২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল আর মাত্র এক সপ্তাহ দূরে। শিরোপা জয়ের স্বপ্ন এখন কেবল চারটি দলের—বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং স্পেনের।
গত এক মাসে স্বাগতিক কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ব্রাজিল, জার্মানির মতো ঐতিহ্যবাহী শক্তিধর দল বিদায় নিয়েছে। এখন ১৯ জুলাই নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিতব্য ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে টিকে আছে এই চার দল।
কিন্তু তারা কীভাবে এখানে পৌঁছাল? কারা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উজ্জ্বল খেলোয়াড়? আর কোন মুহূর্তগুলো এই বিশ্বকাপকে স্মরণীয় করে রাখবে?
ইএসপিএনের স্যাম মার্সডেন তুলে ধরেছেন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর। স্যাম টাই বিশ্লেষণ করেছেন দুই সেমিফাইনাল কোথায় জয়-পরাজয় নির্ধারিত হতে পারে। টুর্নামেন্ট কভার করা ইএসপিএনের একাধিক লেখক জানিয়েছেন নিজেদের ভবিষ্যদ্বাণী। পাশাপাশি রয়েছে সর্বশেষ বাজির অডস।
ফ্রান্স বনাম স্পেন
মঙ্গলবার, বিকেল ৩টা | আর্লিংটন, টেক্সাস
ফ্রান্স কীভাবে সেমিফাইনালে পৌঁছাল
এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের যাত্রা ছিল তুলনামূলক সহজ। তারা ছয়টি ম্যাচই জিতেছে এবং করেছে ১৬ গোল। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসের আক্রমণভাগ প্রতিপক্ষকে কার্যত বিধ্বস্ত করেছে।
গ্রুপ পর্বে সেনেগালকে ৩-১, ইরাককে ৩-০ এবং নরওয়েকে ৪-১ গোলে হারায় তারা। এরপর রাউন্ড অব ৩২-এ সুইডেনকে ৩-০ ব্যবধানে বিদায় করে।

শেষ ষোলোয় প্যারাগুয়ে শারীরিক শক্তিনির্ভর ফুটবল খেলায় ফ্রান্সকে কিছুটা চাপে ফেলেছিল। তবে দ্বিতীয়ার্ধে এমবাপ্পের পেনাল্টি ফ্রান্সকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলে।
কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর কাছ থেকে কঠিন লড়াইয়ের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে ফ্রান্স পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে। প্রথমার্ধে এমবাপ্পের একটি পেনাল্টি রক্ষা করা হলেও বিরতির পর তিনি অসাধারণ একক প্রচেষ্টায় গোল করেন এবং পরে দেম্বেলের গোলেও সহায়তা করেন। ফলে ২-০ গোলের জয়ে শেষ চারে ওঠে ফরাসিরা।
এখন পর্যন্ত ফ্রান্সের সেরা খেলোয়াড়
এমবাপ্পে এখন পর্যন্ত আট গোল ও তিনটি অ্যাসিস্ট করেছেন। দেম্বেলের পাঁচ গোল ও দুই অ্যাসিস্ট এবং ওলিসের পাঁচটি অ্যাসিস্টও দারুণ গুরুত্বপূর্ণ।
রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকার বিশ্বকাপ রেকর্ড অবিশ্বাস্য। মাত্র ২০ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা ২০। এই পরিসংখ্যান লিওনেল মেসি ছাড়া আর কারও নেই।
মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালেও তিনি দেখিয়েছেন, তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে ফ্রান্সকে নেতৃত্ব দেওয়ার মূল দায়িত্ব তার কাঁধেই।
ফ্রান্সের সেরা মুহূর্ত
এত সহজে এগিয়ে আসায় ফ্রান্সকে খুব বেশি নাটকীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি।
তবু মরক্কোর বিপক্ষে এমবাপ্পের ৬০ মিনিটের গোলটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পুরো ম্যাচে আধিপত্য দেখালেও সেই গোলই নিশ্চিত করে যে ফ্রান্সের দাপট শেষ পর্যন্ত স্কোরলাইনেও প্রতিফলিত হবে।
স্পেন কীভাবে সেমিফাইনালে পৌঁছাল
ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেন পুরো টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ছন্দে খেলতে পারেনি, তবে কখনও এমন মনে হয়নি যে তারা ছিটকে পড়তে পারে।
প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করলেও এরপর সৌদি আরবকে ৪-০ এবং উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপপর্ব পার হয়।
রাউন্ড অব ৩২-এ অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে সহজেই হারায় তারা।
শেষ ষোলোয় পর্তুগালের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়। ম্যাচের ৯০তম মিনিটে মিকেল মেরিনোর গোল স্পেনকে ১-০ ব্যবধানে জয় এনে দেয়।
কোয়ার্টার ফাইনালেও আবার নায়ক সেই মেরিনো। ৮৮তম মিনিটে তার গোলেই বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে যায় স্পেন।

ধীরগতির এই অগ্রযাত্রা রদ্রি ও লামিন ইয়ামালের মতো ইনজুরি থেকে ফেরা খেলোয়াড়দের ম্যাচ ফিটনেস ফিরে পেতে সাহায্য করেছে।
এদিকে টুর্নামেন্টের সেরা রক্ষণভাগও গড়ে তুলেছে স্পেন। তারা এখন পর্যন্ত মাত্র একটি গোল হজম করেছে।
তবে ফ্রান্সকে হারাতে হলে আক্রমণে আরও কার্যকর হতে হবে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলকে।
স্পেনের সেরা খেলোয়াড়
মাত্র ১৩৬ মিনিট খেলেও মিকেল মেরিনোর মতো গুরুত্বপূর্ণ অবদান আর কেউ রাখতে পারেননি।
শেষ ষোলো ও কোয়ার্টার ফাইনাল—দুই ম্যাচেই তার গোল স্পেনকে জয় এনে দিয়েছে।
মিকেল ওয়ারসাবালও চারটি গোল করেছেন, যদিও শেষ দুই ম্যাচে গোল পাননি।
অন্যদিকে রদ্রি প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে আরও ছন্দে ফিরছেন। লামিন ইয়ামালও হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির পর ধীরে ধীরে নিজের সেরা খেলা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
স্পেনের সেরা মুহূর্ত
বড় ম্যাচে নায়ক হয়ে ওঠা যেন মেরিনোর অভ্যাস।
গত ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে জার্মানির বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে জয়সূচক গোল করেছিলেন তিনি।
এবারও পর্তুগালের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে একই কাজ করেন।
কিন্তু চার দিন পর বেলজিয়ামের বিপক্ষেও আবার ম্যাচজয়ী গোল করে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেন।
ম্যাচ শেষে তিনি বলেন,
“এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না। মনে হয় না এটা আবারও ঘটবে। তবে দেখা যাক।”
যাই ঘটুক না কেন, স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে নিজের জায়গা ইতোমধ্যেই নিশ্চিত করে ফেলেছেন মেরিনো।
কোথায় নির্ধারিত হতে পারে ফ্রান্স-স্পেন ম্যাচ?
ফ্রান্স কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে আবারও প্রমাণ করেছে যে এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল তারাই। ম্যাচটিতে তাদের প্রত্যাশিত গোল (এক্সজি) ছিল ৩.৬৯, বিপরীতে মরক্কোর ছিল মাত্র ০.১৪। আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই দিকেই ছিল সম্পূর্ণ আধিপত্য।
তবে এতেই স্পেনকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই।
লামিন ইয়ামাল যেমন মনে করিয়ে দিয়েছেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে স্পেন ফ্রান্সকে হারিয়েছিল। তাই ২০২৬ সালেও একই কাজ করা অসম্ভব নয়।
স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করা। তারা বলের দখল নিজেদের কাছে রেখে প্রতিপক্ষকে খেলতে বাধ্য করে নিজেদের ছন্দে। এই কৌশলের ফলে ফ্রান্স বল খুব বেশি সময় নিজেদের দখলে রাখতে পারবে না এবং আক্রমণের সুযোগও কম পাবে।
কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়।
ফ্রান্সকে পুরোপুরি বল থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব নয়। একবার বল ফিরে পেলেই তারা মুহূর্তের মধ্যে ভয়ংকর পাল্টা আক্রমণ গড়ে তুলতে পারে।
এমবাপ্পের গতি সামলানো অত্যন্ত কঠিন। অন্যদিকে ওলিসের পাস দেওয়ার ক্ষমতা প্রতিরক্ষার সামান্য ফাঁকও খুঁজে বের করতে পারে।
ফলে ম্যাচের ভেতর আরেকটি আলাদা লড়াই তৈরি হবে। হয়তো মাত্র দশবার ফ্রান্স পাল্টা আক্রমণের সুযোগ পাবে। প্রশ্ন হলো—এমবাপ্পে ও তার সতীর্থরা কি সেই সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারবেন, নাকি রদ্রির নেতৃত্বে স্পেনের মিডফিল্ড সেগুলো নষ্ট করে দেবে?

বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যদ্বাণী
লিজি বেচেরানো: ফ্রান্স ৩-১ স্পেন। মরক্কোর বিপক্ষে যেভাবে খেলেছে, তাতে ফ্রান্সকে থামানো কঠিন। তাদের প্রতিভা শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেবে।
জেফ কার্লাইল: ফ্রান্স ২-১ স্পেন। স্পেন দুর্দান্ত দল হলেও এমবাপ্পে, ওলিস ও দেম্বেলের মতো অস্ত্র ফ্রান্সকে বাড়তি সুবিধা দেবে।
বিল কনেলি: স্পেন ২-১ ফ্রান্স। এবার ইয়ামালের জ্বলে ওঠার সময় এসেছে। পাশাপাশি স্পেনের বল দখলের কৌশল ফ্রান্সকে আটকে দিতে পারে।
রব ডসন: ফ্রান্স ১-০ স্পেন। স্পেন যদি মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে ফ্রান্সই এগিয়ে থাকবে।
টম হ্যামিল্টন: ফ্রান্স ৩-১ স্পেন। এবার আর মেরিনো স্পেনকে বাঁচাতে পারবেন না। শুরুতে সময় লাগলেও পরে দ্রুত ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবে ফ্রান্স।
গ্যাব মারকোত্তি: স্পেন ২-১ ফ্রান্স। কাগজে-কলমে ফ্রান্স এগিয়ে থাকলেও স্পেন এমন ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে, যার মুখোমুখি তারা আগে হয়নি।
জেমস অললি: স্পেন ২-১ ফ্রান্স। স্পেন প্রতিবারই প্রয়োজনমতো জয় তুলে নিচ্ছে। তাদের খেলার ধরন ফ্রান্সকে সমস্যায় ফেলতে পারে।
মার্ক ওগডেন: ফ্রান্স ২-১ স্পেন। বিভিন্ন উৎস থেকে গোল করার সামর্থ্য ফ্রান্সকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। শুধু মেরিনোর শেষ মুহূর্তের নৈপুণ্যের ওপর ভর করে এবার জেতা সম্ভব নয়।
বাজির অডস
- ফ্রান্স: -১৫৫
- স্পেন: +১২৫
ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা
বুধবার, বিকেল ৩টা | আটলান্টা
ইংল্যান্ড কীভাবে সেমিফাইনালে পৌঁছাল
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৪-২ গোলের জয় দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করেছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু পরের ম্যাচে ঘানার সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ে সেই গতি থেমে যায়।
পানামাকে ২-০ গোলে হারিয়ে তারা শেষ ৩২-এ উঠলেও এরপরের পথ সহজ ছিল না।ট

কঙ্গো ডিআরের বিপক্ষে শুরুতেই পিছিয়ে পড়ে ইংল্যান্ড। ম্যাচের শেষদিকে হ্যারি কেইনের জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতে অল্পের জন্য বড় অঘটন এড়ায় তারা।
এরপর আসে অন্যতম কঠিন পরীক্ষা—মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচ।
উচ্চতা, দর্শকদের তীব্র সমর্থন, জারেল কোয়ানসার লাল কার্ড এবং শেষ মুহূর্তের চাপ—সবকিছু সামলে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় ইংল্যান্ড। জুড বেলিংহামের জোড়া গোল এবং কেইনের পেনাল্টি ছিল সেই জয়ের ভিত্তি।
কোয়ার্টার ফাইনালেও পিছিয়ে পড়ে তারা। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়ায়। সেখানেও দুই গোল করেন বেলিংহাম।
এখন পর্যন্ত ইংল্যান্ডের সেরা খেলোয়াড়
জুড বেলিংহামকে ছাড়া ইংল্যান্ডের সেমিফাইনালে ওঠা কল্পনাই করা যায় না।
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গোল, পানামার বিপক্ষে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট, এরপর মেক্সিকো ও নরওয়ের বিপক্ষে জোড়া গোল—সব মিলিয়ে তিনি এখন গোল্ডেন বল জয়ের অন্যতম দাবিদার।
বিশেষ করে মেক্সিকোর বিপক্ষে তার পারফরম্যান্স সাম্প্রতিক সময়ে ইংল্যান্ডের কোনো ফুটবলারের সেরা প্রদর্শনীগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টে তার গোলসংখ্যা ছয়।
ইংল্যান্ডের সেরা মুহূর্ত
কঙ্গো ডিআরের বিপক্ষে হ্যারি কেইনের শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোলটি ছিল আবেগের বিস্ফোরণ।
মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে করা তার জোড়া গোল ইংল্যান্ডকে বিদায়ের হাত থেকে ফিরিয়ে আনে।
অন্যদিকে মেক্সিকোর বিপক্ষে বেলিংহামের দুই গোল ছিল অসাধারণ। তবে নরওয়ের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে তার জয়সূচক গোলটি ইংলিশ সমর্থকদের কাছে সম্ভবত সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে।
আর্জেন্টিনা কীভাবে সেমিফাইনালে পৌঁছাল
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার এবারের বিশ্বকাপ যাত্রা ছিল রোমাঞ্চ, নাটকীয়তা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পে ভরপুর। গ্রুপ পর্বে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে তারা দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছে। আলজেরিয়াকে ৩-০, অস্ট্রিয়াকে ২-০ এবং জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সহজেই নকআউট পর্বে ওঠে।
কিন্তু এরপর থেকেই শুরু হয় কঠিন পরীক্ষা।
বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নেওয়া কেপ ভার্দের বিপক্ষে দুইবার পিছিয়ে পড়েও অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলে জয় পায় আর্জেন্টিনা। সম্ভাব্য বড় অঘটনের মুখ থেকে শেষ পর্যন্ত নিজেদের রক্ষা করে তারা।
এরপর মিশরের বিপক্ষে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ম্যাচ শেষ হতে তখন মাত্র কিছু সময় বাকি, আর আর্জেন্টিনা পিছিয়ে ২-০ গোলে।
মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে ক্রিস্তিয়ান রোমেরো ও লিওনেল মেসির গোল ম্যাচে সমতা ফেরায়। এরপর যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের দুর্দান্ত গোল আর্জেন্টিনাকে ৩-২ ব্যবধানে অবিশ্বাস্য এক জয় এনে দেয়।
কোয়ার্টার ফাইনালে দশজনের সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের ১১২তম মিনিটে জুলিয়ান আলভারেজ অসাধারণ এক গোল করেন। পরে লাউতারো মার্তিনেজ গোল করে ৩-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন। ফলে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে আলবিসেলেস্তেরা।
এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার সেরা খেলোয়াড়
৩৯ বছর বয়সেও লিওনেল মেসি যেন সময়কে হার মানিয়ে খেলছেন।
আর্জেন্টিনার ১৭ গোলের মধ্যে আটটিই এসেছে তার পা থেকে। পাশাপাশি রয়েছে একটি অ্যাসিস্ট।
বিশেষ করে মিশরের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের মূল নায়ক ছিলেন তিনিই। একটি গোল করার পাশাপাশি আরেকটি গোলে সহায়তা করেন।
এই বিশ্বকাপে তিনি একের পর এক রেকর্ডও গড়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে ওঠা। এখন তার বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা ২১।
ইন্টার মায়ামির এই কিংবদন্তি আবারও প্রমাণ করছেন, সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সামর্থ্য এখনও তার রয়েছে।

আর্জেন্টিনার সেরা মুহূর্ত
নকআউট পর্বের তিনটি ম্যাচই এত নাটকীয় ছিল যে একটিমাত্র মুহূর্ত বেছে নেওয়া কঠিন।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল অবিশ্বাস্য রোমাঞ্চকর। তবে সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা কখনও পিছিয়ে ছিল না।
অন্যদিকে মিশরের বিপক্ষে তারা কার্যত বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।
সেখান থেকে এনজো ফার্নান্দেজের যোগ করা সময়ের জয়সূচক গোল পুরো স্টেডিয়ামকে উল্লাসে ভাসিয়ে দেয়। আনন্দের পাশাপাশি ছিল স্বস্তিরও বিস্ফোরণ।
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে জুলিয়ান আলভারেজের দুর্দান্ত গোলটিও এই তালিকায় অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
কোথায় নির্ধারিত হতে পারে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচ?
এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা তাদের সেরা ফুটবল খেলতে পারেনি—অন্তত মেসিকে বাদ দিলে।
৩৯ বছর বয়সী মেসির ব্যক্তিগত নৈপুণ্যই অনেক দুর্বলতা ঢেকে দিয়েছে। মাঝমাঠ থেকে তার নিখুঁত শট কিংবা বক্সে অসাধারণ পাস আর্জেন্টিনাকে বারবার বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে।
তবে রক্ষণে তাদের দুর্বলতা স্পষ্ট। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকাতে প্রায়ই শেষ মুহূর্তের ট্যাকলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এছাড়া ৪-৪-২ ডায়মন্ড ফর্মেশনে খেলতে গিয়ে উইং দিয়ে আক্রমণের ধারণা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে দলটি।
এই ফর্মেশনে মাঝমাঠের কেন্দ্রে ছয়জন খেলোয়াড় অবস্থান করেন এবং সবাই দ্রুত ছোট ছোট পাসের মাধ্যমে মেসির সঙ্গে সংযোগ তৈরির চেষ্টা করেন।
ইংল্যান্ডকে এই সংখ্যাগত সুবিধার মোকাবিলা করতে হবে। প্রয়োজনে ফুলব্যাকদেরও ভেতরে ঢুকে এসে মাঝমাঠে সহায়তা করতে হবে। একই সঙ্গে মেসিকে নিবিড়ভাবে মার্ক করাও হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই লড়াই জেতার সামর্থ্য ইংল্যান্ডের আছে।
এলিয়ট অ্যান্ডারসন, ডেকলান রাইস এবং জুড বেলিংহামের শক্তি, দৌড় এবং শারীরিক উপস্থিতি এ পর্যন্ত প্রতিটি প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলেছে।
ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেল অবশ্য এখনও নিজের দলের কাছ থেকে আরও ভালো ফুটবল প্রত্যাশা করছেন। নরওয়ের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের পারফরম্যান্স নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং অতিরিক্ত সময়ের ২-১ জয়কে “ভাগ্যবান” বলেও মন্তব্য করেছেন।
তার মতে, সত্যিকারের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হলে ইংল্যান্ডকে মেসিকে থামাতেই হবে।
বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যদ্বাণী
লিজি বেচেরানো: ইংল্যান্ড ২-২ আর্জেন্টিনা (টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার জয়)। দুই দলের শক্তি কাছাকাছি। ম্যাচ টাইব্রেকারে গেলে এমিলিয়ানো মার্তিনেজের মতো গোলরক্ষকই পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন।
জেফ কার্লাইল: ইংল্যান্ড ২-১ আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনা, বিশেষ করে মেসি, ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড যেন প্রতিটি ম্যাচে নতুন শক্তি খুঁজে পাচ্ছে।
বিল কনেলি: ইংল্যান্ড ২-১ আর্জেন্টিনা। সুইজারল্যান্ড যেমন শারীরিক শক্তি দিয়ে আর্জেন্টিনাকে চাপে ফেলেছিল, ইংল্যান্ডও সেটি করতে পারবে। পার্থক্য হলো, ইংল্যান্ডের ফিনিশিং আরও ভালো।
রব ডসন: ইংল্যান্ড ২-২ আর্জেন্টিনা (টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডের জয়)। দুই দলই গোল করে, আবার গোল হজমও করে। ফলে রোমাঞ্চকর ম্যাচ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
টম হ্যামিল্টন: ইংল্যান্ড ৩-২ আর্জেন্টিনা (অতিরিক্ত সময়ে)। ম্যাচের আগে ইংল্যান্ডের ক্লান্ত খেলোয়াড়রা কতটা সুস্থ হতে পারেন, সেটাই বড় প্রশ্ন। যদি তারা প্রস্তুত থাকতে পারে, তাহলে ইংল্যান্ডই ভালো দল।
গ্যাব মারকোত্তি: আর্জেন্টিনা ০-০ ইংল্যান্ড (টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার জয়)। দুই দলই খুব বেশি ঝলমলে ফুটবল খেলেনি, তবে লড়াই করার মানসিকতায় কেউ কারও চেয়ে কম নয়। কঠিন এক ম্যাচের পর ভাগ্য নির্ধারণ হবে টাইব্রেকারে।
জেমস অললি: আর্জেন্টিনা ২-১ ইংল্যান্ড। ম্যাচটি হবে শারীরিক লড়াইয়ে ভরপুর। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের শরীরে ক্লান্তির ছাপ বেশি। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সামান্য ব্যবধানে জিততে পারে আর্জেন্টিনা।
মার্ক ওগডেন: ইংল্যান্ড ২-১ আর্জেন্টিনা। এটি হতে পারে পুরো বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ম্যাচ। তবে সংগঠিত ফুটবল খেলতে পারলে ইংল্যান্ডেরই এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা বেশি। সুইজারল্যান্ড দেখিয়ে দিয়েছে, সুসংগঠিত দলগুলোর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সমস্যা হয়।
বাজির অডস
- ইংল্যান্ড: -১৩৫
- আর্জেন্টিনা: +১১০
সারাক্ষণ স্পোর্টস ডেস্ক 


















