মেক্সিকো আবারও যাত্রীবাহী রেলপথের যুগে ফিরতে চায়। রাজধানী মেক্সিকো সিটি থেকে টোলুকাকে যুক্ত করা নতুন ট্রেনসেবা চালুর পর যাত্রীদের ইতিবাচক সাড়া দেশটির সরকারকে আরও বড় পরিকল্পনার দিকে এগিয়ে নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে তিন হাজার কিলোমিটারেরও বেশি নতুন যাত্রীবাহী রেলপথ নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের আশা, এই প্রকল্প যানজট কমাবে, যাতায়াত সহজ করবে, দূষণ হ্রাস করবে এবং অর্থনীতিতে নতুন গতি আনবে।
নতুন রেলপথে বদলে যাচ্ছে যাতায়াত
মেক্সিকো সিটি ও টোলুকার মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি নয়। কিন্তু সড়কপথে এই পথ পাড়ি দিতে ব্যস্ত সময়ে কয়েক ঘণ্টাও লেগে যায়। নতুন ট্রেনসেবা সেই সময় কমিয়ে প্রায় এক ঘণ্টায় এনেছে। তুলনামূলক কম ভাড়ায় দ্রুত ও আরামদায়ক যাত্রার সুযোগ পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
সরকারের ধারণা, কাছাকাছি বড় শহরগুলোর মধ্যে একই ধরনের রেল যোগাযোগ গড়ে তুললে মানুষ আরও সহজে এক শহরে বসবাস করে অন্য শহরে কাজ করতে পারবেন। এতে নগরায়ণের চাপও কিছুটা কমবে।
পুরোনো রেলব্যবস্থা থেকে নতুন যাত্রা
একসময় মেক্সিকোতে যাত্রীবাহী রেলব্যবস্থা ছিল বেশ সক্রিয়। তবে নব্বইয়ের দশকে অবকাঠামোর অবনতি এবং বেসরকারিকরণের পর গুরুত্ব চলে যায় পণ্যবাহী রেলপথে। বর্তমানে দেশটির রেল নেটওয়ার্ক মূলত শিল্পপণ্য, জ্বালানি, শস্য ও যানবাহন পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। ফলে যাত্রীবাহী ট্রেন কার্যত হারিয়েই গিয়েছিল।
এবার সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চায় সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজধানী থেকে আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর সঙ্গে ধাপে ধাপে আধুনিক রেল যোগাযোগ গড়ে তোলা হবে।
আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
যাত্রীবাহী রেল ফিরিয়ে আনার আগের উদ্যোগ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দীর্ঘ রেলপথ প্রকল্পটি পরিবেশগত ক্ষতি, দুর্বল পরিকল্পনা এবং যাত্রীবান্ধব সংযোগের অভাবে সমালোচিত হয়। অনেক স্টেশন এমন স্থানে নির্মিত হয়, যেখানে পৌঁছানোই ছিল কঠিন।
বর্তমান সরকার বলছে, এবার পরিকল্পনায় বাস্তব প্রয়োজন, জনসংখ্যা এবং নগরসংযোগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যমান পণ্যবাহী রেলপথের পাশে নতুন যাত্রীবাহী লাইন নির্মাণের মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণের জটিলতাও কমানো হবে।

অর্থায়ন বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, যাত্রীবাহী রেলপথ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল। নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে ভাড়া রাখতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রয়োজন হয়।
মেক্সিকোর ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন উঠেছে। সীমিত সরকারি অর্থের মধ্যে সব প্রস্তাবিত রেলপথ বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অনেকের মতে, কিছু রুট অর্থনৈতিকভাবে খুবই যৌক্তিক হলেও সব প্রকল্প একইভাবে লাভজনক হবে না। তাই অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেই বিনিয়োগ করা জরুরি।
বেসরকারি খাতের ভূমিকা ও নিরাপত্তার গুরুত্ব
সরকার অবকাঠামো নির্মাণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়াতে চায়। স্টেশন, সেতু, বিদ্যুৎব্যবস্থা এবং সংকেত প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন কাজের জন্য বড় বড় দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পে সরকারি নেতৃত্ব ও বেসরকারি অংশগ্রহণের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
একই সঙ্গে দ্রুত কাজ শেষ করার চাপ যেন নিরাপত্তাকে দুর্বল না করে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। অতীতে একটি বড় রেলপথে দুর্ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনা দেখিয়েছে, অবকাঠামোর গুণগত মান নিশ্চিত না করলে বড় বিনিয়োগও কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারে না।
সব মিলিয়ে মেক্সিকোর নতুন রেল পরিকল্পনা দেশটির পরিবহন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে হলে অর্থায়ন, পরিকল্পনা, নিরাপত্তা এবং সুশাসনের পরীক্ষায় সফল হতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















