মধ্যপ্রাচ্যে আবারও তীব্র হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক উত্তেজনা। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে, অন্যদিকে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলার দাবি করেছে। এই পরিস্থিতিতে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যত সংকটের মুখে পড়েছে এবং পুরো অঞ্চলে নতুন করে পূর্ণমাত্রার সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মার্কিন হামলার নতুন ধাপ
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের সামরিক নজরদারি সক্ষমতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা অবকাঠামো লক্ষ্য করে নির্ভুল হামলা চালানো হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব অভিযান ছিল ইরানের অব্যাহত আগ্রাসনের জবাব এবং আঞ্চলিক জলপথে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ ও মার্কিন বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত।

ইরানের পাল্টা আঘাত
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাসহ একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে তারা হামলা চালিয়েছে। এছাড়া জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে ১২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি করেছে তেহরান। ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে অবস্থানরত মার্কিন এফ-৩৫, এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এবং কমান্ড সেন্টার ছিল হামলার লক্ষ্য।
জর্ডানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে ছোড়া ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরানের সামরিক নেতৃত্ব ঘোষণা করেছে, প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ না থাকলে তারা কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাবে। একই সঙ্গে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধের দাবিও সামনে এসেছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র বলছে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
এই অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

কুয়েত ও বাহরাইনে সতর্কতা
ইরানি হামলার আশঙ্কায় কুয়েত সাময়িকভাবে তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয় এবং বেশ কয়েকটি ফ্লাইট অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলে আকাশপথ আবার চালু করা হয়। বাহরাইনেও একাধিকবার সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়েছে এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়।
ভারতের উদ্বেগ
ওমান উপকূলে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর খবরও সামনে এসেছে। এ ঘটনায় ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথে হামলার বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও ভারত আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।

শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ
চলমান সংঘাতের মধ্যেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুরোপুরি থেমে যায়নি। কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানে গিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করুক, তবে তেহরান দাবি করছে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
জাতিসংঘ মহাসচিবও সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শন ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার পর পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















