বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে একটি কনটেইনারবাহী জাহাজে হামলার ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, বৃহস্পতিবার প্রণালি অতিক্রম করার সময় একটি জাহাজে হামলা চালানো হয়। এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে স্বাভাবিক হতে শুরু করা নৌযান চলাচল আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরান হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সতর্ক করে জানিয়েছিল যে, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অনেক জাহাজ ওমান উপকূলঘেঁষা বিকল্প রুট ব্যবহার করছিল। তবে ইরান সেই পথকে ঝুঁকিপূর্ণ ও অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করে।
হামলার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৫ ডলারে পৌঁছায়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দামও ২ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রায় ৭২ ডলারে ওঠে।
নৌপথে নতুন সংকট
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, জাহাজটিতে ড্রোনের মাধ্যমে হামলা চালানো হয়েছে। ব্রিটিশ রয়্যাল নেভি পরিচালিত ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসও একটি কার্গো জাহাজে অজ্ঞাত উৎস থেকে ছোড়া প্রজেক্টাইল আঘাত হানার তথ্য দিয়েছে। এতে জাহাজটির ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আক্রান্ত জাহাজটির নাম ‘এভার লাভলি’। এটি তাইওয়ানভিত্তিক শিপিং কোম্পানি এভারগ্রিন মেরিনের মালিকানাধীন। ঘটনাটি ওমান উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় ঘটে, যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে অনেক জাহাজ চলাচল করছিল।
হামলার প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) উপসাগরে আটকে থাকা শত শত জাহাজের নাবিকদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় নতুন চাপ
এই ঘটনা এমন সময় ঘটল, যখন হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা চলছে। একই সময়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বাহরাইনে উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
রুবিও বৈঠকে বলেন, আলোচনার মাধ্যমে নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্তে আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ বিবেচনায় রাখা হবে। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক জলপথ কোনো একক রাষ্ট্রের মালিকানাধীন নয় এবং এই নীতিই বৈশ্বিক নৌপরিবহন ব্যবস্থার ভিত্তি।
অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের নৌবাহিনী আবারও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হলে তাদের সঙ্গে সমন্বয় করা বাধ্যতামূলক। গত সপ্তাহে ঘোষিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি কাঠামোর পর থেকেও তেহরান একই অবস্থানে রয়েছে।
বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাবের আশঙ্কা
বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ ও উত্তেজনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে অনেক জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকে ছিল। সাম্প্রতিক সপ্তাহে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় জাহাজ চলাচল বাড়তে শুরু করেছিল।
সামুদ্রিক তথ্য প্রতিষ্ঠান ক্লেপারের হিসাবে, বুধবার প্রণালিটি দিয়ে প্রায় ৭০টি জাহাজ চলাচল করেছে, যার মধ্যে ২৯টি ছিল তেলবাহী ট্যাংকার। তবে যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন ১৩০টিরও বেশি জাহাজ এই পথে চলাচল করত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক হামলা প্রমাণ করেছে যে হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আরও স্পষ্ট ও কার্যকর সমঝোতা প্রয়োজন। অন্যথায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও সামুদ্রিক বাণিজ্য আবারও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ইরানের হামলার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়েছে।
ইরানের হামলায় তেলের দাম বৃদ্ধি
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে এই ঘটনা।
#ইরান #হরমুজ_প্রণালি #তেলের_দাম #ব্রেন্ট_ক্রুড #মার্কোরুবিও #মধ্যপ্রাচ্য #জ্বালানি_সংকট #পারস্যউপসাগর #বিশ্ববাণিজ্য #সারাক্ষণ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















