যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বিতর্কের একটি পরিচিত স্লোগান আবার সামনে এসেছে—“আমেরিকায় থাকতে হলে আমেরিকান হতে হবে।” এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কঠোর বক্তব্য: নতুন অভিবাসীরা নাকি আগের প্রজন্মের মতো পরিশ্রমী নন, তারা স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশতে চান না, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন এবং সমাজের মূলধারায় যুক্ত হওয়ার ইচ্ছাও তাদের নেই।
এই যুক্তি রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু ইতিহাস ও গবেষণার আলোকে তা খুব শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্রের অতীত অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রায় প্রতিটি অভিবাসী ঢেউকেই একই ধরনের অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সময়ের ব্যবধানে সেই অভিযোগগুলো ভুল প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক স্মৃতি সাধারণত ইতিহাসের তুলনায় অনেক ছোট।
অভিবাসনের সাফল্যের বাস্তব চিত্র
উনিশ শতকের শেষ ভাগ এবং বিশ শতকের শুরুতে ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যে বিপুল সংখ্যক মানুষ এসেছিল, তাদের নিয়েও তখনকার সমাজে সন্দেহ ছিল। আইরিশ, ইতালীয়, পূর্ব ইউরোপীয় কিংবা স্ক্যান্ডিনেভীয় অভিবাসীদের অনেকেই “অপরিচিত”, “অযোগ্য” কিংবা “অসামঞ্জস্যপূর্ণ” হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলেন। তাদের ভাষা আলাদা ছিল, সংস্কৃতি আলাদা ছিল, আর অর্থনৈতিক অবস্থাও ছিল দুর্বল।
তবে পরবর্তী প্রজন্মের অভিজ্ঞতা অন্য গল্প বলে। অর্থনৈতিক সুযোগ, শিক্ষা এবং সামাজিক সংযোগের মাধ্যমে অভিবাসীদের সন্তানরা ক্রমশ উপরে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা স্থানীয় দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের চেয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে।
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও একই প্রবণতা দেখায়। আজকের অভিবাসীদের সন্তানরাও সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার উন্নত সুযোগের খোঁজে নতুন এলাকায় বসতি গড়ে, তাদের সন্তানদের সামনে সম্ভাবনার দরজাও বেশি খোলা থাকে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভিবাসীরা সাধারণত সেই সব অঞ্চলে যেতে আগ্রহী যেখানে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও আয় বৃদ্ধির সুযোগ বেশি। ফলে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এমন পরিবেশে বড় হয় যা সামাজিক গতিশীলতাকে ত্বরান্বিত করে।
সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার গল্পও নতুন নয়
অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির আরেকটি সাধারণ অভিযোগ হলো—নতুন অভিবাসীরা স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে একীভূত হতে চান না। কিন্তু ইতিহাস বলছে, সংস্কৃতিগত অভিযোজন কখনওই তাৎক্ষণিক প্রক্রিয়া ছিল না।
এক শতাব্দী আগে ইউরোপীয় অভিবাসীরাও নিজেদের ভাষা, ধর্মীয় পরিচয় ও সামাজিক রীতিনীতি দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রেখেছিল। অনেক পরিবার কয়েক প্রজন্ম পর গিয়ে পুরোপুরি ইংরেজিভাষী হয়েছে। একই চিত্র আজও দেখা যায়।
তবে বাস্তবে নতুন অভিবাসীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সংহতির নানা সূচক ইতিবাচক। সন্তানদের জন্য স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নাম বেছে নেওয়া, ভিন্ন জাতিগত পটভূমির মানুষের সঙ্গে বিবাহ, শিক্ষাব্যবস্থায় অংশগ্রহণ এবং কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় উপস্থিতি—এসব ক্ষেত্রেই বর্তমান অভিবাসীরা অতীতের তুলনায় অন্তত সমপর্যায়ের, অনেক ক্ষেত্রে আরও দ্রুত অভিযোজিত হচ্ছে।
অপরাধ নিয়ে প্রচলিত ধারণারও বাস্তব ভিত্তি দুর্বল। গবেষণায় দেখা গেছে, অভিবাসীরা সাধারণভাবে স্থানীয়ভাবে জন্ম নেওয়া জনগোষ্ঠীর তুলনায় কম হারে কারাবন্দী হয়। সময়ের সঙ্গে এই ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়েছে।
![]()
কেন বারবার ফিরে আসে একই বিতর্ক?
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, যদি বাস্তবতা এতটা নেতিবাচক না হয়, তবে অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য এত জনপ্রিয় কেন?
এর উত্তর রাজনীতির ভেতরেই লুকিয়ে আছে। দ্রুত জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেক মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে। রাজনৈতিক নেতারা প্রায়ই সেই উদ্বেগকে ব্যবহার করেন। নতুন আগতদের একটি প্রতীকী হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা তুলনামূলক সহজ, বিশেষ করে যখন সমাজে বিভাজন ইতোমধ্যেই বাড়ছে।
এই প্রবণতাও নতুন নয়। ১৯২০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে এমন রাজনৈতিক চাপই কঠোর অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ আইনের জন্ম দিয়েছিল। সেই সময়ও যুক্তি ছিল—দেশের পরিচয় রক্ষা করতে হবে। আজকের বিতর্কে ভাষা বদলেছে, কিন্তু মূল উদ্বেগের কাঠামো খুব একটা বদলায়নি।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। বর্তমান আমেরিকায় অভিবাসন প্রশ্নে রাজনৈতিক মেরুকরণ অনেক বেশি। একপক্ষ অভিবাসনকে জাতীয় শক্তির উৎস হিসেবে দেখে, অন্যপক্ষ এটিকে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণ হিসেবে তুলে ধরে। ফলে নীতিনির্ধারণেও বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যাচ্ছে।
ভবিষ্যতের আমেরিকা কোন পথে?
অভিবাসন নীতির ঘনঘন পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিছু দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বিদেশি শিক্ষার্থী, গবেষক, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবীরা যদি দেশটিকে অনিশ্চিত বা অনাগ্রহী বলে মনে করেন, তবে তারা অন্য গন্তব্য বেছে নিতে পারেন।
তবু ইতিহাসের বড় শিক্ষা হলো, অভিবাসীরা সাধারণত সুযোগের সন্ধানে আসে এবং সুযোগ পেলে তারা সমাজের উৎপাদনশীল অংশে পরিণত হয়। তাদের সন্তানরা আরও দ্রুত এগিয়ে যায়। প্রতিটি যুগে তাদের নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে, কিন্তু সময়ের পরীক্ষায় সেই সংশয়ের বেশিরভাগই টেকেনি।
আজকের অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও সম্ভবত ব্যতিক্রম হবে না। রাজনৈতিক স্লোগান হয়তো পরিবর্তিত হবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির বিকাশে নতুন আগতদের ভূমিকা অব্যাহত থাকবে। ইতিহাস অন্তত সেই দিকেই ইঙ্গিত করে।
জাস্টিন ফক্স 


















