জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কুমামোতো প্রিফেকচারে ৬.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপ, প্রাণহানি এবং টানা আফটারশকের মধ্যে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মঙ্গলবার গভীর রাতে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। উদ্ধারকর্মীরা এখনও ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পরিস্থিতিকে ‘সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি।
ভূমিকম্পের অভিঘাতে কুমামোতোর বহু এলাকায় বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। হাসপাতাল, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং বিভিন্ন ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আফটারশক অব্যাহত থাকায় নতুন করে বিপদের আশঙ্কাও রয়ে গেছে।
ভয়াবহ কম্পনে মুহূর্তেই বদলে যায় সব
কুমামোতোর ইয়াতসুশিরো শহরের একটি রেস্তোরাঁর সহ-মালিক ৭৫ বছর বয়সী হিরোকো ওগাতা জানান, দিনের কাজ শেষের পথে থাকতেই পুরো ভবন প্রচণ্ডভাবে কেঁপে ওঠে। রান্নাঘরের তাক থেকে বাসনপত্র ছিটকে পড়ে ভেঙে যায়।
তিনি বলেন, সঙ্গে সঙ্গে একটি টেবিলের নিচে আশ্রয় নিলেও সেটিও ডানে-বাঁয়ে দুলছিল। সারা জীবন ভূমিকম্পপ্রবণ এই এলাকায় বসবাস করলেও এত শক্তিশালী কম্পন তিনি আগে কখনও অনুভব করেননি।

ওগাতার ভাষায়, ২০১৬ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের তুলনায় এবার পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর মনে হয়েছে। সেই মুহূর্তে তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি হয়তো আর বাঁচবেন না।
উদ্ধার অভিযানে সময়ের সঙ্গে পাল্লা
নিহতদের মধ্যে তিনজন কুমামোতো শহরের একটি এইওন শপিং মলে মারা গেছেন। সেখানে এখনও বহু মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
ভূমিকম্পের পরপরই সরকার ৪ হাজার ৬০০ জন উদ্ধার ও জরুরি সেবা কর্মী মোতায়েন করে। প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি জানিয়েছেন, ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন এবং উদ্ধার তৎপরতা সারা রাত অব্যাহত থাকবে।
তবে উদ্ধার অভিযান চললেও হাজার হাজার মানুষ বিদ্যুৎ ও পানির সংকটে পড়েছেন। অন্তত ৪৫টি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঐতিহাসিক স্থাপনাও রক্ষা পায়নি
শক্তিশালী কম্পনে ১৭শ শতকের ঐতিহাসিক কুমামোতো দুর্গের বাইরের দেয়ালের অংশ ধসে পড়ে। একইভাবে ১৯শ শতকের ইয়াতসুশিরো মন্দিরের উপাসনালয় সম্পূর্ণ ভেঙে যায়।
এই ক্ষয়ক্ষতি স্থানীয়দের জন্য শুধু আর্থিক নয়, সাংস্কৃতিকভাবেও বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘ভয় পাওয়ারও সময় পাইনি’
কুমামোতো শহরের একটি কেকের দোকানের কর্মী, যার পরিচয় নিরাপত্তার কারণে গোপন রাখা হয়েছে, জানান, ভূমিকম্পের সময় তিনি অফিসকক্ষে ছিলেন।
তিনি বলেন, বিস্ফোরণের শব্দ আর ভূমিকম্পের শব্দ আলাদা করে বোঝা যাচ্ছিল না। একের পর এক প্রবল ঝাঁকুনির মধ্যে তিনি শুধু নিজের চেয়ারটি শক্ত করে ধরে বসে ছিলেন।
তার ভাষায়, সেই মুহূর্তে ভয় পাওয়ারও সুযোগ ছিল না। ঘটনার পরও তিনি ঠিক কী অনুভব করছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছেন না।

আফটারশকে নতুন আতঙ্ক
স্থানীয় বাসিন্দা মিখাল পোসান জানান, দোকানগুলোতে খাবার ও পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ভূমিকম্পে তাঁর টেলিভিশন শরীরের ওপর পড়ে যায়, আয়না ভেঙে যায় এবং আশপাশের সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টানা আফটারশকের কারণে তিনি জরুরি সরিয়ে নেওয়ার ব্যাগ প্রস্তুত করে রেখেছেন।
আরও এক বাসিন্দা বলেন, ২০১৬ সালের মতো এবারও বড় ভূমিকম্পের পর আরেকটি শক্তিশালী কম্পন হতে পারে—এমন আশঙ্কায় সবাই সতর্ক রয়েছেন।
জাপান আবহাওয়া সংস্থার কর্মকর্তা শিনজি কিয়োমোতোও জনগণকে অতিরিক্ত ভূমিকম্পের সম্ভাবনা মাথায় রেখে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কঠিন লড়াই
আতঙ্কের মধ্যেও স্থানীয়রা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন। রেস্তোরাঁ মালিক হিরোকো ওগাতা জানান, জীবিকা চালাতে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবসা আবার চালু করতে হবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরপর আফটারশক হওয়ায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও বারবার থেমে যাচ্ছে।
অন্যদিকে কেকের দোকানটি এখনও বন্ধ রয়েছে। মালিকপক্ষ প্রথমে ওভেনসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি সচল আছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখবেন। এরপরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কবে থেকে আবার ব্যবসা শুরু করা সম্ভব হবে।
জাপানের ভূমিকম্পপ্রবণ এই অঞ্চলে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেই এখন মানুষের প্রধান লক্ষ্য নিরাপদে থাকা এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

























