যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ অধিবেশন শেষ হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আদালতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রায়কে নিজের রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছেন। যদিও কয়েকটি বড় মামলায় তিনি ধাক্কা খেয়েছেন, তবু সামগ্রিকভাবে আদালতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং অভিবাসনসহ বিভিন্ন নীতিগত ইস্যুতে তাঁর প্রশাসনকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের এই ধারাবাহিক রায় আগামী কয়েক বছর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি, প্রশাসন ও সাংবিধানিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্বাহী ক্ষমতা নিয়ে বড় জয়
সবচেয়ে আলোচিত রায়গুলোর একটি ছিল এমন একটি মামলায়, যেখানে সুপ্রিম কোর্ট দীর্ঘদিনের একটি নজির বাতিল করে জানায় যে প্রেসিডেন্ট স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কমিশনারদের প্রয়োজনে অপসারণ করতে পারবেন।
এই সিদ্ধান্তের ফলে কয়েক দশক ধরে চলে আসা একটি সাংবিধানিক ব্যাখ্যায় বড় পরিবর্তন এসেছে। ট্রাম্প এটিকে গত একশ বছরের মধ্যে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে আদালতের সংখ্যালঘু বিচারপতিরা এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁদের মতে, এটি দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক চর্চাকে দুর্বল করবে এবং রাজনৈতিক প্রভাব থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সরকারি চাকরি নিয়েও বাড়ছে অনিশ্চয়তা
এই রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি ফেডারেল সরকারের বিপুলসংখ্যক কর্মচারীর চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ইতোমধ্যে হাজারো সরকারি কর্মীকে চাকরি থেকে সরিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এখন প্রশ্ন উঠেছে, ভবিষ্যতে কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের এই ক্ষমতার ওপর কতটা সীমা আরোপ করতে পারবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম
তবে সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্টকে সব ক্ষেত্রেই পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়নি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় আদালত জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে প্রেসিডেন্ট ইচ্ছামতো অপসারণ করতে পারবেন না। আদালতের মতে, দেশের মুদ্রানীতি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা সাংবিধানিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে একদিকে বিভিন্ন স্বাধীন সংস্থার প্রধানদের অপসারণের ক্ষমতা বাড়লেও, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষেত্রে সেই সীমাবদ্ধতা বহাল থাকল।
অভিবাসন ইস্যুতেও ট্রাম্পের পক্ষে রায়
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের নির্বাহী আদেশকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে আদালত ট্রাম্পকে বড় ধাক্কা দিলেও, অভিবাসনসংক্রান্ত আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তাঁর প্রশাসনের অবস্থানকে সমর্থন করেছে।
আদালত রায় দিয়েছে, মেক্সিকোতে অপেক্ষমাণ অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের দাবি করতে পারবেন না। পাশাপাশি কিছু গ্রিন কার্ডধারীর ক্ষেত্রে নতুন করে প্রবেশের নিয়ম প্রয়োগ সহজ হয়েছে। এছাড়া হাইতি ও সিরিয়ার কয়েক লাখ মানুষের জন্য অস্থায়ী সুরক্ষা সুবিধা বাতিলের পথও উন্মুক্ত হয়েছে।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বহাল
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী এবং সংবিধানের আওতাভুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি নাগরিকত্বের অধিকারী।

তবে এই মামলায় আদালতের অভ্যন্তরে মতপার্থক্যও ছিল। ফলে ভবিষ্যতে বিষয়টি নিয়ে আরও আইনি বিতর্কের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
সুপ্রিম কোর্টের আগামী অধিবেশনেও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, ভোটার নিবন্ধনের নতুন নিয়ম এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের লিঙ্গ পরিবর্তনসংক্রান্ত চিকিৎসা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
এর মধ্যেই রক্ষণশীল বিচারপতিদের একজন অবসরে গেলে ট্রাম্প নতুন বিচারপতি নিয়োগের সুযোগ পেতে পারেন। এমনটি হলে সুপ্রিম কোর্টে তাঁর প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং আগামী দিনের বহু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সিদ্ধান্তেও তার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।
ট্রাম্পের জন্য তাই সর্বশেষ অধিবেশন ছিল একদিকে কিছু সীমাবদ্ধতার স্মারক, অন্যদিকে ক্ষমতার পরিসর বাড়ানোর বড় এক সাফল্যের অধ্যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















