প্রতি বছর বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস এলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, জন্মনিয়ন্ত্রণ কিংবা পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জনসংখ্যা কেবল একটি সংখ্যাগত বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সুশাসনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনাকে আলাদা কোনো প্রশাসনিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, মানব উন্নয়নের একটি কেন্দ্রীয় নীতিগত প্রশ্ন হিসেবে দেখতে হবে।
পাকিস্তান সম্প্রতি জনসংখ্যা ও মানব উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় জনসংখ্যা কাউন্সিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও এবার প্রথমবারের মতো বিষয়টি সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে কেবল নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করলেই সাফল্য আসবে না। প্রকৃত পরিবর্তন নির্ভর করবে রাষ্ট্র তার উন্নয়ন দর্শন কতটা বদলাতে পারে তার ওপর।
বিশ্বের বহু দেশের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় কোনো জবরদস্তিমূলক নীতি নয়। বরং শিক্ষা, বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষা, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সহজলভ্য ও মানসম্মত পরিবার পরিকল্পনা সেবার বিস্তারই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে সফল পথ। দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, নেপাল, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া বহু বছর আগে এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে ধারাবাহিকভাবে মানব উন্নয়নে বিনিয়োগ করেছে। এর ফল হিসেবে তারা জন্মহার কমাতে সক্ষম হয়েছে এবং একই সঙ্গে মাথাপিছু আয় ও সামাজিক সূচকেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান এখনও এমন কয়েকটি দেশের কাতারে রয়েছে, যেখানে মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। মানব উন্নয়ন সূচকে দেশের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। এই অবস্থা কেবল দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফল নয়; বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নারীর উন্নয়নে দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত বিনিয়োগও এর অন্যতম কারণ। আবার এই দুর্বল মানব উন্নয়নই উচ্চ জন্মহারকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। ফলে দুই সংকট একে অপরকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাধারণ মানুষ পরিবর্তনের বিরুদ্ধে নয়। অধিকাংশ পরিবারই তাদের সন্তানদের জন্য উন্নত শিক্ষা, ভালো স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ চায়। কিন্তু রাষ্ট্র তাদের সেই সুযোগ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক নারী ও পুরুষ তাদের কাঙ্ক্ষিত পরিবার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, তথ্য বা সহায়তা পান না। একইভাবে অসংখ্য পরিবার সন্তানের শিক্ষার গুরুত্ব বুঝলেও বিদ্যালয়, অর্থনৈতিক সামর্থ্য কিংবা অন্যান্য সুযোগের অভাবে তাদের সেই ইচ্ছা পূরণ হয় না।
গবেষণাগুলো দেখায়, পাকিস্তানে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক গর্ভধারণ পরিকল্পনাহীনভাবে ঘটে। এর একটি অংশ গর্ভপাতে শেষ হয়, আর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু এমন পরিবারে জন্ম নেয়, যেখানে তাদের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। একই সময়ে লাখো শিশু এখনও বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে, যদিও প্রাথমিক শিক্ষা তাদের সাংবিধানিক অধিকার। এসব পরিসংখ্যান কেবল জনসংখ্যার নয়; এগুলো রাষ্ট্রের সেবা প্রদানের সীমাবদ্ধতারও প্রতিচ্ছবি।
সুতরাং জনসংখ্যা নীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর অধিকার ও সুযোগের ঘাটতি দূর করা। সরকারি বিনিয়োগ এমনভাবে পরিচালিত হতে হবে, যাতে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারগুলো স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের সমান সুযোগ পায়। বিশেষ করে নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং প্রজননস্বাস্থ্য সেবার নিশ্চয়তা জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে ও সহজলভ্য করা জরুরি। পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, তাদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং মেয়েদের শিক্ষায় বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো পদক্ষেপ জনসংখ্যা নীতিকে বাস্তবভিত্তিক করে তুলতে পারে।

তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। পাকিস্তানের প্রতিটি প্রদেশের সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন হলেও সামগ্রিক লক্ষ্য এক হওয়া উচিত—মানব উন্নয়নে দ্রুত অগ্রগতি। এজন্য প্রদেশগুলোকে তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা গ্রহণের স্বাধীনতা দিতে হবে, তবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে একটি কর্মদক্ষতাভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থাও কার্যকর হতে পারে। যদি এমন একটি জনসংখ্যা স্থিতিশীলতা তহবিল গঠন করা যায়, যা শিশু মৃত্যুহার কমানো, পরিকল্পনাহীন গর্ভধারণ হ্রাস এবং বিশেষ করে কন্যাশিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তি বৃদ্ধির মতো সূচকে ভালো ফল করা প্রদেশগুলোকে অতিরিক্ত সহায়তা দেয়, তাহলে প্রতিযোগিতামূলক ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও অপরিহার্য। বিচার বিভাগ নারীর সম্পত্তির অধিকার, পারিবারিক আইন এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারে। বেসরকারি খাত কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। আর গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেলে নারীর ক্ষমতায়ন, পরিবার পরিকল্পনা এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
সবশেষে, জনসংখ্যা প্রশ্নকে কেবল জন্মহার কমানোর লক্ষ্য হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি মূলত মানুষের সম্ভাবনা উন্মোচনের প্রশ্ন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন এবং কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের সুফল পেতে পারে না। আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে পাকিস্তান ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক উন্নয়নের পথে এগোবে, নাকি দীর্ঘদিনের অবহেলার মূল্য আরও বেশি করে দিতে থাকবে।
জেবা সাথার 


















