যুক্তরাষ্ট্র হামলা বন্ধ রাখলে ইরানও পাল্টা সামরিক অভিযান স্থগিত রাখবে বলে জানিয়েছে তেহরান। তবে সাময়িক এই বিরতিকে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পথে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছে না ইরান। দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বন্ধ থাকলেই কেবল ইরানের পক্ষ থেকেও হামলা বন্ধ থাকবে।
টানা ১৩ রাতের মার্কিন বিমান হামলার পর শুক্রবার রাতে অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর শনিবার ও রোববার ইরানে নতুন করে কোনো মার্কিন হামলার খবর পাওয়া যায়নি। একই সময়ে ইরানও গত দুই দিন কোনো পাল্টা হামলা চালায়নি।
হামলা বন্ধে ইরানের শর্ত
ইরানের অবস্থান এখনো ‘হামলার জবাবে হামলা’ নীতিতেই রয়েছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইরানও পাল্টা অভিযান চালাবে। আর যুক্তরাষ্ট্র হামলা বন্ধ রাখলে তেহরানও সামরিক অভিযান স্থগিত রাখবে।
ইরানের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই বার্তা ইতোমধ্যে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তবে সাময়িক বিরতিকে কেন্দ্র করে তেহরানে আশাবাদের চেয়ে সন্দেহই বেশি।

কূটনীতির জন্য সময় দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের জাতিসংঘবিষয়ক রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ জানিয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক আলোচনার জন্য আরও সময় দিতে হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনার জন্য কিছুটা জায়গা তৈরি করতেই এই বিরতি। তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে হামলা চালিয়ে যাওয়ার কার্যকারিতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত দুই সপ্তাহের অভিযানে আগে থেকে নির্ধারিত অনেক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। ফলে নতুন লক্ষ্যবস্তুর পরিমাণও কমে এসেছে বলে জানা গেছে।
অস্ত্রের মজুত নিয়েও উদ্বেগ
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সামনে আরেকটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্ত্রের মজুত। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ধরে রেখেছে বলে ওয়াল্টজ দাবি করলেও তিনি স্বীকার করেছেন, বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার সময় সামরিক অস্ত্রভান্ডারে ঘাটতি ছিল।
তবে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করার সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা
গত দুই সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উত্তেজনা। মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের হামলা থেকে সমুদ্রপথ ও জাহাজ চলাচল রক্ষায় সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
মার্কিন হামলার জবাবে ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে থাকা পানি পরিশোধন ও লবণমুক্তকরণ স্থাপনাকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে জানা গেছে।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইরানের সংশয়
সাময়িক হামলা বন্ধের ঘটনায় তেহরানে স্বস্তির পাশাপাশি বড় ধরনের সন্দেহও রয়েছে। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই বিরতি কৌশলগত হতে পারে এবং এটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত নাও হতে পারে।
তার মতে, অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নিয়ে ইরানের মধ্যে আস্থার সংকট রয়েছে। তাই সাময়িক বিরতিকে ঘিরে আশাবাদের চেয়ে সতর্কতাই বেশি।
এরই মধ্যে গত মাসে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে হওয়া একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতার সম্ভাবনাও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান জোরদার হওয়ায় সেই সমঝোতার পথ কার্যত থমকে যায়।
অনিশ্চয়তায় ইরানের সাধারণ মানুষ
হামলা বন্ধ থাকলেও ইরানের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ কাটেনি। তেহরানের এক ব্যবসায়ী বলেন, মানুষ এখন এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছে। যুদ্ধ শেষও হচ্ছে না, আবার বড় ধরনের হামলাও হচ্ছে না—এই অবস্থাই সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্লান্তিকর হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই সাময়িকভাবে হামলা থেকে বিরত রয়েছে। কিন্তু এই বিরতি কতদিন স্থায়ী হবে এবং এর মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুলবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট মনে করছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে। তাই সাময়িক হামলা বন্ধের এই সুযোগকে স্থায়ী শান্তি আলোচনায় রূপ দেওয়া এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন আশা তৈরি হলেও তেহরানের সংশয় এখনো কাটেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

























