টানা বৃষ্টিতে খুলনা নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। গত ৫১ ঘণ্টায় ১৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের পর সড়ক, অলিগলি ও নিচু এলাকা হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে গিয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ৮২৩ কোটি টাকার ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও কেন স্থায়ী সমাধান মিলছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী ও পরিবেশসংশ্লিষ্টরা।
খুলনা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ৫১ ঘণ্টায় নগরে মোট ১৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা বর্ষণে শহরের বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যাতায়াত, শিক্ষা কার্যক্রম ও পরিবহন চলাচলে ব্যাপক দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা
মুজগুন্নী, রয়্যাল মোড়, টুটপাড়া, জিন্নাহ নগর, দৌলতপুর, আত্রা, গিলতলা, দিলখোলা, বানারগাতি ও শেখপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এসব এলাকার বহু বাড়ির ভেতরেও পানি ঢুকে পড়েছে, ফলে বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে।

প্রকল্পের পরও কেন সমাধান মিলছে না?
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্ষা এলেই খুলনায় জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত সাড়ে পাঁচ বছরে সাতটি খাল খনন এবং ২০০টিরও বেশি ড্রেন নির্মাণ বা সংস্কার করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যায়নি।
মুজগুন্নীর ব্যবসায়ী মোস্তফা বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই মোড়ে হাঁটুসমান পানি জমে যায়। তিনি স্থায়ী সমাধানের জন্য খুলনা সিটি করপোরেশনের কার্যকর উদ্যোগ দাবি করেন।
পাবলার করিগরপাড়ার বাসিন্দা হামিম জানান, নতুন সড়ক ও ড্রেন নির্মাণের সময় আশপাশের বাড়ির পানি নিষ্কাশনের উপযুক্ত সংযোগ রাখা হয়নি। ফলে বৃষ্টির পানি নিয়মিত তার বাড়ির নিচতলায় ঢুকে পড়ে।
নগর পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন
পাবলা সাহাপাড়ার বাসিন্দা অনুপ কুমারের মতে, সমস্যার মূল কারণ শুধু অপর্যাপ্ত ড্রেন নয়, বরং দুর্বল নগর পরিকল্পনা। তিনি বলেন, অনেক প্রাকৃতিক খাল সংকুচিত করে কংক্রিটের ড্রেনে রূপান্তর করা হয়েছে, এতে পানি ধারণ ও প্রবাহের স্বাভাবিক সক্ষমতা কমে গেছে।
তার মতে, শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ করলেই সমাধান হবে না। প্রাকৃতিক খাল পুনরুদ্ধার, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার এবং নদী-খালের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবহন শ্রমিকদের দুর্ভোগ
ইজিবাইকচালক হাফিজ বলেন, জলাবদ্ধ সড়কেও জীবিকার তাগিদে তাকে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। তার ভাষায়, শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ হলেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমেনি।
সিটি করপোরেশনের ব্যাখ্যা
খুলনা সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, নগরে প্রায় ১ হাজার ১৬৫ কিলোমিটার ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক রয়েছে। ৮২৩ কোটি টাকার ‘খুলনা সিটি ওয়াটারলগিং মিটিগেশন থ্রু ড্রেনেজ সিস্টেম ইমপ্রুভমেন্ট (ফেজ-১)’ প্রকল্পের আওতায় খাল খনন, ড্রেন নির্মাণ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক ও সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ মাসুদ করিম জানান, প্রকল্পের আওতায় মোট ১৪৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ১৬৯টি আচ্ছাদিত ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে।
প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান বলেন, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করা হলেও টানা বৃষ্টির কারণে আপাতত কাজ বন্ধ রয়েছে। কারণ, ড্রেন থেকে তোলা কাদা আবার বৃষ্টির পানিতে ভেসে ফিরে আসছে। তিনি আরও জানান, নতুন আচ্ছাদিত ড্রেন পরিষ্কারের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি এখনও না থাকায় শ্রমিকদের কংক্রিটের ঢাকনা হাতে খুলে কাজ করতে হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় এসব যন্ত্রপাতি সংগ্রহের উদ্যোগ রয়েছে।
জলাবদ্ধতার পেছনে একাধিক কারণ
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, অতীতের দুর্বল ড্রেনেজ পরিকল্পনা, অসমাপ্ত অবকাঠামো, রূপসা নদীর পাম্প হাউস অকার্যকর থাকা, অচল স্লুইস গেট এবং উঁচু হয়ে যাওয়া ড্রেনের তলদেশ—এসব কারণ একসঙ্গে জলাবদ্ধতার সমস্যা বাড়িয়েছে। এতে অনেক আবাসিক এলাকা আশপাশের সড়কের তুলনায় নিচু হয়ে পড়েছে।
তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত তিন মাস ধরে পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা দূর করা ও ড্রেন পরিষ্কারের কাজ চলছে। পাশাপাশি নগরবাসীকে ড্রেনে ময়লা না ফেলে নির্ধারিত ডাস্টবিন ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

























