০৯:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হামলায় নতুন উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিতে ড্রোন-কাণ্ডে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আরও তীব্র বাংলাদেশ ব্যাংক কেন ডলার কিনছে? রিজার্ভ, বিনিময় হার ও অর্থনীতির ভারসাম্যের গল্প খুলনায় বিশেষ অভিযানে কসাই লিটনসহ গ্রেফতার ৫৯ রাতের মধ্যে ১৮ অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কা, নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত তিন কারখানায় ১,৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাই, ঈদের ছুটি শেষে কাজে এসে চাকরি হারানোর অভিযোগ উপসাগরে নতুন উত্তেজনা: কুয়েত-বাহরাইনের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগ ইরানের বিরুদ্ধে মে মাসে গণপিটুনিতে ৩১ জন নিহত, ধর্ষণের শিকার ৮৩ নারী-শিশু ফ্রেঞ্চ ওপেনে ইতিহাস গড়ার লড়াই: শিরোপার ফাইনালে মায়া চওয়ালিন্সকা ও মিরা আন্দ্রেয়েভা প্রবাসফেরত যুবককে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে কুপিয়ে হত্যা, গ্রেফতারে অভিযান হাসিনার ১৭ বছরে যত বেড়েছিল, বিএনপির ৩ মাসেই ততটা বেড়েছে গ্যাসের দাম- এন সি পি

আলজেরিয়ার সাহারায় ফিরে দেখা

প্রায় তিন দশক আগে, নাইজারের উত্তরাঞ্চলের আগাদেজ শহরে, আইয়ার পর্বতমালায় একটি সংক্ষিপ্ত সফরের মধ্য দিয়ে সাহারার সঙ্গে আমার সম্পর্কের শুরু। প্রথম দেখাতেই প্রেম। এরপরের বছরগুলোতে আমি খুঁজে ফিরেছি মরুভূমির নীরবতা। মৌরিতানিয়ার প্রাচীন কাফেলা-নগরী শিঙ্গেত্তিতে বসে পুরোনো পাণ্ডুলিপির গল্প শুনেছি, ওয়েসিস ঘুরেছি। লিবিয়ার জেবেল আকাকুসের শিলা-চিত্র দেখেছি, উবারি ও মুরজুকের বালিয়াড়ি পেরিয়েছি। মালিতে টিমবুকতুকে গন্তব্য নয়, বরং আরও গভীরে যাওয়ার সূচনা হিসেবে ব্যবহার করেছি।

সাহারার বিস্তীর্ণ প্রান্তর ছিল আমার খেলার মাঠ। তুয়ারেগ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গড়ে উঠেছিল গভীর বন্ধুত্ব। তাদের গল্প, সংস্কৃতি এবং মরুভূমির নির্জনতা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। পৃথিবীর কোলাহল থেকে অনেক দূরে থাকা এই ভূখণ্ডের নীরবতা ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী।

কিন্তু ২০০৯ সালে মালির আরাওয়ান অঞ্চলে এক অভিযানের সময় পরিস্থিতি বদলে যায়। আমি পৌঁছানোর একদিন আগে সেখানে আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট জঙ্গিরা এসেছিল। একই সময়ে মালির অন্য প্রান্তে চার ইউরোপীয় পর্যটক অপহৃত হন; পরে তাঁদের একজনকে হত্যা করা হয়। এর পর থেকেই সাহারা জুড়ে অপহরণ ও সহিংসতার ঢেউ শুরু হয়।

ধীরে ধীরে সাহারায় ভ্রমণের দরজা বন্ধ হতে থাকে। কিছুদিন লিবিয়া নিরাপদ ছিল, কিন্তু ২০১০ সালে সেখানে শেষ সফরের পরপরই দেশের দক্ষিণাঞ্চল বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দেশটি গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এতগুলো অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়ার অভিজ্ঞতা যেন এক ধরনের সতর্কবার্তা ছিল। সাহারাকে আগের মতোই ভালোবাসতাম, কিন্তু সেখানে ফিরে যাওয়া আর নিরাপদ ছিল না।

পরবর্তী ১৫ বছর আমি দূর থেকে সাহারাকে দেখেছি। বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি, পুরোনো ছবিগুলো দেখেছি, সাহারার সুর খুঁজেছি সংগীতে। আফ্রিকার নামিব ও কালাহারি কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিগুলোতে সাহারার প্রতিধ্বনি খোঁজার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কিছুই একই রকম ছিল না।

অবশেষে ২০২৫ সালের শুরুতে দক্ষিণ আলজেরিয়ায় ফেরার সুযোগ এল। যদিও সাহেল অঞ্চলের অনেক দেশ তখনও অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে ভ্রমণের জন্য অনুপযুক্ত, তবু আলজেরিয়ার দক্ষিণাঞ্চল ছিল তুলনামূলক নিরাপদ। তাই আমি দজানেত শহরের উদ্দেশে যাত্রা করি।

আলজিয়ার্স ও পরে দজানেতে পৌঁছে মনে হলো সময় যেন থেমে আছে। বিমানবন্দরের দীর্ঘ অপেক্ষা, জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, সীমিত সুবিধা—সবই পরিচিত লাগছিল। দজানেতও ছিল স্মৃতির মতোই—খেজুরবাগানে ঘেরা উপত্যকার শহর, কাদামাটির পুরোনো স্থাপনা, চা-ঘরে আড্ডা দেওয়া স্থানীয় মানুষ এবং ধীর গতির জীবন।

শিগগিরই আমি তুয়ারেগ গাইড আবদেসসালেম ও চালক আহমাদের সঙ্গে ইউনেস্কো স্বীকৃত তাসিলি ন’আজ্জের অঞ্চলের পথে রওনা হই। কয়েক দিনের মধ্যে আমাদের যাত্রা একটি ছন্দ খুঁজে পায়। রাত কাটত তারাভরা আকাশের নিচে বালুর ওপর, সকাল শুরু হতো সূর্যোদয়ের সোনালি আলোয় ভেসে থাকা মরুভূমি দেখে।

A journey back to the Algerian Sahara - Geographical

আমরা কখনও হাজার বছরের পুরোনো শিলা-চিত্র দেখতে থামতাম, কখনও ছোট গ্রাম ঘুরে দেখতাম। সেই সময় আহমাদ আগুন জ্বেলে চা বানাতেন। তুয়ারেগ সংস্কৃতিতে চা শুধু পানীয় নয়, এক ধরনের আচার। দিনে দুই বা তিনবার দীর্ঘ সময় নিয়ে তিন দফায় চা পরিবেশন করা হতো। মরুভূমির অসাধারণ দৃশ্যের মাঝেও এই চা-আড্ডাই ছিল আমার দিনের সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্ত।

তাসিলির গ্রামগুলো সকালে ও বিকেলে প্রাণচঞ্চল থাকলেও দুপুরের প্রচণ্ড রোদে প্রায় জনশূন্য হয়ে যেত। ইফনি, ইহরিরসহ বিভিন্ন বসতিতে মানুষের জীবনযাত্রা, জলাশয় ও খেজুরবাগান মরুভূমির কঠোর পরিবেশের মাঝেও জীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।

আমরা খুঁজেছি সেই শিলা-চিত্রগুলো, যা বলে এক ভিন্ন সাহারার গল্প। আজ যেখানে মরুভূমি, সেখানে একসময় ছিল সবুজ তৃণভূমি। চিত্রগুলোতে দেখা যায় হাতি, জিরাফ, সিংহ, বন্য কুকুর, শিকার, বিয়ে, যুদ্ধ ও দৈনন্দিন জীবনের নানা দৃশ্য। পরে যুক্ত হয়েছে ঘোড়া, রথ ও গৃহপালিত গবাদিপশুর ছবি। এগুলো শুধু শিল্প নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাসও বহন করে।

তবে সবকিছুর চেয়ে বেশি আমাকে মুগ্ধ করেছে ভূদৃশ্য। জলভরা গিরিখাত, লাল বালুর মাঝখানে অদ্ভুত আকারের শিলাস্তম্ভ, পাথরে পরিণত হওয়া বনভূমির মতো বিস্তৃত শিলাময় এলাকা—প্রতিটি স্থানই যেন প্রকৃতির একেকটি ভাস্কর্য।

আমরা তিসসুত তিসকালাল এলাকায় গিয়েছিলাম, যেখানে রয়েছে সাহারার বিখ্যাত ‘কাঁদতে থাকা গরু’ শিলাখোদাই। প্রায় ৮ হাজার বছর আগে তৈরি এই শিল্পকর্মে গরুর চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে বলে মনে হয়। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী, এক পশুপালক খরাপীড়িত দক্ষিণাঞ্চল থেকে এখানে এসেছিলেন চারণভূমির আশায়। কিন্তু এসে দেখেন এখানেও মরুভূমি। গরুগুলোর নয়, আসলে নিজের অশ্রুই তিনি পাথরে খোদাই করেছিলেন।

তিন সপ্তাহের সফরে সাহারার সামান্য অংশই দেখা সম্ভব ছিল। দজানেত থেকে আমি তামানরাসেতে যাই এবং আতাকোর মালভূমির আগ্নেয়গিরিময় ভূদৃশ্য ঘুরে দেখি। তুয়ারেগ গ্রাম, প্রাচীন মসজিদ, পাহাড়ি গিরিপথ—সবকিছুতেই ইতিহাস ও নিঃসঙ্গতার গভীর ছাপ।

শেষ দিকে আমরা পৌঁছাই আসেকরেমে, যার অর্থ ‘পৃথিবীর শেষ প্রান্ত’। এখানেই ফরাসি ধর্মযাজক শার্ল দ্য ফুকোর নির্মিত আশ্রম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই স্থানে চারদিকে শুধু পাহাড় আর অসীম নীরবতা।

সেখানে বসবাসকারী এক স্প্যানিশ পুরোহিতকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এত একাকীত্ব কীভাবে সহ্য করেন?

তিনি হেসে বলেছিলেন, “এখানে কোনো একাকীত্ব নেই। আমরা তিনজন আছি।”

পরে তিনি যোগ করেন, “অনেকে মনে করেন ফুকো এখানে নিঃসঙ্গতা খুঁজতে এসেছিলেন। আসলে তিনি এসেছিলেন নিঃসঙ্গতা থেকে পালাতে, কারণ এখানে তখন অনেক তুয়ারেগ শিবির ছিল।”

সেদিন রাতে আমরা আবার তিন দফা চা পান করলাম। সাধারণ খাবার খেলাম নীরবে। তারপর খোলা আকাশের নিচে শুয়ে তারাগুলো গুনতে গুনতে ভাবলাম, কত দীর্ঘ সময় পরে আবার এমন এক জায়গায় ফিরেছি।

রাতের গভীরে ঘুম ভেঙে দেখি সবকিছু স্তব্ধ। বাতাসও থেমে গেছে। চারপাশে ছড়িয়ে আছে এমন এক নির্মল নীরবতা, যা কেবল সাহারাই উপহার দিতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হামলায় নতুন উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিতে ড্রোন-কাণ্ডে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আরও তীব্র

আলজেরিয়ার সাহারায় ফিরে দেখা

০৭:৫৬:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬

প্রায় তিন দশক আগে, নাইজারের উত্তরাঞ্চলের আগাদেজ শহরে, আইয়ার পর্বতমালায় একটি সংক্ষিপ্ত সফরের মধ্য দিয়ে সাহারার সঙ্গে আমার সম্পর্কের শুরু। প্রথম দেখাতেই প্রেম। এরপরের বছরগুলোতে আমি খুঁজে ফিরেছি মরুভূমির নীরবতা। মৌরিতানিয়ার প্রাচীন কাফেলা-নগরী শিঙ্গেত্তিতে বসে পুরোনো পাণ্ডুলিপির গল্প শুনেছি, ওয়েসিস ঘুরেছি। লিবিয়ার জেবেল আকাকুসের শিলা-চিত্র দেখেছি, উবারি ও মুরজুকের বালিয়াড়ি পেরিয়েছি। মালিতে টিমবুকতুকে গন্তব্য নয়, বরং আরও গভীরে যাওয়ার সূচনা হিসেবে ব্যবহার করেছি।

সাহারার বিস্তীর্ণ প্রান্তর ছিল আমার খেলার মাঠ। তুয়ারেগ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গড়ে উঠেছিল গভীর বন্ধুত্ব। তাদের গল্প, সংস্কৃতি এবং মরুভূমির নির্জনতা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। পৃথিবীর কোলাহল থেকে অনেক দূরে থাকা এই ভূখণ্ডের নীরবতা ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী।

কিন্তু ২০০৯ সালে মালির আরাওয়ান অঞ্চলে এক অভিযানের সময় পরিস্থিতি বদলে যায়। আমি পৌঁছানোর একদিন আগে সেখানে আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট জঙ্গিরা এসেছিল। একই সময়ে মালির অন্য প্রান্তে চার ইউরোপীয় পর্যটক অপহৃত হন; পরে তাঁদের একজনকে হত্যা করা হয়। এর পর থেকেই সাহারা জুড়ে অপহরণ ও সহিংসতার ঢেউ শুরু হয়।

ধীরে ধীরে সাহারায় ভ্রমণের দরজা বন্ধ হতে থাকে। কিছুদিন লিবিয়া নিরাপদ ছিল, কিন্তু ২০১০ সালে সেখানে শেষ সফরের পরপরই দেশের দক্ষিণাঞ্চল বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দেশটি গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এতগুলো অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়ার অভিজ্ঞতা যেন এক ধরনের সতর্কবার্তা ছিল। সাহারাকে আগের মতোই ভালোবাসতাম, কিন্তু সেখানে ফিরে যাওয়া আর নিরাপদ ছিল না।

পরবর্তী ১৫ বছর আমি দূর থেকে সাহারাকে দেখেছি। বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি, পুরোনো ছবিগুলো দেখেছি, সাহারার সুর খুঁজেছি সংগীতে। আফ্রিকার নামিব ও কালাহারি কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিগুলোতে সাহারার প্রতিধ্বনি খোঁজার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কিছুই একই রকম ছিল না।

অবশেষে ২০২৫ সালের শুরুতে দক্ষিণ আলজেরিয়ায় ফেরার সুযোগ এল। যদিও সাহেল অঞ্চলের অনেক দেশ তখনও অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে ভ্রমণের জন্য অনুপযুক্ত, তবু আলজেরিয়ার দক্ষিণাঞ্চল ছিল তুলনামূলক নিরাপদ। তাই আমি দজানেত শহরের উদ্দেশে যাত্রা করি।

আলজিয়ার্স ও পরে দজানেতে পৌঁছে মনে হলো সময় যেন থেমে আছে। বিমানবন্দরের দীর্ঘ অপেক্ষা, জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, সীমিত সুবিধা—সবই পরিচিত লাগছিল। দজানেতও ছিল স্মৃতির মতোই—খেজুরবাগানে ঘেরা উপত্যকার শহর, কাদামাটির পুরোনো স্থাপনা, চা-ঘরে আড্ডা দেওয়া স্থানীয় মানুষ এবং ধীর গতির জীবন।

শিগগিরই আমি তুয়ারেগ গাইড আবদেসসালেম ও চালক আহমাদের সঙ্গে ইউনেস্কো স্বীকৃত তাসিলি ন’আজ্জের অঞ্চলের পথে রওনা হই। কয়েক দিনের মধ্যে আমাদের যাত্রা একটি ছন্দ খুঁজে পায়। রাত কাটত তারাভরা আকাশের নিচে বালুর ওপর, সকাল শুরু হতো সূর্যোদয়ের সোনালি আলোয় ভেসে থাকা মরুভূমি দেখে।

A journey back to the Algerian Sahara - Geographical

আমরা কখনও হাজার বছরের পুরোনো শিলা-চিত্র দেখতে থামতাম, কখনও ছোট গ্রাম ঘুরে দেখতাম। সেই সময় আহমাদ আগুন জ্বেলে চা বানাতেন। তুয়ারেগ সংস্কৃতিতে চা শুধু পানীয় নয়, এক ধরনের আচার। দিনে দুই বা তিনবার দীর্ঘ সময় নিয়ে তিন দফায় চা পরিবেশন করা হতো। মরুভূমির অসাধারণ দৃশ্যের মাঝেও এই চা-আড্ডাই ছিল আমার দিনের সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্ত।

তাসিলির গ্রামগুলো সকালে ও বিকেলে প্রাণচঞ্চল থাকলেও দুপুরের প্রচণ্ড রোদে প্রায় জনশূন্য হয়ে যেত। ইফনি, ইহরিরসহ বিভিন্ন বসতিতে মানুষের জীবনযাত্রা, জলাশয় ও খেজুরবাগান মরুভূমির কঠোর পরিবেশের মাঝেও জীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।

আমরা খুঁজেছি সেই শিলা-চিত্রগুলো, যা বলে এক ভিন্ন সাহারার গল্প। আজ যেখানে মরুভূমি, সেখানে একসময় ছিল সবুজ তৃণভূমি। চিত্রগুলোতে দেখা যায় হাতি, জিরাফ, সিংহ, বন্য কুকুর, শিকার, বিয়ে, যুদ্ধ ও দৈনন্দিন জীবনের নানা দৃশ্য। পরে যুক্ত হয়েছে ঘোড়া, রথ ও গৃহপালিত গবাদিপশুর ছবি। এগুলো শুধু শিল্প নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাসও বহন করে।

তবে সবকিছুর চেয়ে বেশি আমাকে মুগ্ধ করেছে ভূদৃশ্য। জলভরা গিরিখাত, লাল বালুর মাঝখানে অদ্ভুত আকারের শিলাস্তম্ভ, পাথরে পরিণত হওয়া বনভূমির মতো বিস্তৃত শিলাময় এলাকা—প্রতিটি স্থানই যেন প্রকৃতির একেকটি ভাস্কর্য।

আমরা তিসসুত তিসকালাল এলাকায় গিয়েছিলাম, যেখানে রয়েছে সাহারার বিখ্যাত ‘কাঁদতে থাকা গরু’ শিলাখোদাই। প্রায় ৮ হাজার বছর আগে তৈরি এই শিল্পকর্মে গরুর চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে বলে মনে হয়। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী, এক পশুপালক খরাপীড়িত দক্ষিণাঞ্চল থেকে এখানে এসেছিলেন চারণভূমির আশায়। কিন্তু এসে দেখেন এখানেও মরুভূমি। গরুগুলোর নয়, আসলে নিজের অশ্রুই তিনি পাথরে খোদাই করেছিলেন।

তিন সপ্তাহের সফরে সাহারার সামান্য অংশই দেখা সম্ভব ছিল। দজানেত থেকে আমি তামানরাসেতে যাই এবং আতাকোর মালভূমির আগ্নেয়গিরিময় ভূদৃশ্য ঘুরে দেখি। তুয়ারেগ গ্রাম, প্রাচীন মসজিদ, পাহাড়ি গিরিপথ—সবকিছুতেই ইতিহাস ও নিঃসঙ্গতার গভীর ছাপ।

শেষ দিকে আমরা পৌঁছাই আসেকরেমে, যার অর্থ ‘পৃথিবীর শেষ প্রান্ত’। এখানেই ফরাসি ধর্মযাজক শার্ল দ্য ফুকোর নির্মিত আশ্রম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই স্থানে চারদিকে শুধু পাহাড় আর অসীম নীরবতা।

সেখানে বসবাসকারী এক স্প্যানিশ পুরোহিতকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এত একাকীত্ব কীভাবে সহ্য করেন?

তিনি হেসে বলেছিলেন, “এখানে কোনো একাকীত্ব নেই। আমরা তিনজন আছি।”

পরে তিনি যোগ করেন, “অনেকে মনে করেন ফুকো এখানে নিঃসঙ্গতা খুঁজতে এসেছিলেন। আসলে তিনি এসেছিলেন নিঃসঙ্গতা থেকে পালাতে, কারণ এখানে তখন অনেক তুয়ারেগ শিবির ছিল।”

সেদিন রাতে আমরা আবার তিন দফা চা পান করলাম। সাধারণ খাবার খেলাম নীরবে। তারপর খোলা আকাশের নিচে শুয়ে তারাগুলো গুনতে গুনতে ভাবলাম, কত দীর্ঘ সময় পরে আবার এমন এক জায়গায় ফিরেছি।

রাতের গভীরে ঘুম ভেঙে দেখি সবকিছু স্তব্ধ। বাতাসও থেমে গেছে। চারপাশে ছড়িয়ে আছে এমন এক নির্মল নীরবতা, যা কেবল সাহারাই উপহার দিতে পারে।