২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েল এমন এক নিরাপত্তা দর্শনের পথে হাঁটতে শুরু করে, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সামরিক শক্তির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করা। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তখন “পূর্ণ বিজয়”-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় তিন বছরের যুদ্ধ, আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে—শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে কি একটি রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে?
এই প্রশ্ন এখন শুধু ইসরায়েলের ভেতরেই নয়, তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিসরেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সম্পর্ককে প্রায় অটুট বলে ধরা হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, সেই সম্পর্কেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।
নিরাপত্তা নীতির সীমাবদ্ধতা
ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান শুধু গাজায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়া এবং ইরান পর্যন্ত সংঘাতের বিস্তার ঘটেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ যেন ব্যতিক্রম নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি স্থায়ী কাঠামোতে পরিণত হয়েছে।
এই নীতির অন্তর্নিহিত ধারণা হলো, সম্ভাব্য প্রতিটি হুমকিকে সামরিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এমন কৌশল একটি রাষ্ট্রকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে প্রতিটি সংকটের একমাত্র উত্তর হয়ে দাঁড়ায় আরও বেশি শক্তি প্রয়োগ। তখন কূটনীতি, সমঝোতা কিংবা রাজনৈতিক সমাধানের জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে।

ফলে প্রকৃত নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং অতিরঞ্জিত হুমকির মধ্যে পার্থক্য করাও কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে কখন সামরিক পদক্ষেপ অপরিহার্য, আর কখন তা কেবল রাজনৈতিক বিকল্পের অভাব ঢাকার উপায়—সেই বিচারও অস্পষ্ট হয়ে যায়।
ওয়াশিংটনের ভাষা বদলাচ্ছে
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বক্তব্য এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন, প্রতিটি জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান হত্যা বা সামরিক অভিযান দিয়ে সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তিনি এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ সবসময় এক নয়।
এই অবস্থান অতীতের মার্কিন রাজনৈতিক ভাষ্য থেকে কিছুটা আলাদা। বহু বছর ধরে ইসরায়েলকে ঘিরে সমালোচনা প্রায়শই ইহুদিবিদ্বেষের সঙ্গে একাকার করে দেখা হয়েছে। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রভাবশালী মহল যুক্তি দিচ্ছে, কোনো নির্দিষ্ট সরকারের নীতির সমালোচনা আর একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষকে একই জিনিস হিসেবে দেখলে প্রকৃত বৈষম্য বা ঘৃণার ঘটনাগুলোকেও চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এটি শুধু ভাষার পরিবর্তন নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত আলোচনায় নতুন ধরনের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।
অসীম যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য

দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। যখন সরকার নিরাপত্তার প্রশ্নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরে, তখন সামরিক উপস্থিতি বা অভিযান কমানো সহজ থাকে না। কারণ যেকোনো ধরনের প্রত্যাহার বা সমঝোতাকে দুর্বলতা হিসেবে ব্যাখ্যা করার ঝুঁকি তৈরি হয়।
আজ লেবাননের ক্ষেত্রেই সেই বাস্তবতা স্পষ্ট। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সীমান্ত অঞ্চলে সেনা মোতায়েন এবং নিয়মিত হামলা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি নেতৃত্ব বলছে, হিজবুল্লাহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তা অঞ্চল বজায় থাকবে। কিন্তু এমন লক্ষ্য বাস্তবে কতটা অর্জনযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। লক্ষ্য যদি অনির্দিষ্ট হয়, তাহলে সামরিক উপস্থিতিও কার্যত অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আন্তর্জাতিক অবস্থানও বদলাচ্ছে
ইসরায়েল বহু দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের ওপর নির্ভর করেছে। সেই সমর্থন এখনও পুরোপুরি প্রত্যাহার হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক ইরান-সম্পর্কিত সমঝোতার পর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এবং ইসরায়েলের মধ্যেও যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা স্পষ্ট করে যে সম্পর্কের প্রকৃতি আগের মতো একমুখী নেই।
অবশ্যই এটিকে দুই দেশের জোটের অবসান বলা যাবে না। তবে এটুকু বলা যায়, ওয়াশিংটন এখন আগের তুলনায় নিজের স্বার্থকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলতে দ্বিধা করছে না।
ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
এ বছর ইসরায়েলে সংসদীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকুন বা নতুন নেতৃত্ব আসুক, যে প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হবে তা হলো—একটি রাষ্ট্র কি অনির্দিষ্টকাল যুদ্ধের মধ্যেই নিজের নিরাপত্তা খুঁজে পেতে পারে?
ইসরায়েলের সামনে এখন দুটি পথ। একদিকে রয়েছে স্থায়ী সামরিক প্রস্তুতি ও সংঘাতের বর্তমান ধারা। অন্যদিকে রয়েছে এমন একটি নিরাপত্তা কৌশল, যেখানে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনীতি, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং বাস্তবসম্মত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সমান গুরুত্ব পায়।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিঃসন্দেহে অপরিহার্য। কিন্তু নিরাপত্তা তখনই টেকসই হয়, যখন তা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্যের ওপর নয়, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ওপরও দাঁড়িয়ে থাকে। ইসরায়েলের বর্তমান সংকট সেই মৌলিক সত্যটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
মাইরাভ জন্সজেইন 


















