইরের দূষণ আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আধুনিক প্রযুক্তি থাকলেও তার ব্যবহার সীমিত। উন্নত যন্ত্রপাতির দাম অত্যন্ত বেশি হওয়ায় অধিকাংশ হাসপাতাল ও গবেষণাগারে সেগুলো নেই। ফলে দ্রুত ও নির্ভুল রোগ শনাক্ত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ছে
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, অতিরিক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ ব্যবহারের কারণে ছত্রাকের মধ্যে ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ছে। অনেক মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ ব্যবহার করছেন। কৃষিক্ষেত্রেও একই ধরনের রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে পরিবেশে প্রতিরোধী ছত্রাক তৈরি হচ্ছে।
ফলে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণও মারাত্মক আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গবেষণায় নতুন উদ্যোগ
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। দেশের গবেষকরা এখন গুরুত্বপূর্ণ ছত্রাক প্রজাতি শনাক্ত, ওষুধ প্রতিরোধ মানচিত্র তৈরি এবং নতুন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবনে কাজ করছেন। উন্নত হাসপাতালগুলোও চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে যাতে ছত্রাক সংক্রমণ দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত রোগ নির্ণয়, উন্নত গবেষণা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং সচেতনতা বাড়ানোই হবে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
ভারতে দ্রুত বাড়ছে ছত্রাক সংক্রমণ। চিকিৎসা, পরীক্ষা ও গবেষণার ঘাটতিতে ঝুঁকিতে কোটি মানুষ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















