দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সি মাইনিংয়ের জন্য বিদ্যুৎ চুরির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এর ফলে শুধু জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাই চাপের মুখে পড়ছে না, বরং সংগঠিত অপরাধচক্র, অর্থপাচার এবং সাইবার প্রতারণার সঙ্গেও এই কার্যক্রমের সম্পর্ক ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধ মাইনিং এখন শুধু প্রযুক্তিগত বা আর্থিক বিষয় নয়, এটি জননিরাপত্তা ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মালয়েশিয়ায় বড় অভিযানে উন্মোচিত অবৈধ নেটওয়ার্ক
মালয়েশিয়ার জোহর অঙ্গরাজ্যে পুলিশের সাম্প্রতিক অভিযানে চারটি ভাড়া করা ভবন থেকে ৭১টি ক্রিপ্টো মাইনিং যন্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তে জানা যায়, এসব যন্ত্র ব্যবহার করে টানা এক মাস ধরে অবৈধভাবে বিটকয়েন মাইনিং চলছিল।
অভিযানে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি কম্পিউটার, রাউটার, যানবাহন এবং বিদ্যুৎ মিটার এড়িয়ে সংযোগ নেওয়ার বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক মাসেই বিদ্যুৎ চুরির কারণে প্রায় ১৬ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। তবে একই সময়ে এই অবৈধ মাইনিং কার্যক্রম থেকে মাসে ১৭ হাজার থেকে ২১ হাজার ডলারেরও বেশি আয় হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ চুরির পরিধি উদ্বেগজনক

মালয়েশিয়ার জাতীয় বিদ্যুৎ সংস্থা জানিয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার স্থাপনায় ক্রিপ্টো মাইনিংয়ের জন্য বিদ্যুৎ চুরির ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এতে সংস্থাটির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ইউরো।
দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য আরও উদ্বেগজনক। ২০১৮ সালে যেখানে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা ছিল ৬১০টি, ২০২৪ সালে তা বেড়ে ২ হাজার ৩৯৭টিতে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সীমিত সক্ষমতা, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং আইনি কাঠামোর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
অপরাধচক্রের সঙ্গে বাড়ছে সংযোগ
ক্রিপ্টোকারেন্সি মাইনিং নিজে বৈধ একটি প্রযুক্তিগত কার্যক্রম। কিন্তু বিদ্যুৎ চুরি করে পরিচালিত অবৈধ মাইনিংয়ের সঙ্গে অনলাইন জুয়া, অর্থপাচার এবং আন্তর্জাতিক সাইবার প্রতারণা চক্রের সম্পর্ক বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পরিচালিত মাইনিং কার্যক্রম থেকে অর্জিত অর্থ অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়। ফলে এটি কেবল বিদ্যুৎ চুরির বিষয় নয়, বৃহত্তর আর্থিক অপরাধেরও অংশ হয়ে উঠছে।

থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় একই চিত্র
থাইল্যান্ডে ২০২৫ সালে তিনটি বড় অবৈধ মাইনিং নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ৬ হাজার ৩৯০টির বেশি মাইনিং যন্ত্র জব্দ করা হয়। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, এতে তাদের ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৫ মিলিয়ন ইউরো।
একটি ঘটনায় দেখা যায়, প্রায় ১ হাজার ৯০০টি মাইনিং যন্ত্র বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও প্রকৃত বিলের সামান্য অংশ পরিশোধ করা হচ্ছিল।
অন্যদিকে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার উত্তর সুমাত্রায় পুলিশ ১০টি স্থানে অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ১০০টির বেশি বিটকয়েন মাইনিং যন্ত্র জব্দ করে। রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সংস্থার হিসাবে, মাত্র ছয় মাসেই প্রায় ৭ লাখ ইউরোর সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়।
নজরদারি ও অভিযানে জোর
মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সরকার যৌথভাবে পুলিশ, বিদ্যুৎ সংস্থা এবং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অভিযান জোরদার করেছে। পাশাপাশি স্মার্ট মিটার ব্যবহার করে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ ব্যবহার দ্রুত শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিদ্যুৎ ব্যবহারের উন্নত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, বাধ্যতামূলক লাইসেন্স, প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণ এবং ব্যাংক লেনদেন ও ক্রিপ্টো ওয়ালেটের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে তদন্ত পরিচালনা করা জরুরি।

লাওসের নীতিতে পরিবর্তন
লাওস ২০২১ সালে জলবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে বৈধভাবে ক্রিপ্টো মাইনিংয়ের অনুমতি দিয়েছিল।
কিন্তু পরে দেখা যায়, অনেক প্রতিষ্ঠান বিদ্যুতের বিল নিয়মিত পরিশোধ করেনি এবং এই শিল্প থেকে প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান বা স্থানীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য সুফলও আসেনি। এ কারণে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ক্রিপ্টো মাইনিংয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে সেই বিদ্যুৎ ধাতু প্রক্রিয়াজাত শিল্প, বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যকেন্দ্রে ব্যবহার করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদে কোন পথ বেশি লাভজনক?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সস্তা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ক্রিপ্টো মাইনিং বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারলেও তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিশ্চয়তা দেয় না। বিশেষ করে যখন বিদ্যুৎ চুরি বা ভর্তুকিপ্রাপ্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সীমিত অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি হয়, তখন শেষ পর্যন্ত সেই আর্থিক বোঝা বহন করতে হয় সাধারণ গ্রাহক ও রাষ্ট্রকেই। তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ নিরাপত্তা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















