১০:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
মানুষকে সংখ্যা বানালে রাষ্ট্র জেতে না, মানবিকতা হারে ট্রল বা সমালোচনায় দায়িত্ব থেকে সরে যাবে না সরকার, বললেন শিক্ষামন্ত্রী পদ্মার পানি বৃদ্ধিতে ডুবল পাটুরিয়া লঞ্চ টার্মিনালের সংযোগ সড়ক, কষ্টে যাত্রীরা ভাটারায় দ্রুতগতির গাড়ির ধাক্কায় অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা নিহত নরসিংদীতে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩, এইচএসসি পরীক্ষার্থী দুই বন্ধু প্রাণ হারাল সন্তানদের মুখের ভাষাঃ সমাজ ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে ছাপার মেলবন্ধনে নতুন ফ্যাশন ধারা, রঙ ও নকশার সংঘাতে নজর কাড়ছে পথের সাজ ইয়েলোস্টোনে বিশাল বাইসনের আক্রমণে আকাশে ছিটকে গেলেন বৃদ্ধ পর্যটক চিবুকে বাইসাইকেল, মই ও ঘর দাঁড় করিয়ে বিশ্বরেকর্ডের পথে তরুণ নরওয়ের ভয়াবহ আগুনে শতাধিক বাড়ি ধ্বংস, হেলিকপ্টারে চলছে পানি ছিটানোর অভিযান

মানুষকে সংখ্যা বানালে রাষ্ট্র জেতে না, মানবিকতা হারে

দক্ষিণ আফ্রিকায় সাম্প্রতিক অভিবাসী প্রত্যাবাসন অভিযানকে সরকার প্রশাসনিক দক্ষতার সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। অল্প সময়ের মধ্যে হাজার হাজার মানুষকে সীমান্ত পার করে দেওয়া হয়েছে, সরকারি ভাষ্যে সেটিই যেন কার্যকারিতার প্রমাণ। কিন্তু রাষ্ট্রের সাফল্য কি কেবল কত দ্রুত মানুষকে সরানো গেল, তা দিয়ে মাপা যায়? নাকি প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই প্রক্রিয়ায় মানুষের অধিকার, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা কতটা রক্ষা করা হয়েছে?

আজ যে বাস্তবতা সামনে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। সহিংসতা কিংবা সহিংসতার আশঙ্কায় ঘরছাড়া হওয়া মানুষদের অস্থায়ী প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে এনে দ্রুত ফেরত পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সেই তাড়াহুড়োর মধ্যে তারা পর্যাপ্ত আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা নিরাপদ পরিবেশ পেয়েছে—এমন প্রমাণ খুবই সীমিত। রাষ্ট্র মানুষের জীবনকে প্রশাসনিক পরিসংখ্যানের অংশে পরিণত করেছে, অথচ তাদের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ, অসুস্থতা কিংবা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা কার্যত অদৃশ্য হয়ে গেছে।

অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন নয়। কিন্তু এই সংকটের বড় অংশই প্রশাসনিক ব্যর্থতা থেকে তৈরি হয়েছে। বহু মানুষের বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও বা সরকারি দপ্তরের দীর্ঘসূত্রতার কারণে কাগজপত্র নবায়ন না হওয়ায় তারা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। ফলে সমস্যার মূল কারণ দূর না করে মানুষকে সরিয়ে দেওয়াই নীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে।

South Africa's president acknowledges rising tensions over migration –  Hartford Courant

এর ফলে যে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে, সেটি সীমান্তে গিয়ে শেষ হচ্ছে না। যেসব মানুষ এই অভিযানের মধ্যে পড়েছেন, তাদের অনেকে এইচআইভি, যক্ষ্মা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার মধ্যে ছিলেন। আবার কেউ ছিলেন গর্ভকালীন সেবার আওতায়। চিকিৎসার ধারাবাহিকতা হঠাৎ ভেঙে গেলে শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য নয়, পুরো জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাই নতুন ঝুঁকির মুখে পড়ে। সংক্রামক রোগের বিস্তার, ওষুধ প্রতিরোধী সংক্রমণের আশঙ্কা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা—সবকিছুর প্রভাব বহুদিন ধরে থেকে যেতে পারে।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপও দ্রুত বাড়ছে। বিভিন্ন মানবিক সংস্থা এবং চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, বিদেশি নাগরিকদের চিকিৎসার চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। জরুরি চিকিৎসা, ওষুধ সরবরাহ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার প্রয়োজনীয়তা একযোগে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ সমস্যাটি কোনো একটি সীমান্ত এলাকার নয়; এটি জাতীয় জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই পুরো প্রক্রিয়ার মানবিক মূল্য। প্রত্যাবাসনের পথে মৃত্যুর ঘটনা, ক্লান্ত চালকের কারণে দুর্ঘটনা, আহত যাত্রী—এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি তাড়াহুড়ো করা ব্যবস্থার লক্ষণ। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শারীরিক সক্ষমতার মূল্যায়ন কিংবা নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত না করে মানুষকে স্থানান্তর করা হলে এমন ঝুঁকি অনিবার্য হয়ে ওঠে।

কিন্তু দৃশ্যমান ক্ষতির বাইরেও রয়েছে ভয় ও অনিশ্চয়তার গভীর প্রভাব। যখন কোনো জনগোষ্ঠী নিয়মিত সহিংসতার আশঙ্কায় থাকে, তখন তারা হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যেতে ভয় পায়। প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহ পিছিয়ে দেয়। গর্ভবতী নারীরা প্রসূতি সেবা এড়িয়ে যান। শিশুদের চিকিৎসাও বিলম্বিত হয়। ফলে স্বাস্থ্য সংকট আরও জটিল হয়ে ওঠে।

South Africa repatriations top 25,000 ahead of anti-immigrant ultimatum

সমস্যাটিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে জনমনে ছড়িয়ে পড়া সেই ধারণা, যেখানে অভিবাসীদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা হচ্ছে। অথচ কর্মসংস্থান, অর্থনীতি, অপরাধ কিংবা জনসেবার সংকটের মতো জটিল সমস্যার সহজ ব্যাখ্যা হিসেবে অভিবাসীদের সামনে হাজির করা বাস্তবতার প্রতিফলন নয়। বরং এটি সামাজিক বিভাজন বাড়ায় এবং সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করে।

সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার সাংবিধানিক আদালত অভিবাসন-সংক্রান্ত আইনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু আইনি সীমাবদ্ধতার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা পূরণ হয় না। নাগরিক হোক বা অনাগরিক—সবার মৌলিক অধিকার রক্ষা করাই একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্রের মূল পরীক্ষা।

স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের পেশাগত নৈতিকতার কারণে প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে যাবেন। চিকিৎসা গ্রহণের অধিকার কোনো পরিচয়পত্রের ওপর নির্ভর করতে পারে না। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ, মানবিক সহায়তার ব্যয় এবং সামাজিক অস্থিরতার মূল্য শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজকেই বহন করতে হয়।

Hundreds of Malawians repatriated from South Africa as government expands  rescue effort amid migrant tensions

এখন প্রয়োজন ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। প্রথমত, দ্রুত প্রত্যাবাসনকে সাফল্যের ভাষ্যে উপস্থাপন না করে এর মানবিক ও স্বাস্থ্যগত পরিণতি স্বীকার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যেসব মানুষ চিকিৎসাধীন, তাদের জন্য অবিচ্ছিন্ন চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রত্যাবাসনের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ পরিবহন এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে বিদ্যমান আদালতের নির্দেশ কার্যকর করা এবং বৈধতা-সংক্রান্ত সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ তৈরি করা জরুরি।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গিতে। মানুষকে যদি কেবল প্রশাসনিক বোঝা বা রাজনৈতিক সমস্যার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, তাহলে রাষ্ট্র হয়তো সাময়িকভাবে পরিসংখ্যান দেখাতে পারবে, কিন্তু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। একটি গণতান্ত্রিক সমাজের শক্তি নির্ধারিত হয় সে কত দ্রুত মানুষকে সরিয়ে দেয়, তা দিয়ে নয়; বরং কত দৃঢ়ভাবে মানুষের মর্যাদা, স্বাস্থ্য ও অধিকার রক্ষা করে, তা দিয়েই।

রাষ্ট্র যখন মানুষকে সংখ্যায় পরিণত করে, তখন প্রশাসন হয়তো সন্তুষ্ট হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত মনে রাখে, সেই রাষ্ট্র কতটা মানবিক ছিল।

জনপ্রিয় সংবাদ

মানুষকে সংখ্যা বানালে রাষ্ট্র জেতে না, মানবিকতা হারে

মানুষকে সংখ্যা বানালে রাষ্ট্র জেতে না, মানবিকতা হারে

১০:০০:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

দক্ষিণ আফ্রিকায় সাম্প্রতিক অভিবাসী প্রত্যাবাসন অভিযানকে সরকার প্রশাসনিক দক্ষতার সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। অল্প সময়ের মধ্যে হাজার হাজার মানুষকে সীমান্ত পার করে দেওয়া হয়েছে, সরকারি ভাষ্যে সেটিই যেন কার্যকারিতার প্রমাণ। কিন্তু রাষ্ট্রের সাফল্য কি কেবল কত দ্রুত মানুষকে সরানো গেল, তা দিয়ে মাপা যায়? নাকি প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই প্রক্রিয়ায় মানুষের অধিকার, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা কতটা রক্ষা করা হয়েছে?

আজ যে বাস্তবতা সামনে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। সহিংসতা কিংবা সহিংসতার আশঙ্কায় ঘরছাড়া হওয়া মানুষদের অস্থায়ী প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে এনে দ্রুত ফেরত পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সেই তাড়াহুড়োর মধ্যে তারা পর্যাপ্ত আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা নিরাপদ পরিবেশ পেয়েছে—এমন প্রমাণ খুবই সীমিত। রাষ্ট্র মানুষের জীবনকে প্রশাসনিক পরিসংখ্যানের অংশে পরিণত করেছে, অথচ তাদের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ, অসুস্থতা কিংবা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা কার্যত অদৃশ্য হয়ে গেছে।

অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন নয়। কিন্তু এই সংকটের বড় অংশই প্রশাসনিক ব্যর্থতা থেকে তৈরি হয়েছে। বহু মানুষের বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও বা সরকারি দপ্তরের দীর্ঘসূত্রতার কারণে কাগজপত্র নবায়ন না হওয়ায় তারা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। ফলে সমস্যার মূল কারণ দূর না করে মানুষকে সরিয়ে দেওয়াই নীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে।

South Africa's president acknowledges rising tensions over migration –  Hartford Courant

এর ফলে যে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে, সেটি সীমান্তে গিয়ে শেষ হচ্ছে না। যেসব মানুষ এই অভিযানের মধ্যে পড়েছেন, তাদের অনেকে এইচআইভি, যক্ষ্মা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার মধ্যে ছিলেন। আবার কেউ ছিলেন গর্ভকালীন সেবার আওতায়। চিকিৎসার ধারাবাহিকতা হঠাৎ ভেঙে গেলে শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য নয়, পুরো জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাই নতুন ঝুঁকির মুখে পড়ে। সংক্রামক রোগের বিস্তার, ওষুধ প্রতিরোধী সংক্রমণের আশঙ্কা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা—সবকিছুর প্রভাব বহুদিন ধরে থেকে যেতে পারে।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপও দ্রুত বাড়ছে। বিভিন্ন মানবিক সংস্থা এবং চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, বিদেশি নাগরিকদের চিকিৎসার চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। জরুরি চিকিৎসা, ওষুধ সরবরাহ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার প্রয়োজনীয়তা একযোগে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ সমস্যাটি কোনো একটি সীমান্ত এলাকার নয়; এটি জাতীয় জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই পুরো প্রক্রিয়ার মানবিক মূল্য। প্রত্যাবাসনের পথে মৃত্যুর ঘটনা, ক্লান্ত চালকের কারণে দুর্ঘটনা, আহত যাত্রী—এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি তাড়াহুড়ো করা ব্যবস্থার লক্ষণ। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শারীরিক সক্ষমতার মূল্যায়ন কিংবা নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত না করে মানুষকে স্থানান্তর করা হলে এমন ঝুঁকি অনিবার্য হয়ে ওঠে।

কিন্তু দৃশ্যমান ক্ষতির বাইরেও রয়েছে ভয় ও অনিশ্চয়তার গভীর প্রভাব। যখন কোনো জনগোষ্ঠী নিয়মিত সহিংসতার আশঙ্কায় থাকে, তখন তারা হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যেতে ভয় পায়। প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহ পিছিয়ে দেয়। গর্ভবতী নারীরা প্রসূতি সেবা এড়িয়ে যান। শিশুদের চিকিৎসাও বিলম্বিত হয়। ফলে স্বাস্থ্য সংকট আরও জটিল হয়ে ওঠে।

South Africa repatriations top 25,000 ahead of anti-immigrant ultimatum

সমস্যাটিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে জনমনে ছড়িয়ে পড়া সেই ধারণা, যেখানে অভিবাসীদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা হচ্ছে। অথচ কর্মসংস্থান, অর্থনীতি, অপরাধ কিংবা জনসেবার সংকটের মতো জটিল সমস্যার সহজ ব্যাখ্যা হিসেবে অভিবাসীদের সামনে হাজির করা বাস্তবতার প্রতিফলন নয়। বরং এটি সামাজিক বিভাজন বাড়ায় এবং সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করে।

সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার সাংবিধানিক আদালত অভিবাসন-সংক্রান্ত আইনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু আইনি সীমাবদ্ধতার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা পূরণ হয় না। নাগরিক হোক বা অনাগরিক—সবার মৌলিক অধিকার রক্ষা করাই একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্রের মূল পরীক্ষা।

স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের পেশাগত নৈতিকতার কারণে প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে যাবেন। চিকিৎসা গ্রহণের অধিকার কোনো পরিচয়পত্রের ওপর নির্ভর করতে পারে না। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ, মানবিক সহায়তার ব্যয় এবং সামাজিক অস্থিরতার মূল্য শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজকেই বহন করতে হয়।

Hundreds of Malawians repatriated from South Africa as government expands  rescue effort amid migrant tensions

এখন প্রয়োজন ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। প্রথমত, দ্রুত প্রত্যাবাসনকে সাফল্যের ভাষ্যে উপস্থাপন না করে এর মানবিক ও স্বাস্থ্যগত পরিণতি স্বীকার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যেসব মানুষ চিকিৎসাধীন, তাদের জন্য অবিচ্ছিন্ন চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রত্যাবাসনের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ পরিবহন এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে বিদ্যমান আদালতের নির্দেশ কার্যকর করা এবং বৈধতা-সংক্রান্ত সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ তৈরি করা জরুরি।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গিতে। মানুষকে যদি কেবল প্রশাসনিক বোঝা বা রাজনৈতিক সমস্যার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, তাহলে রাষ্ট্র হয়তো সাময়িকভাবে পরিসংখ্যান দেখাতে পারবে, কিন্তু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। একটি গণতান্ত্রিক সমাজের শক্তি নির্ধারিত হয় সে কত দ্রুত মানুষকে সরিয়ে দেয়, তা দিয়ে নয়; বরং কত দৃঢ়ভাবে মানুষের মর্যাদা, স্বাস্থ্য ও অধিকার রক্ষা করে, তা দিয়েই।

রাষ্ট্র যখন মানুষকে সংখ্যায় পরিণত করে, তখন প্রশাসন হয়তো সন্তুষ্ট হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত মনে রাখে, সেই রাষ্ট্র কতটা মানবিক ছিল।