১০:৩৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
তরুণদের ক্ষোভে বদলাচ্ছে মোদির বিজেপির রাজনীতি বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানো: প্রশাসনিক সমাধান, নাকি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরীক্ষা? ২০২৭ সালে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ইন্দোনেশিয়ার, কমছে বাজেট ঘাটতিও চীনে ভক্সওয়াগেনের ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনায় নতুন শঙ্কা, কমছে বিক্রি ডানপন্থী উত্থানে এশিয়ায় অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাইল্যান্ডে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের নতুন উদ্যোগ, তবু বড় প্রশ্নে অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা রেকিয়াভিকে ‘যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে’: পারমাণবিক অস্ত্র বিলোপের স্বপ্নে রিগ্যান-গর্বাচেভ গ্যাস সংকটে হবিগঞ্জে ১৭১ কারখানা বন্ধ, কর্মহীন লক্ষাধিক শ্রমিক কুষ্টিয়ায় বালুবাহী যান পদ্মায়, নিখোঁজ ৮ বছরের শিশু ১৫ আগস্ট ঘিরে ঢাকায় কঠোর নিরাপত্তা, মাঠে ডিএমপির বিশেষ ইউনিট

সন্তানদের মুখের ভাষাঃ সমাজ ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে

বাংলাদেশে ২০২৪-এর জুলাইয়ে যা ঘটেছিল সে কাজে সমাজের একটি অংশের সায় ছিল। একটি অংশ তার পক্ষে ছিল না। যে কোনো সমাজে এটাই স্বাভাবিক। যারা পক্ষে ছিল তারা বিজয়ী এখনও।

পেশাগত কারণে একটা সুবিধা আছেসব সময়ই রাষ্ট্র ও সমাজের বিজয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষই কথা বলেন বা তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়। আর দীর্ঘদিন এই একটি মাত্র পেশায় থাকায় উভয় পক্ষের নানান পেশার মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হওয়াটাই স্বাভাবিক।

দিন দুয়েক হলো ২০২৪-এর জুলাইয়ের বিজয়ী পক্ষের রাজনীতির বাইরের একজন মানুষের সঙ্গে দেখা হতেই তিনি খুবই দুঃখের সঙ্গে বলতে শুরু করলেনএইচ এস সি পরীক্ষা নিয়ে যারা আন্দোলন করেছে সেই সব কিশোর-কিশোরীদের মুখের ভাষাএমনকি শিক্ষামন্ত্রীকে সে”, “তুমি” ও নাম ধরে বলার মতো অশালীনতা নিয়ে।

বৃদ্ধাশ্রম থেকে ছেলেকে লেখা অসহায় বৃদ্ধ বাবার আবেগি চিঠি

আমি হাসতে হাসতে বললামদেখুন আপনি” সম্বোধনটি আমার জানা ভাষার মধ্যে সংস্কৃতজাত ভাষাগুলো ও ফ্রেঞ্চ ভাষায় আছে। তবে যতদূর জানি আধুনিক ইংরেজিতে নেই। যেহেতু এখন ইংরেজি ভাষা রাজত্ব করছে পৃথিবীতেতাই সে হিসেবে তাদের এই ইংরেজি অনুকরণকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়া যেতে পারে।

তিনি বেশ ক্ষোভের সঙ্গে বললেনতাই বলে এই অশালীন শব্দগুলো কেন বলবেবললামদেখুনআপনার ও আমার কারও পেশা শিক্ষকতা নয়। তাই কারও ভাষা শেখানোর দায় তো আপনার-আমার নয়। পরিবার বা আপনজনদের আমরা বলতে পারি। যেমন কয়েকটি ছেলে-মেয়েযাদের পিতা ও মাতার বাংলা ভাষা ও শিল্প-সংস্কৃতিতে অবদান আছেতাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাষা ব্যবহার দেখে কিছুটা খারাপ লেগেছিল। তারপরে ভেবে দেখি তারা যদি তাদের পিতা-মাতার তৈরি সংস্কৃতি ও ভাষা নষ্ট করে তাহলে অন্যের কী করার আছে?

Archaeological Ruins at Moenjodaro - UNESCO World Heritage Centre
                                                                                                                                                                       -হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ

হঠাৎ তিনি প্রশ্ন করলেনকেন এমন হলো?

বিনয়ের সঙ্গে তাকে প্রশ্ন করি২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট বা তার পরবর্তী সময়ে আপনি কি এ দেশে ছিলেন নাআপনিআমিআমরা তো ১৯৬৯ থেকে সব আন্দোলন দেখে আসছি। ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের স্লোগানগুলো তো ছিল হৃদয়-মথিত কবিতা। এমনকি ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে দেখুন তোভুল বানান হলেও নূর হোসেন বুকে লিখেছিল, “স্বৈরাচার নীপাত যাক। আর পিঠে লিখেছিল গণতন্ত্র মুক্তিপাক

আর ২০২৪-এর জুলাইয়ে আমাদেরই মতো কারও একজনের কন্যা বা বোন যে প্লাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেখানে লেখা ছিল Fu… Me, তবুও স্বৈরাচারের পতন হোক। আর যাকে ড. ইউনূসের দ্বিতীয় স্বাধীনতার” কালচার হিরো বানিয়ে- রাষ্ট্র তার মৃত্যুতে নেমে পড়লবাকি ইতিহাস সকলেই জানেনতাঁর মুখের ভাষাই তো এখন প্রধানমন্ত্রীশিক্ষামন্ত্রী সকলের বিরুদ্ধে এই সব কিশোর ও তরুণ-তরুণীরা ব্যবহার করছে। কারণ একজন নোবেল লরিয়েটের রাজত্বকালে তারা শিখেছেএগুলোই যারা বলে তারাই গুণী লোক।

ভদ্রলোক আমাকে বললেনগত কয়েকদিনের রাজপথের ভাষা শুনে আমি মনে হয় ক্ষুব্ধ।

ভদ্রলোককে বিনয়ের সঙ্গে বলিআমার যে বয়সএই বয়সে কোনো ক্ষোভ থাকে না। কিছু কিছু উপলব্ধি করার চেষ্টা আসে শুধু। এখন বুঝিলেখাপড়া ও জানাটা বড় একপেশে বা মুদ্রার এক পিঠের হয়ে গেছে। পৃথিবীতে হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ সভ্যতা সৃষ্টি করেছেন। হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে মুক্তি দিয়ে রাষ্ট্র তৈরি করেছেন। আমরা কেবল তাদের ইতিহাস পড়েছি। এই সব সভ্যতা ও রাষ্ট্র বারবার কীভাবে ধ্বংস হয়েছে তা নিয়ে গবেষণাও কম হয়েছে। আমরাও পড়েছি কম।

 

২০২৪-এর পরে সমাজে প্রকাশ্যে এই সব ভাষা বলতে দেখে এখন তো মনে হয় হরপ্পা বা মহেঞ্জোদারো শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ধ্বংস হয়নি। তার পেছনেও একজন না একজন মানুষ ছিল। আর তার সহযোগী হয়তো কিছু মানুষ ছিল।

আমাদের ঐতিহাসিকরা বলেনবঙ্গবন্ধু না জন্মালে এবং তার কিছু সহকর্মী না থাকলে আমাদের এই স্বাধীনতা ও দেশ কোনোটাই হতো না।

২০২৪-এর পরে আমাদের ঐতিহাসিকদের এই কথায় আরও বেশি বিশ্বাস জন্মেছে। কারণআজ আপনিআমি বা সকলে এই যে নষ্ট ভাষা শুনছি বা সমাজ ও সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ দেখছি। ইউনূস বাংলাদেশে না জন্মালে এবং তার কিছু সুযোগ্য সহকর্মী না থাকলে এটা আমরা দেখতে পেতাম না।

রাষ্ট্রসমাজ ও সভ্যতা সৃষ্টিতে যেমন বেশি মানুষের প্রয়োজন পড়ে নাধ্বংসের জন্যেও তেমনি যে একজন ও তার কয়েক সহযোগীই যথেষ্টতার প্রমাণ তো ইউনূস দিয়ে গেলেন।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিকসম্পাদকসারাক্ষণ, The Present World.

জনপ্রিয় সংবাদ

তরুণদের ক্ষোভে বদলাচ্ছে মোদির বিজেপির রাজনীতি

সন্তানদের মুখের ভাষাঃ সমাজ ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে

০৯:২০:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশে ২০২৪-এর জুলাইয়ে যা ঘটেছিল সে কাজে সমাজের একটি অংশের সায় ছিল। একটি অংশ তার পক্ষে ছিল না। যে কোনো সমাজে এটাই স্বাভাবিক। যারা পক্ষে ছিল তারা বিজয়ী এখনও।

পেশাগত কারণে একটা সুবিধা আছেসব সময়ই রাষ্ট্র ও সমাজের বিজয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষই কথা বলেন বা তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়। আর দীর্ঘদিন এই একটি মাত্র পেশায় থাকায় উভয় পক্ষের নানান পেশার মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হওয়াটাই স্বাভাবিক।

দিন দুয়েক হলো ২০২৪-এর জুলাইয়ের বিজয়ী পক্ষের রাজনীতির বাইরের একজন মানুষের সঙ্গে দেখা হতেই তিনি খুবই দুঃখের সঙ্গে বলতে শুরু করলেনএইচ এস সি পরীক্ষা নিয়ে যারা আন্দোলন করেছে সেই সব কিশোর-কিশোরীদের মুখের ভাষাএমনকি শিক্ষামন্ত্রীকে সে”, “তুমি” ও নাম ধরে বলার মতো অশালীনতা নিয়ে।

বৃদ্ধাশ্রম থেকে ছেলেকে লেখা অসহায় বৃদ্ধ বাবার আবেগি চিঠি

আমি হাসতে হাসতে বললামদেখুন আপনি” সম্বোধনটি আমার জানা ভাষার মধ্যে সংস্কৃতজাত ভাষাগুলো ও ফ্রেঞ্চ ভাষায় আছে। তবে যতদূর জানি আধুনিক ইংরেজিতে নেই। যেহেতু এখন ইংরেজি ভাষা রাজত্ব করছে পৃথিবীতেতাই সে হিসেবে তাদের এই ইংরেজি অনুকরণকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়া যেতে পারে।

তিনি বেশ ক্ষোভের সঙ্গে বললেনতাই বলে এই অশালীন শব্দগুলো কেন বলবেবললামদেখুনআপনার ও আমার কারও পেশা শিক্ষকতা নয়। তাই কারও ভাষা শেখানোর দায় তো আপনার-আমার নয়। পরিবার বা আপনজনদের আমরা বলতে পারি। যেমন কয়েকটি ছেলে-মেয়েযাদের পিতা ও মাতার বাংলা ভাষা ও শিল্প-সংস্কৃতিতে অবদান আছেতাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাষা ব্যবহার দেখে কিছুটা খারাপ লেগেছিল। তারপরে ভেবে দেখি তারা যদি তাদের পিতা-মাতার তৈরি সংস্কৃতি ও ভাষা নষ্ট করে তাহলে অন্যের কী করার আছে?

Archaeological Ruins at Moenjodaro - UNESCO World Heritage Centre
                                                                                                                                                                       -হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ

হঠাৎ তিনি প্রশ্ন করলেনকেন এমন হলো?

বিনয়ের সঙ্গে তাকে প্রশ্ন করি২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট বা তার পরবর্তী সময়ে আপনি কি এ দেশে ছিলেন নাআপনিআমিআমরা তো ১৯৬৯ থেকে সব আন্দোলন দেখে আসছি। ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের স্লোগানগুলো তো ছিল হৃদয়-মথিত কবিতা। এমনকি ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে দেখুন তোভুল বানান হলেও নূর হোসেন বুকে লিখেছিল, “স্বৈরাচার নীপাত যাক। আর পিঠে লিখেছিল গণতন্ত্র মুক্তিপাক

আর ২০২৪-এর জুলাইয়ে আমাদেরই মতো কারও একজনের কন্যা বা বোন যে প্লাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেখানে লেখা ছিল Fu… Me, তবুও স্বৈরাচারের পতন হোক। আর যাকে ড. ইউনূসের দ্বিতীয় স্বাধীনতার” কালচার হিরো বানিয়ে- রাষ্ট্র তার মৃত্যুতে নেমে পড়লবাকি ইতিহাস সকলেই জানেনতাঁর মুখের ভাষাই তো এখন প্রধানমন্ত্রীশিক্ষামন্ত্রী সকলের বিরুদ্ধে এই সব কিশোর ও তরুণ-তরুণীরা ব্যবহার করছে। কারণ একজন নোবেল লরিয়েটের রাজত্বকালে তারা শিখেছেএগুলোই যারা বলে তারাই গুণী লোক।

ভদ্রলোক আমাকে বললেনগত কয়েকদিনের রাজপথের ভাষা শুনে আমি মনে হয় ক্ষুব্ধ।

ভদ্রলোককে বিনয়ের সঙ্গে বলিআমার যে বয়সএই বয়সে কোনো ক্ষোভ থাকে না। কিছু কিছু উপলব্ধি করার চেষ্টা আসে শুধু। এখন বুঝিলেখাপড়া ও জানাটা বড় একপেশে বা মুদ্রার এক পিঠের হয়ে গেছে। পৃথিবীতে হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ সভ্যতা সৃষ্টি করেছেন। হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে মুক্তি দিয়ে রাষ্ট্র তৈরি করেছেন। আমরা কেবল তাদের ইতিহাস পড়েছি। এই সব সভ্যতা ও রাষ্ট্র বারবার কীভাবে ধ্বংস হয়েছে তা নিয়ে গবেষণাও কম হয়েছে। আমরাও পড়েছি কম।

 

২০২৪-এর পরে সমাজে প্রকাশ্যে এই সব ভাষা বলতে দেখে এখন তো মনে হয় হরপ্পা বা মহেঞ্জোদারো শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ধ্বংস হয়নি। তার পেছনেও একজন না একজন মানুষ ছিল। আর তার সহযোগী হয়তো কিছু মানুষ ছিল।

আমাদের ঐতিহাসিকরা বলেনবঙ্গবন্ধু না জন্মালে এবং তার কিছু সহকর্মী না থাকলে আমাদের এই স্বাধীনতা ও দেশ কোনোটাই হতো না।

২০২৪-এর পরে আমাদের ঐতিহাসিকদের এই কথায় আরও বেশি বিশ্বাস জন্মেছে। কারণআজ আপনিআমি বা সকলে এই যে নষ্ট ভাষা শুনছি বা সমাজ ও সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ দেখছি। ইউনূস বাংলাদেশে না জন্মালে এবং তার কিছু সুযোগ্য সহকর্মী না থাকলে এটা আমরা দেখতে পেতাম না।

রাষ্ট্রসমাজ ও সভ্যতা সৃষ্টিতে যেমন বেশি মানুষের প্রয়োজন পড়ে নাধ্বংসের জন্যেও তেমনি যে একজন ও তার কয়েক সহযোগীই যথেষ্টতার প্রমাণ তো ইউনূস দিয়ে গেলেন।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিকসম্পাদকসারাক্ষণ, The Present World.