কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তিকে ঘিরে আশাবাদের সুর ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। কিন্তু একটি দেশ যেন এই বৈশ্বিক প্রবণতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে—যুক্তরাষ্ট্র। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের নেতৃত্বদানকারী দেশটির নাগরিকরা এআই নিয়ে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি উদ্বিগ্ন, এমনকি হতাশ।
প্রথম দৃষ্টিতে বিষয়টি অদ্ভুত মনে হতে পারে। যে সমাজ নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে সাধারণত সবচেয়ে আগ্রহী, সেই সমাজই কেন এআইকে সন্দেহের চোখে দেখছে? প্রযুক্তি খাতের অনেকেই এর ব্যাখ্যা খোঁজেন তথ্যগত বিভ্রান্তি, নেতিবাচক সংবাদ প্রচার বা জনসচেতনতার ঘাটতিতে। তাদের মতে, মানুষকে এআইয়ের সম্ভাবনা সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বোঝাতে পারলেই এই উদ্বেগ দূর হবে।
কিন্তু বাস্তবতা সম্ভবত আরও গভীর।
সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, নিরাপত্তাবোধে
এআই নিয়ে মানুষের মনোভাব কেবল প্রযুক্তি সম্পর্কে তাদের জ্ঞান বা অজ্ঞতার প্রতিফলন নয়। বরং এটি অনেকাংশে নির্ভর করে তারা যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বাস করেন, তার ওপর। একই প্রযুক্তি এক দেশে সুযোগের প্রতীক হতে পারে, অন্য দেশে তা হয়ে উঠতে পারে অনিশ্চয়তার প্রতিচ্ছবি।
যেসব দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে কাজ করেন—যেখানে চাকরির স্থায়িত্ব, সামাজিক সুরক্ষা কিংবা আইনি সুবিধা সীমিত—সেখানে এআইকে প্রায়ই উন্নয়নের সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হয়। ছোট উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা স্বনির্ভর কর্মজীবীরা মনে করেন, নতুন প্রযুক্তি তাদের এমন কিছু সুযোগ দিতে পারে যা আগে কেবল বড় প্রতিষ্ঠান বা উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
অন্যদিকে উন্নত অর্থনীতির বহু কর্মজীবী মানুষের কাছে এআই নতুন দরজা খোলার চেয়ে বিদ্যমান দরজাগুলো বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে। কারণ তারা ইতোমধ্যে এমন একটি অবস্থানে আছেন, যেখানে স্থায়ী চাকরি, নির্দিষ্ট আয় এবং পেশাগত মর্যাদা তাদের জীবনের ভিত্তি। এআই যদি সেই ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়, তবে লাভের সম্ভাবনার চেয়ে ক্ষতির ভয়ই বড় হয়ে ওঠে।
একই ধনী দেশ, ভিন্ন মনোভাব
তবে শুধু ধনী-গরিবের বিভাজন দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ সব উন্নত দেশের নাগরিকরাই সমানভাবে এআইবিরোধী নন। নরওয়ে, জার্মানি বা কিছু ইউরোপীয় দেশের মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি আশাবাদী, যদিও তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি।
এই পার্থক্যের উৎস খুঁজতে গেলে চোখ পড়ে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে।

কোনো ব্যক্তি চাকরি হারালে নরওয়ে, ফ্রান্স বা জার্মানির মতো দেশে সরকার উল্লেখযোগ্য সময় পর্যন্ত তার আয়ের বড় একটি অংশ প্রতিস্থাপন করে। ফলে চাকরি হারানো সেখানে জীবনধ্বংসী ঘটনা নয়; বরং নতুন কর্মসংস্থানের পথে একটি সাময়িক বাধা।
যুক্তরাষ্ট্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। বেকার ভাতা তুলনামূলকভাবে সীমিত, অঞ্চলভেদে অসম এবং অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রতুল। অসংখ্য মানুষ প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার আগেই সঞ্চয় শেষ করে ফেলেন। অর্থাৎ চাকরি হারানো মানে শুধু বেতন হারানো নয়; অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পুরো কাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়ে যাওয়া।
স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে চাকরির বন্ধন
আমেরিকান উদ্বেগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস সম্ভবত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। বিশ্বের অধিকাংশ ধনী দেশে স্বাস্থ্যসেবা নাগরিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত। চাকরি থাকুক বা না থাকুক, মানুষ চিকিৎসা সুবিধা হারান না।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যবিমা এখনও ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। ফলে চাকরি হারানো মানে অনেক পরিবারের জন্য একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হওয়া। বিশেষ করে মধ্যবয়সী কর্মীদের ক্ষেত্রে, যাদের পরিবার, সন্তান, আবাসন ঋণ এবং চলমান চিকিৎসা ব্যয় রয়েছে, এই অনিশ্চয়তা আরও গভীর।
এ কারণেই এআইকে তারা কেবল একটি নতুন প্রযুক্তি হিসেবে দেখেন না; বরং এমন একটি শক্তি হিসেবে দেখেন যা তাদের জীবনের সবচেয়ে দুর্বল জায়গাগুলোতে আঘাত হানতে পারে।
প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নয়, ভঙ্গুর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে উদ্বেগ
এআই নিয়ে আমেরিকানদের শঙ্কাকে অনেকেই প্রযুক্তিভীতি বলে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু বাস্তবে এটি হয়তো প্রযুক্তির চেয়ে বেশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ। মানুষ নতুন প্রযুক্তিকে ভয় পাচ্ছে না; তারা ভয় পাচ্ছে সেই পরিস্থিতিকে, যেখানে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো সুরক্ষা তাদের নেই।
যদি কর্মহীনতার সময় পর্যাপ্ত আয়-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেত, যদি স্বাস্থ্যসেবা চাকরির ওপর নির্ভরশীল না হতো, তবে এআই সম্পর্কে জনমতও হয়তো ভিন্ন হতো। কারণ প্রযুক্তির প্রতি মানুষের আস্থা অনেক সময় প্রযুক্তির ক্ষমতার ওপর নয়, বরং নিজেদের নিরাপত্তাবোধের ওপর নির্ভর করে।
এআই তাই যুক্তরাষ্ট্রে কেবল একটি প্রযুক্তিগত বিতর্ক নয়। এটি দেশটির সামাজিক চুক্তি, কল্যাণব্যবস্থা এবং শ্রমবাজারের দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসা এক আয়না। সেই আয়নায় মানুষ ভবিষ্যতের প্রযুক্তিকে নয়, বরং নিজেদের অনিশ্চিত অবস্থানকেই বেশি স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে।
পল কেদরস্কি 

























