আন্তর্জাতিক ফুটবল একসময় ছিল জাতীয় পরিচয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং ফুটবল-সংস্কৃতির প্রতিযোগিতা। একটি দেশের সাফল্য নির্ভর করত সেই দেশের কোচ তৈরির সক্ষমতা, তরুণ প্রতিভা গড়ে তোলার কাঠামো এবং নিজস্ব ফুটবল-দর্শনের ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্বকাপের দিকে তাকালে মনে হয়, সেই ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। জাতীয় দলগুলো ক্রমশ ক্লাব ফুটবলের অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হচ্ছে।
আজ অনেক দেশের ফুটবল ফেডারেশন নিজেদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে উন্নয়ন পরিকল্পনার চেয়ে অর্থের ওপর বেশি নির্ভর করছে। দেশীয় কোচ তৈরির দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগের পরিবর্তে তারা বিশ্বের নামী কোচদের উচ্চ বেতনে নিয়োগ দিচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য—নিজস্ব ফুটবল দর্শনের প্রতিনিধিত্ব—ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
একসময় একটি জাতীয় দলের ব্যর্থতা মানেই ছিল আত্মসমালোচনা। প্রশ্ন উঠত যুব একাডেমি, কোচিং ব্যবস্থা, খেলোয়াড় তৈরির কাঠামো কিংবা ফুটবল দর্শন নিয়ে। এখন সেই চাপ অনেকটাই কমে গেছে। কারণ সমস্যার সহজ সমাধান হিসেবে অর্থ খরচ করে বিদেশি কোচ নিয়ে আসা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু এতে হয়তো তাৎক্ষণিক উন্নতি আসে, দীর্ঘমেয়াদে ফুটবল সংস্কৃতি শক্তিশালী হয় না।
এই পরিবর্তন শুধু কোচ নিয়োগেই সীমাবদ্ধ নয়। খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক পরিচয়ও এখন অনেক বেশি বাজারভিত্তিক বাস্তবতার প্রভাব অনুভব করছে। অভিবাসন, দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের কারণে বহু প্রতিভাবান ফুটবলার একাধিক দেশের হয়ে খেলার সুযোগ পাচ্ছেন। আইনের দৃষ্টিতে এটি বৈধ এবং অনেক ক্ষেত্রেই যৌক্তিক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ছোট দেশের হয়ে প্রতিভার পরিচয় দেওয়ার পর বড় ফুটবল শক্তিগুলো সেই খেলোয়াড়দের নিজেদের দলে টেনে নিচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রতিযোগিতাও অনেকটা ক্লাবের ট্রান্সফার বাজারের যুক্তিতে পরিচালিত হতে শুরু করেছে।
অবশ্য সব দোষ খেলোয়াড়দের নয়। তারা নিজেদের ক্যারিয়ারের জন্য সেরা সুযোগ বেছে নেবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক ফুটবল কি কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের মঞ্চ, নাকি এটি জাতীয় ফুটবল কাঠামোরও মূল্যায়ন?

এই বিশ্বকাপে বিদেশি কোচের সংখ্যা নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। শুধু উদীয়মান দেশ নয়, ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, পর্তুগাল কিংবা বেলজিয়ামের মতো ঐতিহ্যবাহী ফুটবল শক্তিও নিজেদের দেশের বাইরে সমাধান খুঁজছে। এটি কেবল একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং ফুটবল উন্নয়নের দর্শন বদলে যাওয়ারও ইঙ্গিত।
অন্যদিকে জার্মানির মতো দেশ বিশ্বকাপে ব্যর্থ হওয়ার পর আবারও জাতীয় পরিচয়, ফুটবল সংস্কৃতি এবং নিজস্ব দর্শনে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। তাদের প্রশ্ন, জার্মান ফুটবল কি অন্য কারও অনুকরণ করবে, নাকি নিজের শক্তির জায়গায় ফিরে যাবে? এই আত্মসমালোচনাই আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রকৃত চেতনার অংশ।
সমস্যা অর্থ ব্যয় নয়; সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন অর্থ উন্নয়নের বিকল্প হয়ে ওঠে। একটি শক্তিশালী যুব কাঠামো, দক্ষ দেশীয় কোচ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বদলে যদি বড় বাজেটই প্রধান অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আন্তর্জাতিক ফুটবলের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ক্ষতিগ্রস্ত হবেই।
বিশ্বকাপের সৌন্দর্য বরাবরই ছিল সমতার ধারণায়। এখানে ক্লাব ফুটবলের মতো সীমাহীন অর্থ ব্যয় করে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার সুযোগ থাকার কথা নয়। সফলতা অর্জন করার কথা ছিল সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য এবং ফুটবল সংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে। সেই কারণেই বিশ্বকাপ ছিল আলাদা।
আজ সেই পার্থক্য ক্রমশ মুছে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল যত বেশি ক্লাব ফুটবলের অর্থনৈতিক নিয়মে পরিচালিত হবে, ততই হারিয়ে যাবে তার স্বকীয়তা। বিশ্বকাপ তখন আর জাতীয় ফুটবলের উৎসব থাকবে না; বরং ধনী ও প্রভাবশালীদের আরেকটি প্রতিযোগিতায় পরিণত হবে।
ফুটবলকে যদি সত্যিই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ কিছু হিসেবে ধরে রাখতে হয়, তাহলে শুধু সেরা কোচ কেনার প্রতিযোগিতা নয়, সেরা ফুটবল ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিযোগিতায় ফিরে যেতে হবে। কারণ বিশ্বকাপের প্রকৃত মর্যাদা অর্থের নয়, পরিচয়ের; ব্যয়ের নয়, বিকাশের।
মার্টিন স্যামুয়েল 


















