দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) কার্যত স্থবির হয়ে পড়লেও দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতার ধারণা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক ধৈর্য। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, পানিসংকট, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকির মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক এ. করিম।
সোমবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘রিবিল্ডিং ট্রাস্ট, রিনিউইং রিজিওনাল ইন্টিগ্রেশন: পাথওয়েজ ফর রিভাইটালাইজিং সার্ক’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
বর্তমানে তিনি ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সেন্টার ফর বে অব বেঙ্গল স্টাডিজের উপদেষ্টা এবং সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়া স্টাডিজের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পরিবেশগত নিরাপত্তাই সবচেয়ে বাস্তব সূচনা
তারিক করিম বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় এমন একটি ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা চলতে পারে না, আর সেটি হলো পরিবেশগত নিরাপত্তা। নদী, মৌসুমি বৃষ্টি, হিমবাহ, বদ্বীপ, বন, বায়ুর মান, রোগব্যাধি, খাদ্যব্যবস্থা কিংবা জলবায়ুজনিত ঝুঁকি কোনো রাজনৈতিক সীমান্ত মানে না। নিম্ন অববাহিকার বদ্বীপ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এই বাস্তবতা সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভব করে।
তার মতে, পরিবেশগত নিরাপত্তাকে আঞ্চলিক সহযোগিতার সবচেয়ে কার্যকর সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
সার্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, অভিন্ন সমস্যার সমাধান এবং অঞ্চলের বিশাল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে নতুন করে আঞ্চলিক সংলাপ এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা অপরিহার্য।
তারিক করিম বলেন, সার্ক আজ কোমায় থাকলেও দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতার ধারণা মৃত নয়। বরং এটি রাজনৈতিক সাহস, সৎ চিন্তা ও ধৈর্যের অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সহযোগিতায় বিলম্বের মূল্য প্রতিনিয়ত বাড়ছে। জলবায়ুজনিত দুর্যোগ, পানির নিরাপত্তাহীনতা, খাদ্যচাপ, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি, অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং কৌশলগত দুর্বলতা অঞ্চলটির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। সহযোগিতা কঠিন হতে পারে, কিন্তু বিলম্ব আরও বিপজ্জনক।

গঙ্গা চুক্তি থেকে নেওয়া যেতে পারে শিক্ষা
তারিক করিম স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৯৬ সালের বাংলাদেশ-ভারত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি প্রমাণ করেছে যে স্পর্শকাতর বিষয়েও সহযোগিতা সম্ভব। তবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হবে এবং নতুন জলপ্রবাহ ও জলবায়ুগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এর নবায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে।
তিনি বলেন, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন এখনো অমীমাংসিত। এছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আরও ৫২টি আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে। বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে পানি, খাদ্য, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু সহনশীলতা—সবই আঞ্চলিক জনস্বার্থের বিষয়। কোনো দেশ একা এগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।
সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
তারিক করিমের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যৌথ নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, জলবায়ু অভিযোজন অর্থায়ন, যৌথ গবেষণা এবং পরিবেশগত নিরাপত্তা নিয়ে আঞ্চলিক সংলাপ শুরু করতে পারে।
তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য কোনো রাষ্ট্রকে তার সার্বভৌমত্ব ছেড়ে দিতে হবে না। বরং জলবায়ু সংকটের সময়ে সহযোগিতার মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের মধ্যে নদী, পাহাড়, মৌসুমি বৃষ্টি, সংস্কৃতি, শ্রম, অভিবাসন, বাজার, সংগীত, স্মৃতি এবং অভিন্ন দুর্বলতার বন্ধন রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রগুলো এসব সম্পর্ককে বোঝা হিসেবে দেখবে, নাকি সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করবে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের পর উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণকারীরা সার্কের কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ার কাঠামোগত কারণ, আঞ্চলিক ভূরাজনীতির প্রভাব এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কার্যকর সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় করেন। সেমিনারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার কর্মকর্তা, রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, সাবেক কূটনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, গবেষক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গণমাধ্যমকর্মী এবং নীতিনির্ধারণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
সার্ক পুনরুজ্জীবনে আস্থা, সহযোগিতা ও পরিবেশগত নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক করিম।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















