বাংলাদেশে ২০২৪-এর জুলাইয়ে যা ঘটেছিল সে কাজে সমাজের একটি অংশের সায় ছিল। একটি অংশ তার পক্ষে ছিল না। যে কোনো সমাজে এটাই স্বাভাবিক। যারা পক্ষে ছিল তারা বিজয়ী এখনও।
পেশাগত কারণে একটা সুবিধা আছে—সব সময়ই রাষ্ট্র ও সমাজের বিজয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষই কথা বলেন বা তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়। আর দীর্ঘদিন এই একটি মাত্র পেশায় থাকায় উভয় পক্ষের নানান পেশার মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হওয়াটাই স্বাভাবিক।
দিন দুয়েক হলো ২০২৪-এর জুলাইয়ের বিজয়ী পক্ষের রাজনীতির বাইরের একজন মানুষের সঙ্গে দেখা হতেই তিনি খুবই দুঃখের সঙ্গে বলতে শুরু করলেন, এইচ এস সি পরীক্ষা নিয়ে যারা আন্দোলন করেছে সেই সব কিশোর-কিশোরীদের মুখের ভাষা, এমনকি শিক্ষামন্ত্রীকে “সে”, “তুমি” ও নাম ধরে বলার মতো অশালীনতা নিয়ে।

আমি হাসতে হাসতে বললাম, দেখুন “আপনি” সম্বোধনটি আমার জানা ভাষার মধ্যে সংস্কৃতজাত ভাষাগুলো ও ফ্রেঞ্চ ভাষায় আছে। তবে যতদূর জানি আধুনিক ইংরেজিতে নেই। যেহেতু এখন ইংরেজি ভাষা রাজত্ব করছে পৃথিবীতে, তাই সে হিসেবে তাদের এই ইংরেজি অনুকরণকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়া যেতে পারে।
তিনি বেশ ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, তাই বলে এই অশালীন শব্দগুলো কেন বলবে? বললাম, দেখুন, আপনার ও আমার কারও পেশা শিক্ষকতা নয়। তাই কারও ভাষা শেখানোর দায় তো আপনার-আমার নয়। পরিবার বা আপনজনদের আমরা বলতে পারি। যেমন কয়েকটি ছেলে-মেয়ে, যাদের পিতা ও মাতার বাংলা ভাষা ও শিল্প-সংস্কৃতিতে অবদান আছে, তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাষা ব্যবহার দেখে কিছুটা খারাপ লেগেছিল। তারপরে ভেবে দেখি তারা যদি তাদের পিতা-মাতার তৈরি সংস্কৃতি ও ভাষা নষ্ট করে তাহলে অন্যের কী করার আছে?

হঠাৎ তিনি প্রশ্ন করলেন, কেন এমন হলো?
বিনয়ের সঙ্গে তাকে প্রশ্ন করি, ২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট বা তার পরবর্তী সময়ে আপনি কি এ দেশে ছিলেন না? আপনি, আমি, আমরা তো ১৯৬৯ থেকে সব আন্দোলন দেখে আসছি। ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের স্লোগানগুলো তো ছিল হৃদয়-মথিত কবিতা। এমনকি ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে দেখুন তো, ভুল বানান হলেও নূর হোসেন বুকে লিখেছিল, “স্বৈরাচার নীপাত যাক”। আর পিঠে লিখেছিল “গণতন্ত্র মুক্তিপাক”।
আর ২০২৪-এর জুলাইয়ে আমাদেরই মতো কারও একজনের কন্যা বা বোন যে প্লাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেখানে লেখা ছিল Fu… Me, তবুও স্বৈরাচারের পতন হোক। আর যাকে ড. ইউনূসের “দ্বিতীয় স্বাধীনতার” কালচার হিরো বানিয়ে রাষ্ট্র তার মৃত্যুতে নেমে পড়ল—বাকি ইতিহাস সকলেই জানেন—তাঁর মুখের ভাষাই তো এখন প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী সকলের বিরুদ্ধে এই সব কিশোর ও তরুণ-তরুণীরা ব্যবহার করছে। কারণ একজন নোবেল লরিয়েটের রাজত্বকালে তারা শিখেছে, এগুলোই যারা বলে তারাই গুণী লোক।
ভদ্রলোক আমাকে বললেন, গত কয়েকদিনের রাজপথের ভাষা শুনে আমি মনে হয় ক্ষুব্ধ।
ভদ্রলোককে বিনয়ের সঙ্গে বলি, আমার যে বয়স, এই বয়সে কোনো ক্ষোভ থাকে না। কিছু কিছু উপলব্ধি করার চেষ্টা আসে শুধু। এখন বুঝি, লেখাপড়া ও জানাটা বড় এক পেশা বা মুদ্রার এক পিঠের হয়ে গেছে। পৃথিবীতে হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ সভ্যতা সৃষ্টি করেছেন। হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে মুক্তি দিয়ে রাষ্ট্র তৈরি করেছেন। আমরা কেবল তাদের ইতিহাস পড়েছি। এই সব সভ্যতা ও রাষ্ট্র বারবার কীভাবে ধ্বংস হয়েছে তা নিয়ে গবেষণাও কম হয়েছে। আমরাও পড়েছি কম।

২০২৪-এর পরে সমাজে প্রকাশ্যে এই সব ভাষা বলতে দেখে এখন তো মনে হয় হরপ্পা বা মহেঞ্জোদারো শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ধ্বংস হয়নি। তার পেছনেও একজন না একজন মানুষ ছিল। আর তার সহযোগী হয়তো কিছু মানুষ ছিল।
আমাদের ঐতিহাসিকরা বলেন, বঙ্গবন্ধু না জন্মালে এবং তার কিছু সহকর্মী না থাকলে আমাদের এই স্বাধীনতা ও দেশ কোনোটাই হতো না।
২০২৪-এর পরে আমাদের ঐতিহাসিকদের এই কথায় আরও বেশি বিশ্বাস জন্মেছে। কারণ, আজ আপনি, আমি বা সকলে এই যে নষ্ট ভাষা শুনছি বা সমাজ ও সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ দেখছি। ইউনূস বাংলাদেশে না জন্মালে এবং তার কিছু সুযোগ্য সহকর্মী না থাকলে এটা আমরা দেখতে পেতাম না।
রাষ্ট্র, সমাজ ও সভ্যতা সৃষ্টিতে যেমন বেশি মানুষের প্রয়োজন পড়ে না, ধ্বংসের জন্যেও তেমনি যে একজন ও তার কয়েক সহযোগীই যথেষ্ট, তার প্রমাণ তো ইউনূস দিয়ে গেলেন।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায় 


















