০৯:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হামলায় নতুন উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিতে ড্রোন-কাণ্ডে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আরও তীব্র বাংলাদেশ ব্যাংক কেন ডলার কিনছে? রিজার্ভ, বিনিময় হার ও অর্থনীতির ভারসাম্যের গল্প খুলনায় বিশেষ অভিযানে কসাই লিটনসহ গ্রেফতার ৫৯ রাতের মধ্যে ১৮ অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কা, নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত তিন কারখানায় ১,৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাই, ঈদের ছুটি শেষে কাজে এসে চাকরি হারানোর অভিযোগ উপসাগরে নতুন উত্তেজনা: কুয়েত-বাহরাইনের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগ ইরানের বিরুদ্ধে মে মাসে গণপিটুনিতে ৩১ জন নিহত, ধর্ষণের শিকার ৮৩ নারী-শিশু ফ্রেঞ্চ ওপেনে ইতিহাস গড়ার লড়াই: শিরোপার ফাইনালে মায়া চওয়ালিন্সকা ও মিরা আন্দ্রেয়েভা প্রবাসফেরত যুবককে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে কুপিয়ে হত্যা, গ্রেফতারে অভিযান হাসিনার ১৭ বছরে যত বেড়েছিল, বিএনপির ৩ মাসেই ততটা বেড়েছে গ্যাসের দাম- এন সি পি

জেন-জেড সমাজতন্ত্রের উত্থান: তরুণ ভোটারদের নতুন রাজনৈতিক ঝোঁক নিয়ে বিতর্ক

বিশ্ব রাজনীতিতে বামপন্থার একটি নতুন ধারা দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তরুণ ভোটারদের বড় একটি অংশ এমন এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের দিকে ঝুঁকছে, যেখানে মূল্যনিয়ন্ত্রণ, উচ্চ সম্পদকর, রাষ্ট্রায়ত্তকরণ এবং ধনীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপের মতো নীতিগুলোকে সমর্থন করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা শুধু রাজনৈতিক প্রান্তসীমায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং মূলধারার রাজনীতিকেও প্রভাবিত করতে শুরু করেছে।

তরুণদের নতুন রাজনৈতিক ভাষা

এই নতুন ধারাকে অনেকেই “জেন-জেড সমাজতন্ত্র” নামে অভিহিত করছেন। এটি ঐতিহ্যগত সমাজতন্ত্রের মতো উৎপাদনের উপায় রাষ্ট্রের হাতে নেওয়া বা সমষ্টিবাদী আদর্শকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক যুগে ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগকে সামনে এনে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে।

কয়েক বছর আগেও জলবায়ু পরিবর্তন, জাতিগত বৈষম্য বা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি তরুণদের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। এখন সেই জায়গা দখল করেছে মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ।

অসন্তোষের বাস্তব ভিত্তি

এই রাজনৈতিক প্রবণতার পেছনে বাস্তব সমস্যাও রয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বড় শহরগুলোতে আবাসন ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তরুণদের জন্য বাড়ি ভাড়া বা কেনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি ভবিষ্যতের চাকরির বাজার নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ফলে তরুণদের একটি অংশ মনে করছে, বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামো তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করতে পারছে না। এই হতাশা থেকেই বিকল্প রাজনৈতিক ধারণার প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে।

তিনটি মূল বিশ্বাস

এই নতুন বামপন্থী চিন্তার মধ্যে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। প্রথমত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করে—এই ধারণার প্রতি তাদের আস্থা কম। তারা মনে করে, অর্থনীতিতে নতুন সম্পদ সৃষ্টির চেয়ে বিদ্যমান সম্পদের পুনর্বণ্টন বেশি জরুরি।

দ্বিতীয়ত, সরকারি ব্যয় বাড়ানোর অর্থায়ন মূলত ধনী ব্যক্তি ও বড় সম্পদের মালিকদের কাছ থেকেই আসা উচিত বলে তারা বিশ্বাস করে। তৃতীয়ত, বেসরকারি উদ্যোগ ও বাজারভিত্তিক অর্থনীতির প্রতি তাদের সন্দেহ প্রবল। আবাসন, খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য মৌলিক খাতগুলোতে রাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পক্ষে তারা অবস্থান নেয়।

The next generation of illiberal leftism is gaining ground. It is time to fight  back https://econ.st/3QpivkF

মূলধারার রাজনীতিতে প্রভাব

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধারণাগুলো এখন আর কেবল নতুন রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন দেশের মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোও তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে একই ধরনের নীতির দিকে ঝুঁকছে।

ফলে কর বৃদ্ধি, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলো ক্রমেই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ধারণার প্রভাব নির্বাচনী ফলাফলের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সমালোচকদের আপত্তি

সমালোচকদের মতে, মূল্যনিয়ন্ত্রণ আবাসন সংকট কমানোর বদলে নতুন বাড়ি নির্মাণের আগ্রহ কমিয়ে সংকট আরও বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত সম্পদকর বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ অর্থনীতির গতিশীলতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

তাদের যুক্তি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি হলো বেসরকারি উদ্যোগ, উদ্ভাবন এবং প্রতিযোগিতা। ইতিহাসে যেসব দেশ দীর্ঘমেয়াদে উন্নতি করেছে, তাদের অনেকেই বাজারভিত্তিক অর্থনীতির সুবিধা কাজে লাগিয়েছে।

সমাধানের নতুন পথ খোঁজা

বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের উদ্বেগকে অস্বীকার করলে সমস্যার সমাধান হবে না। আবাসন সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং প্রজন্মগত বৈষম্যের মতো বাস্তব সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান দিতে হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি এবং শ্রমবাজারকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার উদ্যোগ নিতে হবে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, আগামী দশকে তরুণ ভোটারদের এই নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে পরিণত হবে। প্রশ্ন হলো, পরিবর্তনের দাবি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে কোন ভারসাম্যটি শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হামলায় নতুন উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিতে ড্রোন-কাণ্ডে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আরও তীব্র

জেন-জেড সমাজতন্ত্রের উত্থান: তরুণ ভোটারদের নতুন রাজনৈতিক ঝোঁক নিয়ে বিতর্ক

০৭:৪২:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতিতে বামপন্থার একটি নতুন ধারা দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তরুণ ভোটারদের বড় একটি অংশ এমন এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের দিকে ঝুঁকছে, যেখানে মূল্যনিয়ন্ত্রণ, উচ্চ সম্পদকর, রাষ্ট্রায়ত্তকরণ এবং ধনীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপের মতো নীতিগুলোকে সমর্থন করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা শুধু রাজনৈতিক প্রান্তসীমায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং মূলধারার রাজনীতিকেও প্রভাবিত করতে শুরু করেছে।

তরুণদের নতুন রাজনৈতিক ভাষা

এই নতুন ধারাকে অনেকেই “জেন-জেড সমাজতন্ত্র” নামে অভিহিত করছেন। এটি ঐতিহ্যগত সমাজতন্ত্রের মতো উৎপাদনের উপায় রাষ্ট্রের হাতে নেওয়া বা সমষ্টিবাদী আদর্শকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক যুগে ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগকে সামনে এনে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে।

কয়েক বছর আগেও জলবায়ু পরিবর্তন, জাতিগত বৈষম্য বা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি তরুণদের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। এখন সেই জায়গা দখল করেছে মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ।

অসন্তোষের বাস্তব ভিত্তি

এই রাজনৈতিক প্রবণতার পেছনে বাস্তব সমস্যাও রয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বড় শহরগুলোতে আবাসন ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তরুণদের জন্য বাড়ি ভাড়া বা কেনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি ভবিষ্যতের চাকরির বাজার নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ফলে তরুণদের একটি অংশ মনে করছে, বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামো তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করতে পারছে না। এই হতাশা থেকেই বিকল্প রাজনৈতিক ধারণার প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে।

তিনটি মূল বিশ্বাস

এই নতুন বামপন্থী চিন্তার মধ্যে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। প্রথমত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করে—এই ধারণার প্রতি তাদের আস্থা কম। তারা মনে করে, অর্থনীতিতে নতুন সম্পদ সৃষ্টির চেয়ে বিদ্যমান সম্পদের পুনর্বণ্টন বেশি জরুরি।

দ্বিতীয়ত, সরকারি ব্যয় বাড়ানোর অর্থায়ন মূলত ধনী ব্যক্তি ও বড় সম্পদের মালিকদের কাছ থেকেই আসা উচিত বলে তারা বিশ্বাস করে। তৃতীয়ত, বেসরকারি উদ্যোগ ও বাজারভিত্তিক অর্থনীতির প্রতি তাদের সন্দেহ প্রবল। আবাসন, খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য মৌলিক খাতগুলোতে রাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পক্ষে তারা অবস্থান নেয়।

The next generation of illiberal leftism is gaining ground. It is time to fight  back https://econ.st/3QpivkF

মূলধারার রাজনীতিতে প্রভাব

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধারণাগুলো এখন আর কেবল নতুন রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন দেশের মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোও তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে একই ধরনের নীতির দিকে ঝুঁকছে।

ফলে কর বৃদ্ধি, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলো ক্রমেই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ধারণার প্রভাব নির্বাচনী ফলাফলের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সমালোচকদের আপত্তি

সমালোচকদের মতে, মূল্যনিয়ন্ত্রণ আবাসন সংকট কমানোর বদলে নতুন বাড়ি নির্মাণের আগ্রহ কমিয়ে সংকট আরও বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত সম্পদকর বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ অর্থনীতির গতিশীলতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

তাদের যুক্তি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি হলো বেসরকারি উদ্যোগ, উদ্ভাবন এবং প্রতিযোগিতা। ইতিহাসে যেসব দেশ দীর্ঘমেয়াদে উন্নতি করেছে, তাদের অনেকেই বাজারভিত্তিক অর্থনীতির সুবিধা কাজে লাগিয়েছে।

সমাধানের নতুন পথ খোঁজা

বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের উদ্বেগকে অস্বীকার করলে সমস্যার সমাধান হবে না। আবাসন সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং প্রজন্মগত বৈষম্যের মতো বাস্তব সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান দিতে হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি এবং শ্রমবাজারকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার উদ্যোগ নিতে হবে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, আগামী দশকে তরুণ ভোটারদের এই নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে পরিণত হবে। প্রশ্ন হলো, পরিবর্তনের দাবি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে কোন ভারসাম্যটি শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে।