জাপানের নিরাপত্তা নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেশটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বিস্তৃত গোয়েন্দা সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে। ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকি, সাইবার ঝুঁকি, বিদেশি প্রভাব বিস্তার এবং তথাকথিত ‘গ্রে-জোন’ অভিযানের মোকাবিলায় সরকার একটি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা কাঠামো গড়ে তুলছে। সারাক্ষণ রিপোর্ট
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সরকার সম্প্রতি জাতীয় গোয়েন্দা ব্যুরো (এনআইবি) গঠনের অনুমোদন দিয়েছে। জুলাই মাস থেকেই প্রায় ৭০০ কর্মী নিয়ে নতুন সংস্থাটি কাজ শুরু করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ বা যুক্তরাজ্যের এমআই৬-এর মতো একটি কেন্দ্রীভূত বৈদেশিক গোয়েন্দা ব্যবস্থার দিকে এটি জাপানের প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিদেশি বিনিয়োগে নতুন নজরদারি
গোয়েন্দা সংস্কারের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ সংক্রান্ত আইনও কঠোর করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থার আওতায় বিদেশি বিনিয়োগের জাতীয় নিরাপত্তাগত প্রভাব মূল্যায়ন করা হবে। বিশেষ করে দেশীয় প্রযুক্তি, শিল্পগোপন তথ্য এবং কৌশলগত জ্ঞান বিদেশে পাচার হওয়ার ঝুঁকি কমানোই এর লক্ষ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপ জাপানের গোয়েন্দা সক্ষমতা উন্নয়নের একটি দীর্ঘ যাত্রার সূচনা মাত্র। প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও মানবসম্পদ—দুই ক্ষেত্রেই দেশটিকে আরও অনেক দূর এগোতে হবে।
কেন এই পরিবর্তন
দীর্ঘদিন ধরে জাপানের গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে দুর্বল হিসেবে দেখা হতো। গণতান্ত্রিক বিশ্বের মধ্যে কখনও কখনও দেশটিকে ‘স্পাই প্যারাডাইস’ বলেও সমালোচনা করা হয়েছে।
২০২১ সালে এক চীনা গবেষকের ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাইপারসনিক প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করার পর দেশে ফিরে চীনের সামরিক অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচিতে যুক্ত হন বলে জানা যায়। এরপর বিদেশি শিক্ষার্থীদের পটভূমি যাচাই আরও কঠোর করে টোকিও।
সরকার এখন শুধু এনআইবি গঠনেই থেমে থাকতে চায় না। ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ গুপ্তচরবৃত্তিবিরোধী আইন, বিদেশে তথ্য সংগ্রহের জন্য বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা এবং যোগাযোগ নজরদারি সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনাও রয়েছে।
‘গ্রে-জোন’ যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ
জাপানের নীতিনির্ধারকদের মতে, আধুনিক নিরাপত্তা হুমকি আর শুধু সামরিক সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যবহার করে জনমত প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।
বিশ্লেষকদের দাবি, তাকাইচি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে চীনা প্রভাব কার্যক্রম আরও সক্রিয় হয়েছে। তাদের মতে, এনআইবি প্রতিষ্ঠা জাপানের জন্য বিদেশি প্রভাব ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা শনাক্ত এবং মোকাবিলার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।
অতীতের উত্তরাধিকার ও নতুন বাস্তবতা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জাপানের গোপন পুলিশ রাজনৈতিক বিরোধিতা কঠোরভাবে দমন করেছিল। সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার কারণে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দেশটি ইচ্ছাকৃতভাবে গোয়েন্দা কাঠামোকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়।
কিন্তু এর ফলে তথ্য বিনিময়ে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন এনআইবি এসব প্রশাসনিক বিভাজন দূর করে তথ্য সমন্বয়ের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ
যদিও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে রাজনৈতিক বিরোধিতা তুলনামূলক কম, তবুও নাগরিক স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অতীতে সাধারণ নাগরিকদের ওপর নজরদারির অভিযোগও উঠেছিল।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন আইনের সঙ্গে একটি অতিরিক্ত প্রস্তাব যুক্ত করা হয়েছে, যাতে নিশ্চিত করা হয় যে এনআইবি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করবে না এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে। বিশেষজ্ঞরা জনআস্থা বাড়াতে স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থাও গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















