যুদ্ধ নিয়ে জনপরিসরের বিতর্ক প্রায়ই কৌশল, ভূরাজনীতি, সামরিক সক্ষমতা কিংবা রাষ্ট্রের স্বার্থকে ঘিরে আবর্তিত হয়। কোথায় হামলা হলো, কতটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলো, কোন পক্ষ কৌশলগত সুবিধা পেল—এসব বিশ্লেষণই সংবাদ শিরোনাম দখল করে। কিন্তু প্রতিটি সামরিক সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে কিছু মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, অপেক্ষা, ভয় এবং অনিশ্চয়তা। যুদ্ধকে যারা দূর থেকে দেখে, তাদের কাছে এটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন হতে পারে; কিন্তু যাদের প্রিয়জন যুদ্ধক্ষেত্রে, তাদের কাছে প্রতিটি দিন একটি ব্যক্তিগত পরীক্ষা।
আমার ছোট বোন প্রায় দুই দশক ধরে সামরিক বাহিনীতে কাজ করছে। এই দীর্ঘ সময়ে সে নানা দেশে এবং বিভিন্ন ঘাঁটিতে দায়িত্ব পালন করেছে। কয়েক মাস আগে তাকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি ঘাঁটিতে পাঠানো হয়। আমি জানতাম সে কোথায় আছে, জানতাম অঞ্চলটি অস্থির। তবু বাস্তবতা যেন পুরোপুরি অনুভব করিনি। দূরের সেই মরুভূমি, ঘাঁটি কিংবা সম্ভাব্য হামলা—সবকিছু যেন সংবাদপত্রের একটি খবরের মতোই মনে হতো। কারণ প্রতিদিনের কথোপকথনে যুদ্ধের চেয়ে বেশি জায়গা দখল করত একঘেয়েমি, খারাপ খাবার, অসহনীয় গরম কিংবা ধুলোবালির অভিযোগ।
কখনো কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদ পড়ে আমি তাকে জিজ্ঞেস করতাম, ঘটনাগুলো তার আশপাশে ঘটছে কি না। উত্তর এলে সাধারণত সে বলত, সংবাদে যা দেখছি তার সবকিছু বিশ্বাস না করতে। নিরাপত্তাজনিত সীমাবদ্ধতা আছে, আবার আমাকে অযথা উদ্বিগ্নও করতে চায় না। ফলে আমি জানি খুব সামান্য, আর সেই অল্প জানা কখনোই নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
শৈশবে আমাদের দুজনের জীবন ছিল একেবারেই ভিন্ন। আমি ছিলাম পড়াশোনা আর প্রচলিত জীবনপথের দিকে ঝোঁকা মানুষ। সে নিজের পথ খুঁজতে সময় নিয়েছে, ভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে যখন সে সত্যিকারের দূরে চলে গেল, তখনই আমাদের সম্পর্ক সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
প্রায় বিশ বছর আমরা একই অঙ্গরাজ্যে থাকিনি। তবু প্রতিদিন কথা বা বার্তা বিনিময় হয়। ছুটিতে এলে সে আমার বাড়িতেই থাকে। জীবনের কঠিন সময়েও আমরা একে অপরের পাশে থেকেছি। পরিবারের মানুষ হিসেবে এই দূরত্বের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া শিখেছি, কিন্তু কখনো অভ্যস্ত হতে পারিনি।
বিদেশে দায়িত্ব পালনকালে একবার সড়ক দুর্ঘটনায় সে গুরুতর আহত হয়েছিল। তখন প্রথম উপলব্ধি করি, হাজার হাজার মাইল দূরে বসে প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা করা কতটা অসহায় অভিজ্ঞতা। সেই দুশ্চিন্তা কেটে গেলেও অনিশ্চয়তা কখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
এবার তার দেশে ফেরার কথা ছিল মে মাসে। তারপর সময় পিছিয়ে জুনে গেল। পরে আবার আগস্টের শেষ দিকে। কিন্তু সামরিক জীবনে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের তারিখ প্রায়ই বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। নতুন নির্দেশ এলে পরিকল্পনাও বদলে যায়।
একদিন সকালে আমি নিজের বানানো খাবারের ছবি পাঠালাম। উত্তরে সে মজা করে জানাল, প্রতিদিন একই ধরনের খাবার খেতে খেতে বিরক্ত হয়ে গেছে। পরে দুজনেই নিজেদের পাকা চুলের ছবি পাঠিয়ে হাসাহাসি করলাম। ছয় হাজার মাইল দূরে থেকেও মধ্যবয়সী দুই বোনের এই ছোট ছোট কথোপকথনই আমাদের স্বাভাবিক জীবনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু কয়েক দিন পর সেই স্বাভাবিকতার ভেতরেই যুদ্ধ হঠাৎ প্রবেশ করল।
গভীর রাতে সে ভিডিও কল করল। অন্ধকারে শুধু তার হেলমেট আর সুরক্ষা জ্যাকেট দেখা যাচ্ছিল। শান্ত গলায় জানাল, তাদের ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে। যে ভবনে তার এক সহকর্মী ছিলেন, সেটিও আঘাত পেয়েছে। সহকর্মী বেঁচে গেছেন, কিন্তু পুরো পরিস্থিতি তখনও পরিষ্কার নয়।
এক মুহূর্তের জন্য সে ক্যামেরা ঘুরিয়ে আকাশ দেখাল। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রাতের সেই দৃশ্য কোনো চলচ্চিত্রের অংশ ছিল না; সেটাই ছিল তার বাস্তবতা। রেডিও যোগাযোগে হতাহতের খবরও শুনছিল তারা।
সেই মুহূর্তে আমার কাছে যুদ্ধের সংজ্ঞা বদলে গেল। আগে জানতাম, সে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে আছে। এখন জানলাম, সেই ঝুঁকি বাস্তবে তার দরজায় পৌঁছে গেছে। যে হামলায় কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, সেখান থেকে সে অল্পের জন্য বেঁচে ফিরেছে। এরপর থেকে সংবাদ সতর্কবার্তা আর তার পাঠানো বার্তাই হয়ে উঠেছে আমার প্রতিদিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আমি প্রতিনিয়ত তাকে জিজ্ঞেস করতে চাই না, সে বেঁচে আছে কি না। এমন প্রশ্ন নিষ্ঠুর শোনায়। কিন্তু উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত মনও শান্ত হয় না। দীর্ঘ সামরিক জীবনে এই প্রথম তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সে ভয় পায় কি না।
তার উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু নির্মমভাবে সত্য।
অবশ্যই ভয় পাই। কেউ যদি বলে সে ভয় পায় না, তাহলে সে সত্য বলছে না।
এই একটি বাক্য যুদ্ধ সম্পর্কে অসংখ্য রাজনৈতিক বক্তৃতার চেয়েও বেশি শক্তিশালী। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা মানুষরা অদম্য নায়ক নয়; তারা ভয়, ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা আর দায়িত্ব—সবকিছু একসঙ্গে বহন করা সাধারণ মানুষ।
আরেকটি বিষয়ও আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। হামলার খবর সংবাদমাধ্যমে আসতে প্রায় এক দিন লেগেছিল। অথচ আমি অনেক আগেই জানতাম কী ঘটেছে। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার সময় আমি খবরের চেয়ে বেশি ভরসা করেছি একটি ছোট্ট সংকেতের ওপর—আমি পাঠানো কোনো মজার ভিডিওতে তার একটি প্রতিক্রিয়া, কিংবা একটি ছোট্ট ‘লাইক’। সেটাই ছিল আমার কাছে প্রমাণ যে সে এখনও নিরাপদে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসে আমরা যুদ্ধ নিয়ে নানা মত দিই। কেউ বলে সামরিক উপস্থিতি জরুরি, কেউ বলে নয়। কেউ শাসকগোষ্ঠীর সিদ্ধান্তের পক্ষে, কেউ বিপক্ষে। এসব বিতর্ক গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সৈনিক কিংবা তাদের পরিবারের কাছে এই তর্কের ভাষা সম্পূর্ণ আলাদা।
তাদের কাছে যুদ্ধ মানে মানচিত্রে রঙ বদলানো নয়; বরং আরেকটি দিন নিরাপদে বেঁচে থাকা। তাই আমি তাকে খাবারের ছবি পাঠাব, বাড়ির কুকুরগুলোর ভিডিও পাঠাব, মজার ছোট ছোট ক্লিপ পাঠাব। কারণ এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই তাকে মনে করিয়ে দেয়, হাজার মাইল দূরে কেউ তার জন্য অপেক্ষা করছে। আর আমার কাছে এগুলোই নিশ্চিত করে, যুদ্ধের অন্ধকারের মধ্যেও সে এখনও জীবিত, এখনও আমাদের জীবনের অংশ।
কারেন মার্কস 
















