বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, চীন কি কোনোভাবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিপ উৎপাদন যন্ত্রের নাগাল পেয়েছে? এই অভিযোগ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও তীব্র হয়েছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নেদারল্যান্ডসের একটি প্রতিষ্ঠান, যারা বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক লিথোগ্রাফি যন্ত্র তৈরি করে। এই যন্ত্র ব্যবহার করেই সর্বাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সক্ষম চিপ উৎপাদন সম্ভব।
অভিযোগ ও পাল্টা অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এমন একটি উন্নত যন্ত্র কোনোভাবে চীনে পৌঁছে থাকতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দৃঢ়ভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, উৎপাদিত প্রতিটি যন্ত্রের অবস্থান তাদের জানা রয়েছে এবং একটিও চীনে পাঠানো হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির আরও বক্তব্য, এই যন্ত্র অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় পরিবহন, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিটি ধাপ তাদের নিজস্ব প্রকৌশলীদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তাই গোপনে পুরো যন্ত্র সরিয়ে নেওয়া কার্যত অসম্ভব।
এদিকে নেদারল্যান্ডস সরকারও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখলেও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেনি। তাদের অবস্থান, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিতর্কের আসল কারণ কোথায়
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, পুরো যন্ত্র চীনে পৌঁছেছে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম। তবে যন্ত্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বা সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়ে থাকতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করছেন।
আরেকটি বড় আলোচনার বিষয় হলো পুরোনো প্রজন্মের লিথোগ্রাফি যন্ত্র। এসব যন্ত্রের অনেক অংশ এখনো রপ্তানির আওতায় থাকায় চীনের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। গত বছর তাদের আয়ের বড় একটি অংশ এসেছে চীনা বাজার থেকেই।

নিজস্ব প্রযুক্তিতে এগোচ্ছে চীন
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, চীন নিজস্ব উন্নত চিপ তৈরির যন্ত্র তৈরির কাজেও দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। একটি পরীক্ষামূলক সংস্করণ ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে এবং সেটির ওপর পরীক্ষা চলছে বলে জানা গেছে।
যদিও অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের ধারণা, কার্যকরভাবে এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিক পর্যায়ে পৌঁছাতে চীনের আরও কয়েক বছর, এমনকি এক দশকও লেগে যেতে পারে। তবুও তারা স্বীকার করছেন, চীনের অগ্রগতি আগের ধারণার তুলনায় অনেক দ্রুত।
পুরোনো প্রযুক্তি দিয়েই নতুন সাফল্য
চীনের কয়েকটি শীর্ষ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পুরোনো প্রযুক্তিকে নতুন কৌশলে ব্যবহার করে অত্যন্ত উন্নত মানের প্রসেসর তৈরির সক্ষমতা দেখিয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় ও ত্রুটি কিছুটা বাড়লেও আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় চিপ উৎপাদনের পথ খুলছে।
এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, শুধু নতুন যন্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেই হবে না, পুরোনো প্রযুক্তির ব্যবহারও সীমিত করতে হবে।
নতুন জোট ও কঠোর আইন
প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খল আরও সুরক্ষিত করতে সমমনা দেশগুলোকে নিয়ে নতুন একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য উন্নত প্রযুক্তি, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে অভিন্ন নীতি তৈরি করা।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি নতুন আইনের প্রস্তাব এসেছে, যা শুধু নতুন যন্ত্র বিক্রি নয়, বরং চীনে থাকা পুরোনো যন্ত্রের যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবাও সীমিত করার কথা বলছে। এতে মিত্র দেশগুলোকেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একই ধরনের নিয়ম অনুসরণ করতে চাপ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
ইউরোপের উদ্বেগ
নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ মনে করছে, নিরাপত্তার পাশাপাশি নিজেদের শিল্প ও ব্যবসায়িক স্বার্থও বিবেচনায় রাখতে হবে। তাদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা শুধু প্রযুক্তি শিল্পকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, বরং চীনের পাল্টা পদক্ষেপেও ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
সম্প্রতি একটি চিপ কোম্পানিকে ঘিরে নেওয়া সিদ্ধান্তের পর চীনের পাল্টা পদক্ষেপে ইউরোপ ও জাপানের গাড়ি শিল্পেও প্রভাব পড়েছে। ফলে প্রযুক্তি যুদ্ধ এখন শুধু চিপ শিল্পেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
সামনে আরও কঠিন প্রতিযোগিতা
বর্তমান অভিযোগের পক্ষে যদি কোনো প্রমাণ সামনে না-ও আসে, তবুও উন্নত চিপ প্রযুক্তি নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেমে থাকবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেতৃত্ব ধরে রাখতে বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর মধ্যে যে প্রযুক্তি যুদ্ধ শুরু হয়েছে, আগামী দিনে তা আরও তীব্র হওয়ারই ইঙ্গিত মিলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















