প্রায় ৮০ বছর বয়সী এক দম্পতির জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হওয়ার গল্প তুলে ধরেছেন অর্থবিষয়ক মনোচিকিৎসক ভিকি রেনাল। দীর্ঘদিন ধরে ছেলের আর্থিক সংকটে পাশে দাঁড়াতে গিয়ে তারা নিজেদের সঞ্চয় খরচ করেছেন, এমনকি চার দশকের বেশি সময় ধরে বসবাস করা বাড়িটিও বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। এখন প্রশ্ন উঠেছে—বার্ধক্যে নিজের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন, নাকি সন্তানের প্রয়োজন মেটাতে আরও একবার সবকিছু উৎসর্গ করবেন?
দম্পতির ভাষ্য অনুযায়ী, নাতির যৌথ অভিভাবকত্ব নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সময় তাদের ছেলে বড় অঙ্কের কর-সংক্রান্ত ঋণে পড়ে। সেই ঋণের দায়ও শেষ পর্যন্ত বাবা-মাকেই নিতে হয়েছে। বাড়ি বিক্রি করে ছোট একটি বাংলোতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। কিন্তু এত বড় ত্যাগের পরও মায়ের মনে আশঙ্কা, ভবিষ্যতে যদি ছেলে আবার এমন কোনো সমস্যায় পড়ে, যার জন্য নতুন করে অর্থসহায়তা প্রয়োজন হয়, তখন তিনি কী করবেন?
এর আগেও ছেলে তাদের কাছ থেকে একাধিকবার ঋণ নিয়েছে, যার বেশির ভাগই আর ফেরত আসেনি। যদিও ছেলে সবসময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে, তবু বয়সের এই পর্যায়ে এসে বাবা-মা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
মানসিক টানাপোড়েনের মূল কারণ
ভিকি রেনালের মতে, অনেক পরিবারেই ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ একসময় এমনভাবে মিশে যায় যে, সন্তানের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করাকে বাবা-মা স্বার্থপরতা বা ভালোবাসার অভাব বলে মনে করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তারা সন্তানের সমস্যার সমাধানকেও নিজের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন।
তিনি মনে করিয়ে দেন, সন্তানের প্রতি ভালোবাসা মানে নিজের স্বাস্থ্য, মানসিক শান্তি কিংবা আর্থিক নিরাপত্তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিসর্জন দেওয়া নয়। এই দম্পতি ইতোমধ্যেই সন্তানের জন্য অসাধারণ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাই এখন নিজেদের প্রয়োজন ও ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবার অধিকার তাদের রয়েছে।

নিজের প্রয়োজনের কথাও ভাবতে হবে
রেনাল বলেন, অনেক বাবা-মা বছরের পর বছর শুধু ভাবেন—‘আমার সন্তানের কী প্রয়োজন?’ কিন্তু একসময় ‘আমার নিজের কী প্রয়োজন?’—এই প্রশ্নটি হারিয়ে যায়।
তিনি মনোবিশ্লেষক হেইঞ্জ কোহুটের একটি ভাবনা উল্লেখ করে বলেন, নিজের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া স্বার্থপরতা নয়; বরং নিজের জীবন, শক্তি ও মানসিক সুস্থতা রক্ষার একটি উপায়।
তার মতে, অনেক সময় অপরাধবোধের কারণেই বাবা-মা ‘আর নয়’ বলতে পারেন না। কিন্তু নিজেদের কাছে প্রশ্ন রাখা দরকার—তারা কি সত্যিই সন্তানকে কষ্ট থেকে রক্ষা করছেন, নাকি সন্তানের কষ্ট দেখতে না চাওয়ার মানসিক চাপ থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাইছেন?
সীমানা টানাও ভালোবাসার অংশ
রেনালের ভাষ্য, সন্তান লালন-পালনে আত্মত্যাগের ভূমিকা থাকলেও চিরদিন তার আর্থিক ভরসা হয়ে থাকা বাবা-মায়ের দায়িত্ব নয়। প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের প্রতিটি সংকটে উদ্ধারকর্তার ভূমিকা নেওয়া অনেক সময় তাকে স্বাধীনভাবে জীবন পরিচালনার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করতে পারে।
তিনি পরামর্শ দেন, বাবা-মায়ের উচিত আগে থেকেই নিজেদের সামর্থ্যের একটি স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করা। সেই সীমার বাইরে গিয়ে অর্থ সহায়তা না করে সন্তানের সঙ্গে বসে অন্য সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
কঠিন কথাটি আগেভাগেই বলা ভালো
রেনালের মতে, নতুন কোনো সংকট তৈরি হওয়ার আগেই সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা সবচেয়ে কার্যকর পথ। বাবা-মা বলতে পারেন, তারা এতদিন সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা করেছেন, কিন্তু এখন বয়স ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আর্থিক সহায়তার সীমা টানতে বাধ্য হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘না’ বলার সিদ্ধান্তে সন্তান কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে অপরাধবোধে ভোগারও প্রয়োজন নেই। কারণ এটি ভালোবাসা থেকে সরে আসা নয়, বরং নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া।
দীর্ঘদিনের পারিবারিক বাড়ি বিক্রি করা এবং বার্ধক্যের জন্য সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করার পর এখন এই দম্পতির নিজের জীবন, স্বাস্থ্য ও আর্থিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সময় এসেছে। এতে সন্তানের প্রতি ভালোবাসা কমে যায় না; বরং জীবনের শেষ অধ্যায়ে নিজেদের প্রতিও দায়িত্ব পালন করা হয়।
বার্ধক্যে সন্তানের আর্থিক সহায়তার সীমা কোথায়? বিশেষজ্ঞের পরামর্শে জেনে নিন কীভাবে ভালোবাসা, দায়িত্ব ও নিজের আর্থিক নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রাখা সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















