উত্তর আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে রাজি হয়নি যুক্তরাষ্ট্র। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য কাঠামো এখনই বাতিল না হলেও এর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তপারের বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং উৎপাদন খাতের ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বর্তমান চুক্তি কার্যকর থাকলেও আগামী ১০ বছর ধরে প্রতি বছর তিন দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে এর কার্যকারিতা ও শর্ত পর্যালোচনা হবে। একই সময়ে নতুন শর্ত নিয়ে আলোচনাও চলতে থাকবে।
নতুন আলোচনার পথে তিন দেশ
যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে অনেকেই আগেই অনুমান করেছিলেন। কারণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপসহ চুক্তির একাধিক অংশে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এমনকি অতীতে তিনি পুরো চুক্তি বাতিলের সম্ভাবনার কথাও বলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যমান চুক্তির সীমাবদ্ধতা দূর করা এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে নতুন আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হবে। এ বছরের বাকি সময়জুড়েই এই আলোচনা অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য
এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় প্রতি বছর প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়। গত বছর শুধু কানাডা ও মেক্সিকায় যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬৭০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা অন্য অনেক বড় বাজারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য।
এই কারণে চুক্তির ভবিষ্যৎ শুধু তিন দেশের জন্য নয়, উত্তর আমেরিকার সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে চাপ
চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা করতে পারছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। এর প্রভাব ইতোমধ্যেই কানাডা ও মেক্সিকোর অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে।
কানাডায় ধারাবাহিকভাবে কয়েক প্রান্তিক ধরে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ কমেছে এবং নতুন কর্মসংস্থানও স্থবির রয়েছে। অন্যদিকে ২০২৫ সাল থেকে মেক্সিকোর গাড়ি শিল্পে প্রায় এক লাখ কর্মসংস্থান হারানোর তথ্য সামনে এসেছে।

গাড়ি শিল্পে কঠোর শর্ত চাইছে যুক্তরাষ্ট্র
নতুন আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র বিশেষভাবে গাড়ি শিল্পে আরও কঠোর শর্ত আরোপ করতে চায়। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, একটি গাড়ির অন্তত অর্ধেক যন্ত্রাংশ ও উপকরণ যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত হতে হবে।
বর্তমান নিয়মে গাড়ির ৭৫ শতাংশ উপকরণ উত্তর আমেরিকার যেকোনো দেশ থেকে এলেই শর্ত পূরণ হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজস্ব উৎপাদনের অংশ বাড়াতে আগ্রহী। একই সঙ্গে চীনা উপাদানের ব্যবহার কমানো এবং কানাডা ও মেক্সিকোর মাধ্যমে চীনা গাড়ি ও ট্রাকের প্রবেশ সীমিত করার বিষয়েও জোর দিচ্ছে।
মেক্সিকো ও কানাডার অগ্রাধিকার
মেক্সিকোর প্রধান লক্ষ্য হলো বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তি টিকিয়ে রাখা এবং যত বেশি সম্ভব পণ্যকে শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কের সুবিধার আওতায় রাখা। পাশাপাশি উত্তর আমেরিকায় উৎপাদন বাড়ানো, এশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমানো এবং আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রস্তাবও দিয়েছে দেশটি।
অন্যদিকে কানাডা মনে করছে, এই চুক্তি দেশটির ব্যবসা ও রপ্তানিকারকদের জন্য স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য বাজার নিশ্চিত করে। তাই তারা এমন একটি সমাধান চায়, যাতে দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্যিক আস্থা অক্ষুণ্ন থাকে।
সামনের পথ কতটা কঠিন
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার শুরুতে যে অবস্থানগুলো নেওয়া হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত একই থাকবে না। আলোচনা যত এগোবে, ততই সমঝোতার নতুন পথ তৈরি হতে পারে। তবে বার্ষিক পর্যালোচনার বাধ্যবাধকতা এবং সম্ভাব্য নতুন শুল্কব্যবস্থা ব্যবসায়ীদের জন্য দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা তৈরি করে রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী কয়েক মাসের আলোচনার ফলাফলের ওপর।
উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সিদ্ধান্তে কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্পে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















