তিন মাসের সংঘাতের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধে সম্ভাব্য সমঝোতার বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে। তবে উভয় পক্ষই স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এখনই কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, পারমাণবিক আলোচনা এবং অবরুদ্ধ অর্থ ছাড়ের মতো জটিল বিষয়গুলো এখনো আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
সোমবার ভারতের নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সর্বোচ্চ সুযোগ দেওয়া হবে। তবে ভালো কোনো সমঝোতা না হলে যুক্তরাষ্ট্র “অন্য পথ” বিবেচনা করবে। একই দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি হলে তা হবে “গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর”, না হলে কোনো চুক্তিই হবে না।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, আলোচনায় বেশ কিছু বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটি চুক্তি স্বাক্ষরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে—এমনটা বলা যাবে না।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে মূল আলোচনা
সম্ভাব্য সমঝোতার খসড়ায় মোট ১৪টি বিষয় রয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। এর মূল লক্ষ্য যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার। এর বিনিময়ে ইরান ওই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে কিছু পদক্ষেপ নেবে।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে কার্যত প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যায়। আগে যেখানে প্রতিদিন ১২৫ থেকে ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত, এখন সেখানে খুব সীমিত পরিসরে জাহাজ চলাচল হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং জ্বালানি সংকট তৈরি হয়। এর প্রভাবে জ্বালানি, সার ও খাদ্যের দামও বাড়তে থাকে। তবে সোমবার সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির আশায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৪ শতাংশের বেশি কমেছে।
পারমাণবিক ইস্যুতে এখনো অচলাবস্থা
ইরান জানিয়েছে, বর্তমান আলোচনা সরাসরি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নয়। কাঠামোগত সমঝোতা হলে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে আলাদা আলোচনা হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান উদ্বেগ ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। তবে ইরান বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যৎ আলোচনায় জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত কমানোর সম্ভাব্য পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
নিষেধাজ্ঞা ও অবরুদ্ধ অর্থ নিয়ে টানাপোড়েন
ইরানের অন্যতম দাবি হলো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা কয়েক দশক বিলিয়ন ডলারের তেলের অর্থ ছাড় করা। এ বিষয়ে আলোচনার অংশ হিসেবে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান আবদোলনাসের হেম্মাতি কাতার সফর করেছেন বলে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে।
তবে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং হিজবুল্লাহ ইস্যুসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি
এপ্রিলের শুরু থেকে একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। তার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়। একই সময়ে লেবাননেও ইসরায়েলি অভিযানে বহু মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে। পাল্টা হামলায় ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব ও জ্বালানি দামের চাপ নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। এ অবস্থায় সম্ভাব্য চুক্তিকে রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















