পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এক নেতার বসতবাড়িতে লুটপাট চালিয়ে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং পরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘটেছে শুক্রবার গভীর রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত উপজেলার কাঠালতলী বাজারসংলগ্ন এলাকায়। অভিযোগের তীর স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর দিকে, যদিও অভিযুক্তরা তা অস্বীকার করেছেন।
ঘটনার সময় বাড়িটি তালাবদ্ধ ছিল এবং সেখানে কোনও বাসিন্দা অবস্থান করছিলেন না। আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে স্থানীয়দের অনেকেই এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যা দেখা গেছে
সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়ির বিভিন্ন কক্ষ পুড়ে গেছে এবং ঘরের আসবাবপত্রসহ নানা মালামাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ভবনের সামনের অংশ ভাঙা এবং পুরো বাড়িটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাড়িটির মালিক কাজী মিজানুর রহমান লাভলু মাধবখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ওই ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। এরপর তার স্থলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়িত্ব পালন করা হয়।
পরিবারের অভিযোগ
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, লাভলুর বৃদ্ধা মা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর বাড়িটি সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে যায়। সেই সুযোগে গভীর রাতে বুলডোজার দিয়ে একতলা ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। এরপর ঘরে থাকা রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, ওভেন, এসি, স্বর্ণালংকার, মূল্যবান কাগজপত্রসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয়। তাদের দাবি, লুট হওয়া সম্পদের মূল্য প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা এবং বাড়িটির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় এক কোটি টাকা।
লাভলুর স্ত্রী মেহেরুন্নেছা শিল্পীর অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা ও তাদের অনুসারীদের নেতৃত্বে কয়েকশ মানুষ এ হামলায় অংশ নেয়। তিনি আরও দাবি করেন, হামলার আগে আশপাশের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয় এবং কেউ ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে তার মোবাইল ফোনও কেড়ে নেওয়া হয়।
লাভলু কাজীর অভিযোগ, তার সঙ্গে অভিযুক্তদের কোনও ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল না। তিনি দাবি করেন, প্রথমে ভবনের সামনের অংশ ভেঙে আলমারি থেকে স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করা হয়, এরপর পুরো ভবন গুঁড়িয়ে দিয়ে আগুন লাগানো হয়।

অভিযুক্তদের বক্তব্য
পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী দেশের বাইরে থাকায় তার সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, এ ঘটনার সঙ্গে তার কোনও সম্পৃক্ততা নেই এবং তাকে জড়িয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচার চালানো হচ্ছে।
মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহীন চৌধুরী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি ঘটনার সময় ঢাকায় ছিলেন এবং এলাকায় ফিরে বিষয়টি জানতে পারেন। তার দাবি, সংশ্লিষ্ট জমি বহু আগে পাবলিক লাইব্রেরির নামে নিবন্ধিত হয়েছিল এবং বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় তার বা দলের কোনও আগ্রহ নেই।
ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মনির খন্দকারও দাবি করেন, বাড়িটি পাবলিক লাইব্রেরির জমিতে নির্মিত হয়েছিল। অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাহাবুদ্দিন নান্নু মুন্সী বলেন, এ ঘটনায় দলের কোনও সম্পৃক্ততা নেই। কেউ ব্যক্তিগতভাবে অপরাধ করলে তার দায় দল নেবে না।
প্রশাসনের অবস্থান
মির্জাগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস জানায়, শনিবার সকাল ৬টার পর খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে চারটি কক্ষের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মো. রাসেল ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর বলেন, বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলা হলেও কেউ ঘটনার বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, জমির মালিকানা নিয়ে একটি আবেদন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে রয়েছে এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিষয়টি তদন্ত করছেন।
মির্জাগঞ্জ থানার ওসি তৌহিদুজ্জামান বলেন, বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনও লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্তের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

























