১০:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনই মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা চীনা ব্যবসায়ীর ১ কোটি টাকা নিয়ে চালক উধাও, মেসেজে লিখলেন ‘আমি বিশ্বাস ভঙ্গ করেছি’ কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফিরলেন ৩৮ বাংলাদেশি, ফেরার অপেক্ষায় আরও ১,৮০০ অস্ত্রের মুখে বিকাশকর্মীর ৩ লাখ টাকা ছিনতাই, পালাল ৬ দুর্বৃত্ত নেপালে বন্যার তাণ্ডব: ‘নিখোঁজদের দেয়ালে’ স্বজন খুঁজছেন হাজারো মানুষ ভারতের ৭.৮% জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে কেন উঠছে প্রশ্ন? নেপালের বন্যাবিধ্বস্ত উপত্যকায় ধ্বংসস্তূপ ছাড়া কিছুই নেই ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ নয়, প্রকৃত তথ্য জানাল পুলিশ সাভারে নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু মিশেল কোগান: মিশেলিন তারকা পাওয়া রাঁধুনি, যাঁর পাই এখন নিউইয়র্কে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনই মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরার প্রশ্নকে শুধু মানবিক সংকট, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কিংবা প্রশাসনিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতর রাজনৈতিক দিকটি আড়ালে পড়ে যায়। আসল প্রশ্ন হলো—মিয়ানমারের রাজনৈতিক সমাজে রোহিঙ্গাদের অবস্থান কী? দেশটির যে ফেডারেল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে ‘স্প্রিং রেভল্যুশন’ এগোচ্ছে, সেখানে রোহিঙ্গারা কি সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন?

২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে মিয়ানমারের সামরিক শাসকগোষ্ঠীর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশ প্রত্যাবাসনের জন্য ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার নাম দিয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা যায়নি এবং ৪ হাজার ২৪১ জনকে কথিত সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে, এর কয়েক সপ্তাহ আগেই সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে পালাতে গিয়ে রোহিঙ্গাদের বহনকারী দুটি নৌকা মিয়ানমারের উপকূলের কাছে নিখোঁজ হয়। জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর ধারণা, ওই নৌকাগুলোর ৫০০ জনের বেশি যাত্রী মারা গেছেন।

একদিকে রোহিঙ্গারা রাষ্ট্রীয় নথিতে নাম ও সংখ্যায় পরিণত হচ্ছেন, অন্যদিকে নিরাপত্তার সন্ধানে সমুদ্রপথে প্রাণ হারাচ্ছেন। কিন্তু এই দুই বাস্তবতার কোনোটিই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মূল প্রশ্নের উত্তর দেয় না—রোহিঙ্গারা কি মিয়ানমারের রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অংশ?

জান্তা যে উত্তর দিয়েছে, তা হলো না। এখন প্রশ্নটি স্প্রিং রেভল্যুশনের সামনে।

বিপ্লবের অর্থ কি শুধু জান্তার পতন?

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অনিশ্চয়তার আশংকা - BBC  News বাংলা

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে। এর পর যে জাতীয় প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, তা শুধু পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার আন্দোলন ছিল না। স্প্রিং রেভল্যুশনের লক্ষ্য ছিল সামরিক আধিপত্য ও ২০০৮ সালের সংবিধানের কাঠামো ভেঙে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ফেডারেল গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করা।

২০২৫ সালের অক্টোবর নাগাদ জান্তা-বিরোধী শক্তি ও তাদের মিত্র জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো সামরিক বাহিনীর চেয়েও বেশি ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছিল। এর বিপরীতে সামরিক সরকার নিজেদের বৈধতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা দেখাতে নির্বাচনের আয়োজন করে। কিন্তু সেই নির্বাচন ছিল সীমিত, নিয়ন্ত্রিত এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিকে বাইরে রেখে পরিচালিত। পশ্চিমা সরকার ও জাতিসংঘ নির্বাচনটিকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে স্বীকৃতি দেয়নি।

ফলে ক্ষমতার কাঠামোর কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন আর প্রকৃত রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। আর এই পার্থক্যই রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

রোহিঙ্গাদের জন্য বঞ্চনা নতুন নয়

মিয়ানমারের সামরিকীকৃত ও জাতিগত রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শিকার রোহিঙ্গারা। নে উইনের ১৯৬২ সালের অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের জাতিগত চরিত্র আরও কঠোর হয়। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন নাগরিকত্বের প্রশ্নকে রাষ্ট্রনির্ধারিত ‘জাতীয় নৃগোষ্ঠী’র সদস্যত্বের সঙ্গে যুক্ত করে। এর ফলে বহু প্রজন্ম ধরে মিয়ানমারে বসবাস করেও রোহিঙ্গারা কার্যত রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েন।

১৯৭৮, ১৯৯১-৯২ ও ২০১২ সালের সহিংসতার পর ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। জাতিসংঘের তথ্য-অনুসন্ধানী মিশন সেই ঘটনাকে গণহত্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছিল। বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বিবেচনায় রয়েছে।

২০২১ সালের পর মিয়ানমারের অন্যান্য জনগোষ্ঠীও সামরিক সহিংসতার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। বামার, কারেন, চিনসহ বহু সম্প্রদায় বিমান হামলা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর রাষ্ট্রীয় সহিংসতার অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সংহতি তৈরি করে, তাহলে রোহিঙ্গাদেরও সেই নতুন রাজনৈতিক চুক্তির অংশ হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কিন্তু সেটি এখনো নিশ্চিত নয়।

প্রতিশ্রুতি থেকে আইনে যেতে হবে

স্প্রিং রেভল্যুশনের নেতৃত্ব রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে মিয়ানমারের অতীত সরকারগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট বা এনইউজি রোহিঙ্গাদের আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জান্তার পতনের পর পূর্ণ নাগরিকত্বসহ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের কথাও বলা হয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: মিয়ানমারের সাথে আলোচনা বন্ধ, জাতিসংঘে বিষয়টি আবার  তুলবে বাংলাদেশ - BBC News বাংলা

কিন্তু রাজনৈতিক ঘোষণা এবং বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। রোহিঙ্গাদের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি নিয়ে প্রতিরোধ আন্দোলনের ভেতরেও প্রশ্ন উঠেছে।

এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, রোহিঙ্গারা যে ভূখণ্ডে ফিরে যাবেন, সেই রাখাইন রাজ্য এখন এনইউজির নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে প্রত্যাবাসনের পর তাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, জমির মালিকানা কিংবা রাজনৈতিক অধিকার বাস্তবে কে নিশ্চিত করবে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অস্পষ্ট।

তাই রোহিঙ্গাদের অধিকারকে বিজয়ের পর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি হিসেবে রেখে দিলে চলবে না। যে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য লড়াই হচ্ছে, তার আইন ও প্রতিষ্ঠান তৈরির সময়ই এই অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

রাখাইনে শাসক বদলেছে, কিন্তু বঞ্চনার কাঠামো নয়

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বাস্তবতা আরও জটিল করেছে রাখাইন রাজ্যের সাম্প্রতিক ক্ষমতার পরিবর্তন। ২০২৩ সালে যুদ্ধ পুনরায় তীব্র হওয়ার পর আরাকান আর্মি রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টি নিয়ন্ত্রণে নেয়। কিছু হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যের ৯০ শতাংশেরও বেশি ভূখণ্ড এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে, যার মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে পুরো সীমান্তও রয়েছে।

আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান সেখানে নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনা করছে। আদালত, কর আদায়, ভূমি নিবন্ধন ও স্বাস্থ্য বিভাগের মতো প্রতিষ্ঠানও তারা গড়ে তুলেছে।

কিন্তু রোহিঙ্গাদের জন্য এই নতুন প্রশাসনের অভিজ্ঞতা নিরাপত্তা ও অধিকারের নিশ্চয়তা তৈরি করেনি। বিভিন্ন মানবাধিকার পর্যবেক্ষণে বিচারবহির্ভূত হত্যা, জোরপূর্বক শ্রম, অগ্নিসংযোগ এবং চলাচল ও জীবিকার ওপর কঠোর বিধিনিষেধের অভিযোগ উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা রাখাইন ছেড়ে পালিয়েছে বলে বিভিন্ন হিসাব রয়েছে।

আরাকান আর্মি এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে যুদ্ধকালীন নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে। কিন্তু স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন আরও কঠোর।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো নাগরিকত্বের প্রশ্ন। ২০২৬ সালের মে মাসে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মিয়ানমার রিসার্চ সেন্টারের একটি নীতিপত্রে বলা হয়, আরাকান আর্মি ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনকে চ্যালেঞ্জ করেনি এবং এর বিকল্প কোনো আইনি কাঠামোও প্রস্তাব করেনি।

অর্থাৎ ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ বদলেছে, কিন্তু রোহিঙ্গাদের বাদ দেওয়ার আইনি কাঠামো বদলায়নি।

কাগজে প্রত্যাবাসন, বাস্তবে শূন্য

২০১৮ ও ২০১৯ সালে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের দুটি উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছিল। কারণ নিরাপদে ফেরার বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা তারা পাননি।

২০২৬ সালে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ বেড়েছে, কিন্তু মূল সমস্যাটি একই রয়ে গেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ জানায়, মিয়ানমার ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যাচাই করা নামের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫১-এ পৌঁছায়। জুলাইয়ের শেষে বাংলাদেশ মোট ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের নাম জমা দিয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য প্রক্রিয়াজাত এবং ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে সাবেক রাখাইনবাসী হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

কিন্তু একজন রোহিঙ্গাও এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফেরেননি।

কারণ প্রত্যাবাসনের প্রকৃত প্রশ্ন তালিকায় নাম তোলার নয়। প্রশ্ন হলো—ফিরে গেলে তাদের নাগরিকত্ব কী হবে? নিরাপত্তার দায়িত্ব কার? তাদের গ্রাম কে পরিচালনা করবে? তারা ভোট দিতে পারবে কি না? জমির মালিকানা থাকবে কি না? রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সুযোগ থাকবে কি না?

নাম যাচাই করে এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না।

মিয়ানমারের বিবৃতি কি রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল করে তুলছে? - BBC News বাংলা

মূল প্রশ্ন: কারা মিয়ানমারের নাগরিক?

রোহিঙ্গা সংকটের কেন্দ্রে তাই প্রত্যাবাসন নয়, নাগরিকত্ব। মিয়ানমারের সরকারি পরিভাষায় রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করা তাদেরকে বিদেশি হিসেবে প্রতিষ্ঠার একটি রাজনৈতিক পদ্ধতি। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনও জন্ম, দীর্ঘদিনের বসবাস বা ঐতিহাসিক উপস্থিতির বদলে রাষ্ট্রনির্ধারিত জাতিগত পরিচয়কে নাগরিকত্বের প্রধান ভিত্তি করেছে।

ফলে কোনো পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে মিয়ানমারে বসবাস করলেও তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করার সুযোগ থেকে যায়।

এই আইনি কাঠামো না বদলালে কোনো প্রত্যাবাসনই স্থায়ী হবে না।

এখানে রাখাইন জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধকে সরলীকরণ করাও বিপজ্জনক। সাধারণ রাখাইন মানুষ নিজেরাও সামরিক বাহিনীর বোমাবর্ষণ, বাস্তুচ্যুতি ও দারিদ্র্যের শিকার। সমস্যাটি সাধারণ জনগণের নয়; বরং সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন।

তবে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে যদি একই ভূখণ্ডে অন্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় আলাদা ও কঠোর আচরণ করা হয়, তাহলে সেটিকে কেবল যুদ্ধের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেরও ফল হতে পারে।

আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—রোহিঙ্গাদের নিজেদের কোনো কার্যকর রাজনৈতিক বা নিরাপত্তাগত ক্ষমতা নেই। তাই শুধু কাগজে অধিকার দিলেই হবে না; সেই অধিকার রক্ষার রাজনৈতিক সক্ষমতাও তাদের দিতে হবে।

ফেডারেল গণতন্ত্রের পাঁচটি শর্ত

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকে সত্যিকার অর্থে সফল বলতে হলে পাঁচটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে—স্বীকৃতি, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, ভূমি ও জীবিকার অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব।

এর কোনো একটি বাদ পড়লে ফিরে যাওয়া পরিবার আবারও অনিরাপদ ও অধিকারহীন হয়ে পড়তে পারে।

তাই শরণার্থী শিবির থেকে সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে পৌঁছানোই প্রত্যাবাসনের শেষ কথা নয়। প্রকৃত প্রত্যাবাসন তখনই হবে, যখন একজন রোহিঙ্গা নিজের গ্রামে ফিরে নাগরিক হিসেবে বসবাস করতে পারবেন, নিজের জমির অধিকার পাবেন, ভোট দিতে পারবেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে সমান আইনি সুরক্ষা দাবি করতে পারবেন।

এই কারণেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পরবর্তী মানবিক কর্মসূচি হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রথম রাজনৈতিক পরীক্ষা।

রোহিঙ্গাদেরও নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি গড়তে হবে

রোহিঙ্গাদের 'বাঙালি' হিসেবে উপস্থাপন মিয়ানমারের, তীব্র প্রতিবাদ বাংলাদেশের

এই প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের নিজেদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতের রাজনৈতিক আলোচনায় কার্যকরভাবে অংশ নেওয়ার জন্য নতুন প্রজন্মের রোহিঙ্গা আলোচক, রাজনীতিক ও আইনজীবী তৈরি করতে হবে।

জমি, সম্পত্তি ও বসবাসের প্রমাণও এখন থেকেই সংরক্ষণ করা জরুরি। ভবিষ্যতে সম্পত্তি ফেরত বা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা হলে যেন তা কেবল স্মৃতি ও মৌখিক দাবির ওপর নির্ভর না করে।

একই সঙ্গে রাখাইন নাগরিক সমাজ এবং অন্যান্য জাতিগত রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ শুধু দেশের বাইরে নির্বাসিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর আলোচনায় নির্ধারিত হবে না; রাখাইনেও সেই ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি হবে।

আর রোহিঙ্গাদের অবশ্যই সেই আলোচনার টেবিলে থাকতে হবে।

স্প্রিং রেভল্যুশনের সামনে এখনই সিদ্ধান্তের সময়

স্প্রিং রেভল্যুশন যদি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ফেডারেল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে রোহিঙ্গাদের তার রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতি শুধু ভবিষ্যতের রাজনৈতিক বক্তব্য হয়ে থাকলে চলবে না। এর পরিবর্তে কী ধরনের আইন হবে, নাগরিকত্বের ভিত্তি কী হবে এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে—এসব বিষয়ে এখনই আইনি কাঠামো তৈরি ও প্রকাশ করা প্রয়োজন।

এনইউজি, জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো এবং বিশেষ করে আরাকান আর্মি ও ইউনাইটেড লীগ অব আরাকানকে নিজেদের গণতন্ত্র, অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতিগুলো সব জনগোষ্ঠীর জন্য প্রযোজ্য করতে হবে।

শুধু শাসক পরিবর্তন করে যদি বর্জনের পুরোনো ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা হয়, তাহলে সেটি রাজনৈতিক বিপ্লবের পূর্ণ অর্থ বহন করবে না।

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অনিশ্চয়তার আশংকা - BBC  News বাংলা

মিয়ানমারের সামনে দুটি ভবিষ্যৎ

একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যতে জান্তা ক্ষমতা হারাবে, কিন্তু নাগরিকত্বের জাতিগত কাঠামো টিকে থাকবে। প্রত্যাবাসন তখনও কাগজপত্র যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং রাখাইন হয়ে উঠবে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয়তাবাদের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল।

অন্য ভবিষ্যতে ফেডারেল গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করবে। নাগরিকত্ব হবে সমান ও নিরাপদ, রোহিঙ্গাদের জন্য কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, হারানো জমি ফেরত বা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকবে এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে তাদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

এটি কোনো অবাস্তব স্বপ্ন নয়। ফেডারেল নাগরিকত্বের মৌলিক অর্থই হলো—জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে একই আইন, অধিকার ও রাজনৈতিক মর্যাদা সবার জন্য প্রযোজ্য হওয়া।

মিয়ানমারের বিপ্লব তাই শুধু জেনারেলদের ক্ষমতা থেকে সরানোর সাফল্যে বিচার করা যাবে না। এর গভীরতর পরীক্ষা হবে রাষ্ট্রের বহু পুরোনো বর্জনের ধারণা কতটা পরিবর্তিত হলো, তা দিয়ে।

যেদিন একজন রোহিঙ্গা পরিবার তাদের হারানো গ্রামে ফিরে নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা পাবে, নিজের নামে জমির অধিকার ভোগ করবে, ভোট দিতে পারবে এবং তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারবে—সেদিনই মিয়ানমারের ফেডারেল গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি বাস্তব অর্থ পাবে।

তার আগে ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ বদলাতে পারে, সরকার বদলাতে পারে, এমনকি সংবিধানও বদলাতে পারে। কিন্তু ‘কারা মিয়ানমারের মানুষ’—এই পুরোনো প্রশ্নের উত্তর যদি না বদলায়, তাহলে স্প্রিং রেভল্যুশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

*রো মে ইউ ইসলাম, সেন্টার ফর রোহিঙ্গা ক্রাইসিস স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।

জনপ্রিয় সংবাদ

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনই মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনই মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা

১০:১৪:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরার প্রশ্নকে শুধু মানবিক সংকট, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কিংবা প্রশাসনিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতর রাজনৈতিক দিকটি আড়ালে পড়ে যায়। আসল প্রশ্ন হলো—মিয়ানমারের রাজনৈতিক সমাজে রোহিঙ্গাদের অবস্থান কী? দেশটির যে ফেডারেল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে ‘স্প্রিং রেভল্যুশন’ এগোচ্ছে, সেখানে রোহিঙ্গারা কি সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন?

২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে মিয়ানমারের সামরিক শাসকগোষ্ঠীর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশ প্রত্যাবাসনের জন্য ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার নাম দিয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা যায়নি এবং ৪ হাজার ২৪১ জনকে কথিত সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে, এর কয়েক সপ্তাহ আগেই সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে পালাতে গিয়ে রোহিঙ্গাদের বহনকারী দুটি নৌকা মিয়ানমারের উপকূলের কাছে নিখোঁজ হয়। জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর ধারণা, ওই নৌকাগুলোর ৫০০ জনের বেশি যাত্রী মারা গেছেন।

একদিকে রোহিঙ্গারা রাষ্ট্রীয় নথিতে নাম ও সংখ্যায় পরিণত হচ্ছেন, অন্যদিকে নিরাপত্তার সন্ধানে সমুদ্রপথে প্রাণ হারাচ্ছেন। কিন্তু এই দুই বাস্তবতার কোনোটিই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মূল প্রশ্নের উত্তর দেয় না—রোহিঙ্গারা কি মিয়ানমারের রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অংশ?

জান্তা যে উত্তর দিয়েছে, তা হলো না। এখন প্রশ্নটি স্প্রিং রেভল্যুশনের সামনে।

বিপ্লবের অর্থ কি শুধু জান্তার পতন?

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অনিশ্চয়তার আশংকা - BBC  News বাংলা

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে। এর পর যে জাতীয় প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, তা শুধু পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার আন্দোলন ছিল না। স্প্রিং রেভল্যুশনের লক্ষ্য ছিল সামরিক আধিপত্য ও ২০০৮ সালের সংবিধানের কাঠামো ভেঙে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ফেডারেল গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করা।

২০২৫ সালের অক্টোবর নাগাদ জান্তা-বিরোধী শক্তি ও তাদের মিত্র জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো সামরিক বাহিনীর চেয়েও বেশি ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছিল। এর বিপরীতে সামরিক সরকার নিজেদের বৈধতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা দেখাতে নির্বাচনের আয়োজন করে। কিন্তু সেই নির্বাচন ছিল সীমিত, নিয়ন্ত্রিত এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিকে বাইরে রেখে পরিচালিত। পশ্চিমা সরকার ও জাতিসংঘ নির্বাচনটিকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে স্বীকৃতি দেয়নি।

ফলে ক্ষমতার কাঠামোর কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন আর প্রকৃত রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। আর এই পার্থক্যই রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

রোহিঙ্গাদের জন্য বঞ্চনা নতুন নয়

মিয়ানমারের সামরিকীকৃত ও জাতিগত রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শিকার রোহিঙ্গারা। নে উইনের ১৯৬২ সালের অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের জাতিগত চরিত্র আরও কঠোর হয়। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন নাগরিকত্বের প্রশ্নকে রাষ্ট্রনির্ধারিত ‘জাতীয় নৃগোষ্ঠী’র সদস্যত্বের সঙ্গে যুক্ত করে। এর ফলে বহু প্রজন্ম ধরে মিয়ানমারে বসবাস করেও রোহিঙ্গারা কার্যত রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েন।

১৯৭৮, ১৯৯১-৯২ ও ২০১২ সালের সহিংসতার পর ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। জাতিসংঘের তথ্য-অনুসন্ধানী মিশন সেই ঘটনাকে গণহত্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছিল। বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বিবেচনায় রয়েছে।

২০২১ সালের পর মিয়ানমারের অন্যান্য জনগোষ্ঠীও সামরিক সহিংসতার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। বামার, কারেন, চিনসহ বহু সম্প্রদায় বিমান হামলা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর রাষ্ট্রীয় সহিংসতার অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সংহতি তৈরি করে, তাহলে রোহিঙ্গাদেরও সেই নতুন রাজনৈতিক চুক্তির অংশ হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কিন্তু সেটি এখনো নিশ্চিত নয়।

প্রতিশ্রুতি থেকে আইনে যেতে হবে

স্প্রিং রেভল্যুশনের নেতৃত্ব রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে মিয়ানমারের অতীত সরকারগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট বা এনইউজি রোহিঙ্গাদের আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জান্তার পতনের পর পূর্ণ নাগরিকত্বসহ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের কথাও বলা হয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: মিয়ানমারের সাথে আলোচনা বন্ধ, জাতিসংঘে বিষয়টি আবার  তুলবে বাংলাদেশ - BBC News বাংলা

কিন্তু রাজনৈতিক ঘোষণা এবং বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। রোহিঙ্গাদের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি নিয়ে প্রতিরোধ আন্দোলনের ভেতরেও প্রশ্ন উঠেছে।

এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, রোহিঙ্গারা যে ভূখণ্ডে ফিরে যাবেন, সেই রাখাইন রাজ্য এখন এনইউজির নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে প্রত্যাবাসনের পর তাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, জমির মালিকানা কিংবা রাজনৈতিক অধিকার বাস্তবে কে নিশ্চিত করবে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অস্পষ্ট।

তাই রোহিঙ্গাদের অধিকারকে বিজয়ের পর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি হিসেবে রেখে দিলে চলবে না। যে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য লড়াই হচ্ছে, তার আইন ও প্রতিষ্ঠান তৈরির সময়ই এই অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

রাখাইনে শাসক বদলেছে, কিন্তু বঞ্চনার কাঠামো নয়

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বাস্তবতা আরও জটিল করেছে রাখাইন রাজ্যের সাম্প্রতিক ক্ষমতার পরিবর্তন। ২০২৩ সালে যুদ্ধ পুনরায় তীব্র হওয়ার পর আরাকান আর্মি রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টি নিয়ন্ত্রণে নেয়। কিছু হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যের ৯০ শতাংশেরও বেশি ভূখণ্ড এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে, যার মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে পুরো সীমান্তও রয়েছে।

আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান সেখানে নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনা করছে। আদালত, কর আদায়, ভূমি নিবন্ধন ও স্বাস্থ্য বিভাগের মতো প্রতিষ্ঠানও তারা গড়ে তুলেছে।

কিন্তু রোহিঙ্গাদের জন্য এই নতুন প্রশাসনের অভিজ্ঞতা নিরাপত্তা ও অধিকারের নিশ্চয়তা তৈরি করেনি। বিভিন্ন মানবাধিকার পর্যবেক্ষণে বিচারবহির্ভূত হত্যা, জোরপূর্বক শ্রম, অগ্নিসংযোগ এবং চলাচল ও জীবিকার ওপর কঠোর বিধিনিষেধের অভিযোগ উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা রাখাইন ছেড়ে পালিয়েছে বলে বিভিন্ন হিসাব রয়েছে।

আরাকান আর্মি এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে যুদ্ধকালীন নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে। কিন্তু স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন আরও কঠোর।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো নাগরিকত্বের প্রশ্ন। ২০২৬ সালের মে মাসে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মিয়ানমার রিসার্চ সেন্টারের একটি নীতিপত্রে বলা হয়, আরাকান আর্মি ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনকে চ্যালেঞ্জ করেনি এবং এর বিকল্প কোনো আইনি কাঠামোও প্রস্তাব করেনি।

অর্থাৎ ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ বদলেছে, কিন্তু রোহিঙ্গাদের বাদ দেওয়ার আইনি কাঠামো বদলায়নি।

কাগজে প্রত্যাবাসন, বাস্তবে শূন্য

২০১৮ ও ২০১৯ সালে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের দুটি উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছিল। কারণ নিরাপদে ফেরার বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা তারা পাননি।

২০২৬ সালে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ বেড়েছে, কিন্তু মূল সমস্যাটি একই রয়ে গেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ জানায়, মিয়ানমার ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যাচাই করা নামের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫১-এ পৌঁছায়। জুলাইয়ের শেষে বাংলাদেশ মোট ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের নাম জমা দিয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য প্রক্রিয়াজাত এবং ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে সাবেক রাখাইনবাসী হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

কিন্তু একজন রোহিঙ্গাও এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফেরেননি।

কারণ প্রত্যাবাসনের প্রকৃত প্রশ্ন তালিকায় নাম তোলার নয়। প্রশ্ন হলো—ফিরে গেলে তাদের নাগরিকত্ব কী হবে? নিরাপত্তার দায়িত্ব কার? তাদের গ্রাম কে পরিচালনা করবে? তারা ভোট দিতে পারবে কি না? জমির মালিকানা থাকবে কি না? রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সুযোগ থাকবে কি না?

নাম যাচাই করে এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না।

মিয়ানমারের বিবৃতি কি রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল করে তুলছে? - BBC News বাংলা

মূল প্রশ্ন: কারা মিয়ানমারের নাগরিক?

রোহিঙ্গা সংকটের কেন্দ্রে তাই প্রত্যাবাসন নয়, নাগরিকত্ব। মিয়ানমারের সরকারি পরিভাষায় রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করা তাদেরকে বিদেশি হিসেবে প্রতিষ্ঠার একটি রাজনৈতিক পদ্ধতি। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনও জন্ম, দীর্ঘদিনের বসবাস বা ঐতিহাসিক উপস্থিতির বদলে রাষ্ট্রনির্ধারিত জাতিগত পরিচয়কে নাগরিকত্বের প্রধান ভিত্তি করেছে।

ফলে কোনো পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে মিয়ানমারে বসবাস করলেও তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করার সুযোগ থেকে যায়।

এই আইনি কাঠামো না বদলালে কোনো প্রত্যাবাসনই স্থায়ী হবে না।

এখানে রাখাইন জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধকে সরলীকরণ করাও বিপজ্জনক। সাধারণ রাখাইন মানুষ নিজেরাও সামরিক বাহিনীর বোমাবর্ষণ, বাস্তুচ্যুতি ও দারিদ্র্যের শিকার। সমস্যাটি সাধারণ জনগণের নয়; বরং সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন।

তবে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে যদি একই ভূখণ্ডে অন্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় আলাদা ও কঠোর আচরণ করা হয়, তাহলে সেটিকে কেবল যুদ্ধের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেরও ফল হতে পারে।

আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—রোহিঙ্গাদের নিজেদের কোনো কার্যকর রাজনৈতিক বা নিরাপত্তাগত ক্ষমতা নেই। তাই শুধু কাগজে অধিকার দিলেই হবে না; সেই অধিকার রক্ষার রাজনৈতিক সক্ষমতাও তাদের দিতে হবে।

ফেডারেল গণতন্ত্রের পাঁচটি শর্ত

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকে সত্যিকার অর্থে সফল বলতে হলে পাঁচটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে—স্বীকৃতি, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, ভূমি ও জীবিকার অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব।

এর কোনো একটি বাদ পড়লে ফিরে যাওয়া পরিবার আবারও অনিরাপদ ও অধিকারহীন হয়ে পড়তে পারে।

তাই শরণার্থী শিবির থেকে সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে পৌঁছানোই প্রত্যাবাসনের শেষ কথা নয়। প্রকৃত প্রত্যাবাসন তখনই হবে, যখন একজন রোহিঙ্গা নিজের গ্রামে ফিরে নাগরিক হিসেবে বসবাস করতে পারবেন, নিজের জমির অধিকার পাবেন, ভোট দিতে পারবেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে সমান আইনি সুরক্ষা দাবি করতে পারবেন।

এই কারণেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পরবর্তী মানবিক কর্মসূচি হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রথম রাজনৈতিক পরীক্ষা।

রোহিঙ্গাদেরও নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি গড়তে হবে

রোহিঙ্গাদের 'বাঙালি' হিসেবে উপস্থাপন মিয়ানমারের, তীব্র প্রতিবাদ বাংলাদেশের

এই প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের নিজেদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতের রাজনৈতিক আলোচনায় কার্যকরভাবে অংশ নেওয়ার জন্য নতুন প্রজন্মের রোহিঙ্গা আলোচক, রাজনীতিক ও আইনজীবী তৈরি করতে হবে।

জমি, সম্পত্তি ও বসবাসের প্রমাণও এখন থেকেই সংরক্ষণ করা জরুরি। ভবিষ্যতে সম্পত্তি ফেরত বা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা হলে যেন তা কেবল স্মৃতি ও মৌখিক দাবির ওপর নির্ভর না করে।

একই সঙ্গে রাখাইন নাগরিক সমাজ এবং অন্যান্য জাতিগত রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ শুধু দেশের বাইরে নির্বাসিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর আলোচনায় নির্ধারিত হবে না; রাখাইনেও সেই ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি হবে।

আর রোহিঙ্গাদের অবশ্যই সেই আলোচনার টেবিলে থাকতে হবে।

স্প্রিং রেভল্যুশনের সামনে এখনই সিদ্ধান্তের সময়

স্প্রিং রেভল্যুশন যদি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ফেডারেল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে রোহিঙ্গাদের তার রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতি শুধু ভবিষ্যতের রাজনৈতিক বক্তব্য হয়ে থাকলে চলবে না। এর পরিবর্তে কী ধরনের আইন হবে, নাগরিকত্বের ভিত্তি কী হবে এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে—এসব বিষয়ে এখনই আইনি কাঠামো তৈরি ও প্রকাশ করা প্রয়োজন।

এনইউজি, জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো এবং বিশেষ করে আরাকান আর্মি ও ইউনাইটেড লীগ অব আরাকানকে নিজেদের গণতন্ত্র, অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতিগুলো সব জনগোষ্ঠীর জন্য প্রযোজ্য করতে হবে।

শুধু শাসক পরিবর্তন করে যদি বর্জনের পুরোনো ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা হয়, তাহলে সেটি রাজনৈতিক বিপ্লবের পূর্ণ অর্থ বহন করবে না।

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অনিশ্চয়তার আশংকা - BBC  News বাংলা

মিয়ানমারের সামনে দুটি ভবিষ্যৎ

একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যতে জান্তা ক্ষমতা হারাবে, কিন্তু নাগরিকত্বের জাতিগত কাঠামো টিকে থাকবে। প্রত্যাবাসন তখনও কাগজপত্র যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং রাখাইন হয়ে উঠবে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয়তাবাদের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল।

অন্য ভবিষ্যতে ফেডারেল গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করবে। নাগরিকত্ব হবে সমান ও নিরাপদ, রোহিঙ্গাদের জন্য কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, হারানো জমি ফেরত বা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকবে এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে তাদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

এটি কোনো অবাস্তব স্বপ্ন নয়। ফেডারেল নাগরিকত্বের মৌলিক অর্থই হলো—জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে একই আইন, অধিকার ও রাজনৈতিক মর্যাদা সবার জন্য প্রযোজ্য হওয়া।

মিয়ানমারের বিপ্লব তাই শুধু জেনারেলদের ক্ষমতা থেকে সরানোর সাফল্যে বিচার করা যাবে না। এর গভীরতর পরীক্ষা হবে রাষ্ট্রের বহু পুরোনো বর্জনের ধারণা কতটা পরিবর্তিত হলো, তা দিয়ে।

যেদিন একজন রোহিঙ্গা পরিবার তাদের হারানো গ্রামে ফিরে নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা পাবে, নিজের নামে জমির অধিকার ভোগ করবে, ভোট দিতে পারবে এবং তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারবে—সেদিনই মিয়ানমারের ফেডারেল গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি বাস্তব অর্থ পাবে।

তার আগে ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ বদলাতে পারে, সরকার বদলাতে পারে, এমনকি সংবিধানও বদলাতে পারে। কিন্তু ‘কারা মিয়ানমারের মানুষ’—এই পুরোনো প্রশ্নের উত্তর যদি না বদলায়, তাহলে স্প্রিং রেভল্যুশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

*রো মে ইউ ইসলাম, সেন্টার ফর রোহিঙ্গা ক্রাইসিস স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।