ভারতের তিনটি বিধানসভা উপনির্বাচনের ফলাফলে শাসক ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) মিশ্র ফল পেয়েছে। দলটি গুজরাটের মাঞ্জলপুর আসন ধরে রাখতে সক্ষম হলেও বিহারের বহুল আলোচিত ব্যাংকিপুর-১৫৬ এবং মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া আসনে পরাজয়ের মুখে পড়েছে। এই ফলাফল এমন সময় এলো, যখন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে জেন জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের জেরে কেন্দ্রীয় সরকার রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে।
ব্যাংকিপুর-১৫৬ আসনে প্রশান্ত কিশোরের প্রথম নির্বাচনী জয়
সবচেয়ে আলোচিত ফল এসেছে বিহারের ব্যাংকিপুর-১৫৬ আসনে। জন সুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর বিজেপি প্রার্থী নীরজ কুমারকে ১৯ হাজার ৩২৪ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন।
১৯৯৫ সাল থেকে আসনটি বিজেপির দখলে ছিল। বিজেপির জাতীয় সভাপতি নীতিন নবীন রাজ্যসভায় নির্বাচিত হওয়ার পর বিধায়ক পদ ছেড়ে দিলে সেখানে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়।
রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর এটি প্রশান্ত কিশোরের প্রথম নির্বাচনী বিজয়। একই সঙ্গে জন সুরাজ পার্টিও প্রথমবারের মতো বিধানসভায় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করল। ২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে দলটি কোনো আসন জিততে পারেনি।
এই নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) ভোটও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগের বিধানসভা নির্বাচনে দলটির প্রার্থী ৪৬ হাজারের বেশি ভোট পেলেও এবার ১৫ হাজার ভোটেরও কম পেয়েছেন।
দাতিয়ায় কংগ্রেসের দখল অটুট
মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া বিধানসভা আসনেও বিজেপি সফল হতে পারেনি। কংগ্রেস প্রার্থী ঘনশ্যাম সিং বিজেপির অশুতোষ তিওয়ারিকে ৬ হাজার ১৬ ভোটে পরাজিত করেন।
এর ফলে ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জেতা আসনটি কংগ্রেস ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
গুজরাটে বিজেপির একমাত্র স্বস্তি
গুজরাটের মাঞ্জলপুর আসনে বিজেপি স্বস্তিদায়ক ব্যবধানে জয় পেয়েছে। দলটির প্রার্থী সতেন্দ্রভাই প্যাটেল কংগ্রেসের ভিখাভাই রাবারিকে ৩০ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত করে আসনটি ধরে রাখেন।
ফল প্রকাশের পর বিরোধীদের আক্রমণ
উপনির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বিরোধী দলগুলো বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ জোরদার করেছে।
সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব দাবি করেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি ও দুর্নীতি নিয়ে জনঅসন্তোষই এই ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এটি পরিবর্তনের সূচনা এবং তরুণদের ঐক্য ও জনগণের ক্ষোভের প্রতিফলন।
আম আদমি পার্টির জাতীয় আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়ালও বিজেপিকে কটাক্ষ করে বলেন, দলের জাতীয় সভাপতির আসনও ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি অর্থের অপব্যবহার, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সরকারের প্রতি বাড়তে থাকা অসন্তোষ ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
প্রতিবাদের প্রেক্ষাপটে নির্বাচন
এই উপনির্বাচনের ফল এসেছে দিল্লির যন্তর মন্তরে দীর্ঘদিনের জেন জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের পর। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সুশাসনের বৃহত্তর দাবিতে বিস্তৃত হয়।
এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা বিক্ষোভ ও অনশনের পর কেন্দ্র সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন এবং সরকার পরীক্ষা সংস্কার, ভবিষ্যতে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে উদ্যোগ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়। এরপর আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, তাদের প্রধান দাবিগুলো সরকার গ্রহণ করায় কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এদিকে নির্বাচনী প্রচারের সময় প্রশান্ত কিশোর বলেছিলেন, আন্দোলনের প্রতি বিপুল জনসমর্থন দেশের মানুষের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষেরই প্রতিফলন। তাঁর মতে, বেকারত্ব, দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে, যা রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলছে।
বিহারের ব্যাংকিপুর-১৫৬ উপনির্বাচনে প্রশান্ত কিশোরের প্রথম জয় এবং তিন রাজ্যের উপনির্বাচনে বিজেপির মিশ্র ফল ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















