বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিবেচিত হয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণপত্র। বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি ছিল নিরাপদ আশ্রয়, আর বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার অসংখ্য চুক্তি ও সম্পদের মূল্য নির্ধারণেও এর ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বাজারে যে পরিবর্তন ঘটছে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে অর্থনৈতিক মহলে।
গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের পরিমাণ ১২৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু এই বিপুল ঋণের বিপরীতে চাহিদা একই গতিতে বাড়েনি। বিশেষ করে বিদেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর আগ্রহ আগের তুলনায় কমে যাওয়ায় বাজারের বড় অংশ এখন বেসরকারি বিনিয়োগকারী ও ঝুঁকিপূর্ণ তহবিলগুলোর হাতে চলে যাচ্ছে।
নিরাপদ সম্পদের মর্যাদা কি ঝুঁকিতে?
অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ে মার্কিন সরকারি ঋণপত্রকে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখা হতো। তবে ২০২১ সালের পর মূল্যস্ফীতির পুনরুত্থান সেই ধারণায় পরিবর্তন এনেছে। আগে শেয়ারবাজারে পতন হলে সরকারি ঋণপত্রের দাম বাড়ত। এখন অনেক ক্ষেত্রে দুই বাজারই একসঙ্গে চাপের মুখে পড়ছে।
ফলে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমানোর যে ঐতিহ্যগত উপায় ছিল, তা আগের মতো কার্যকর থাকছে না। এতে সরকারি ঋণপত্রের বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিদেশি ক্রেতাদের অনীহা
মার্কিন বাণিজ্যনীতি এবং আর্থিক নিষেধাজ্ঞার ক্রমবর্ধমান ব্যবহারও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন ধরনের সতর্কতা তৈরি করেছে। অনেক দেশ এখন দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে আগের তুলনায় বেশি হিসাব-নিকাশ করছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও রাষ্ট্রীয় তহবিল যখন বিকল্প খুঁজছে, তখন মার্কিন ঋণবাজারকে আরও বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ওপর। কিন্তু এই ধরনের বিনিয়োগকারীরা বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে দ্রুত সরে যেতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে কঠিন পরীক্ষা
নতুন কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাজারকে স্থিতিশীল রাখা। একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা সরকারি ঋণপত্রের পরিমাণ কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে, অন্যদিকে সংকট দেখা দিলে আবার বাজারে হস্তক্ষেপ করার প্রস্তুতিও রাখতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে যদি বাজারে হঠাৎ তারল্য সংকট তৈরি হয়, তাহলে দ্রুত ও সীমিত পরিসরে হস্তক্ষেপের কৌশল প্রয়োজন হবে। কারণ বাজারকে স্থিতিশীল করতে নেওয়া পদক্ষেপ যেন অর্থনীতিতে অতিরিক্ত উদ্দীপনা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে ভুলভাবে ব্যাখ্যা না হয়।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
মার্কিন সরকারি ঋণবাজার শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হলে আন্তর্জাতিক ঋণ, বিনিয়োগ এবং মুদ্রাবাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
তাই অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের অন্যতম বড় দায়িত্ব। অন্যথায় বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপদ সম্পদ হিসেবে পরিচিত এই বাজারের অবস্থান ভবিষ্যতে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
মার্কিন সরকারি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। চাহিদা কমা, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনীহা ও বাজারঝুঁকি বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















