পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী দাবি করেছেন, বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে—এমন একটি ধারণা ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা হচ্ছে। শুক্রবার দেশটির সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বিশেষ করে বেলুচিস্তান নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ও পরিসংখ্যান
আইএসপিআরের মহাপরিচালক জানান, ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও সশস্ত্র বাহিনী যৌথভাবে মোট ৪০ হাজার ৩৪৮টি গোয়েন্দা-তথ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে ৩১ হাজারেরও বেশি অভিযান হয়েছে বেলুচিস্তানে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে পাকিস্তানে মোট ৩ হাজার ১৪৫টি সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে খাইবার পাখতুনখোয়ায় ১ হাজার ৯৭১টি, বেলুচিস্তানে ১ হাজার ১৪৮টি এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ২৬টি ঘটনা ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন, এ সময়ে নিশ্চিতভাবে সন্ত্রাসী হিসেবে শনাক্ত ২ হাজার ৮৪ জন নিহত হয়েছে। একই সময়ে সন্ত্রাসী হামলায় ৮১৯ পাকিস্তানি প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে ৩০৩ জন সেনাসদস্য, ১৯৪ জন পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং ৩২২ জন বেসামরিক নাগরিক।
আইএসপিআরের দাবি, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ২০০টি গোয়েন্দা-তথ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রতিদিন গড়ে ১০ জন সন্ত্রাসী নিহত হচ্ছে, যা অতীতের তুলনায় সর্বোচ্চ হার।
কেন বাড়ছে সন্ত্রাসী হামলা?
সংবাদ সম্মেলনে আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেন, সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা বাড়লেও নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা সক্ষমতাও বেড়েছে। তার দাবি, ২০২৪ সালের পর থেকে পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয়েছে এবং এখন প্রতি একজন শহীদের বিপরীতে গড়ে আড়াইজন সন্ত্রাসী নিহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অন্যান্য কৌশল দুর্বল হয়ে পড়ায় তারা হামলার মাত্রা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তিনি আফগান তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগও তোলেন।

বেলুচিস্তান নিয়ে সরকারি অবস্থান
আইএসপিআর প্রধানের মতে, বেলুচিস্তানের সমস্যা শুধু নিরাপত্তা ইস্যু নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রের আইনের শাসন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর বিষয়ও জড়িত।
তিনি বলেন, পাকিস্তানে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রয়োজন যেখানে সংবিধান ও আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নাগরিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এবং সংবিধান মেনে চলার দায়িত্বও পালন করতে হবে।
এলিট রাজনীতি, সরদার ব্যবস্থা ও বাহ্যিক প্রভাবের অভিযোগ
বেলুচিস্তানের দীর্ঘদিনের সংকটের পেছনে তিনি প্রভাবশালী এলিট গোষ্ঠী ও সরদার ব্যবস্থাকে দায়ী করেন। তার অভিযোগ, একটি অংশ বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামো বজায় রাখতে চায় এবং উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।
তিনি আরও দাবি করেন, কিছু বাহ্যিক শক্তি বেলুচিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৌশলগত গুরুত্বকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ভারত ও আফগানিস্তানকে ঘিরেও তিনি বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করেন, যদিও এসব দাবির পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
নিখোঁজ ব্যক্তি ও উন্নয়ন প্রকল্প
আইএসপিআরের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে গঠিত সরকারি কমিশনে এখন পর্যন্ত ১০ হাজার ৯০১টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৩৭২টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। নিষ্পত্তিকৃত মামলার মধ্যে ৪ হাজার ৮৯৬ জন বাড়ি ফিরেছেন, প্রায় ১ হাজার ৩০ জনকে কারাগারে শনাক্ত করা হয়েছে, ৩০৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং ২ হাজার ৪০০টি অভিযোগকে ভুল তথ্যভিত্তিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি জানান, বেলুচিস্তানে অবকাঠামো, সড়ক, তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন চলছে। প্রদেশটির আর্থসামাজিক উন্নয়নে ৭০ বিলিয়ন রুপি এবং বেলুচিস্তান স্পেশাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের জন্য আরও ২৪ বিলিয়ন রুপি বরাদ্দ রয়েছে।
সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সংবাদ সম্মেলনের শেষদিকে আইএসপিআরের মহাপরিচালক বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে নতুন ফ্রন্টিয়ার কর্পস (এফসি) কাঠামো, পুলিশ শক্তিশালীকরণ, বুলেটপ্রুফ যান সরবরাহ এবং নতুন কর্মকর্তাদের বেলুচিস্তানে নিয়োগের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য বেলুচিস্তানের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধি করা এবং উন্নয়নের মাধ্যমে প্রদেশটির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো।
পাকিস্তানের দাবি, বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে যে নেতিবাচক ধারণা ছড়ানো হচ্ছে, তা বাস্তবতার চেয়ে প্রচারণার অংশ বেশি এবং নিরাপত্তা ও উন্নয়ন—উভয় ক্ষেত্রেই সরকার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর দাবি, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, সরকারি পরিসংখ্যান এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার সর্বশেষ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
Sarakhon Report 

















