রাশিয়ার অন্যতম শীর্ষ শিল্পপতি আন্দ্রেই মেলনিচেঙ্কো মনে করেন, ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং বদলে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থা রাশিয়াকে এমন এক মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে শুধু অর্থনৈতিক শক্তি নয়, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র থেকে বিশ্বের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠীর নির্মাতা হয়ে ওঠা এই ব্যবসায়ী এখন দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রকাশ্যে মত দিচ্ছেন। সারাক্ষণ রিপোর্ট।
উচ্চপর্যায়ের বৈঠক থেকে নতুন বার্তা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে ক্রেমলিনে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একান্ত বৈঠকে মেলনিচেঙ্কো নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, অতীতে তার লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি সফল শিল্পগোষ্ঠী গড়ে তোলা। কিন্তু যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার পর তিনি উপলব্ধি করেন, বিশ্ব আর আগের মতো নেই। এখন দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি মনে করেন, রাশিয়ার ধনী ও প্রভাবশালী শ্রেণির অন্যতম বড় ভুল ছিল দেশের ভাগ্য থেকে নিজেদের দূরে রাখা। বর্তমান বাস্তবতা তাদের সেই ধারণা বদলে দিয়েছে।
যুদ্ধ বদলে দিয়েছে অর্থনীতি ও রাজনীতি
মেলনিচেঙ্কোর মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘাত নয়, এটি রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে। তার আশঙ্কা, পরিস্থিতি আরও জটিল হলে সংঘাত অন্য অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকিও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করা এখন সময়ের দাবি।
বিশ্বায়নের স্বপ্ন থেকে নতুন বাস্তবতা
একসময় মেলনিচেঙ্কো ইউরোপে বসবাস করতেন এবং তার শিল্পগোষ্ঠীকে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছিলেন। কিন্তু ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর তার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আসে। এরপর ধীরে ধীরে তিনি উপলব্ধি করেন, আন্তর্জাতিক ব্যবসার যে কাঠামোর ওপর তিনি আস্থা রেখেছিলেন, সেটিই ভেঙে পড়ছে।
তার ভাষায়, এক দেশে ব্যবসা আর অন্য দেশে নিরাপদ জীবন—এই ধারণা এখন আর বাস্তবসম্মত নয়।

রাশিয়ার সামনে কোন পথ?
মেলনিচেঙ্কো মনে করেন, রাশিয়ার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু যুদ্ধ নয়, বরং রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও সমাজকে আরও কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করা। তার মতে, মানুষ স্বাধীনতার চেয়ে বিশৃঙ্খলাকে বেশি ভয় পায়। তাই স্থিতিশীলতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি হতে পারে।
তিনি সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের কথা বলেন না। বরং নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চান বলে জানান।
পদার্থবিজ্ঞান থেকে শিল্পসাম্রাজ্য
বেলারুশে জন্ম নেওয়া মেলনিচেঙ্কো মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান পড়েন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় ব্যবসায় নামেন এবং ধীরে ধীরে ব্যাংকিং, কয়লা, সার, জ্বালানি ও পরিবহন খাতে বিশাল শিল্পগোষ্ঠী গড়ে তোলেন। বর্তমানে তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম রাশিয়ার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এতদিন প্রকাশ্যে রাজনীতি এড়িয়ে চলা এই শিল্পপতির সাম্প্রতিক অবস্থান রাশিয়ার অভিজাত ব্যবসায়ী মহলের পরিবর্তিত মানসিকতারও ইঙ্গিত বহন করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















