আজকের বিশ্ব এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে পুরোনো ধারণা দিয়ে নতুন সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ভূরাজনীতি এবং প্রযুক্তি একসঙ্গে রাষ্ট্রগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। ফলে কোনো প্রধানমন্ত্রী কেবল নিজের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর বিচারিত হবেন না; বরং তিনি কতটা সফলভাবে এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে দেশকে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন, সেটিই হবে তার প্রকৃত মূল্যায়নের মানদণ্ড।
ক্ষমতায় আসার আগে একজন রাজনীতিক নানা পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে পারেন। কিন্তু সরকার পরিচালনার প্রথম দিনই তিনি এমন সব তথ্য, ঝুঁকি এবং দায়িত্বের মুখোমুখি হন, যা বাইরে থেকে পুরোপুরি বোঝা যায় না। জাতীয় নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য, আন্তর্জাতিক জোট এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত—এসবের গভীরতা কেবল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব গ্রহণের পরই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক বিশ্ব পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা দেখিয়েছে, আধুনিক সংঘাতের চরিত্র কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অল্প ব্যয়ে ব্যবহৃত প্রযুক্তি এখন বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। সামরিক শক্তির প্রচলিত ধারণা নতুন বাস্তবতার মুখে প্রশ্নের সম্মুখীন। এর অর্থ হলো, নিরাপত্তা সংকট এখন আর সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়; তা সরাসরি জ্বালানি বাজার, মূল্যস্ফীতি, সরকারি ব্যয় এবং নাগরিকদের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে।
এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করতে হয়। অনেকেই মনে করতে পারেন, ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমানো সহজ কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বাস্তবে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামো, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং সামরিক সমন্বয়ের গভীরতা এমন যে আকস্মিক দূরত্ব সৃষ্টি করা বাস্তবসম্মত নয়। একই সঙ্গে এটিও সত্য, দীর্ঘমেয়াদে একক অংশীদারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কোনো দেশের জন্য স্বাস্থ্যকর কৌশল হতে পারে না। ফলে সম্পর্ক বজায় রেখেও নিজের সক্ষমতা বাড়ানোই সবচেয়ে বিচক্ষণ পথ।
অন্যদিকে চীন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে বিনিয়োগ ও অবকাঠামোকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে থাকা দেশগুলোর জন্য এই প্রস্তাব আকর্ষণীয় হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু তাৎক্ষণিক আর্থিক সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা প্রতিটি সরকারের জন্য অপরিহার্য। কোনো রাষ্ট্র যদি অর্থনৈতিক নির্ভরতার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়, তাহলে সেই নির্ভরতা ভবিষ্যতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর সংকুচিত করতে পারে।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আরেকটি পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এমন অনেক দেশ রয়েছে যারা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও কোনো নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক ব্লকের সঙ্গে নিজেদের পুরোপুরি যুক্ত করতে চায় না। এই নতুন বাস্তবতায় কূটনীতি আরও বাস্তববাদী হওয়া প্রয়োজন। প্রত্যেক বিষয়ে একমত হওয়ার অপেক্ষায় থাকলে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। ভারত, উপসাগরীয় দেশসহ বহু উদীয়মান শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক তাই আদর্শিক মিলের নয়, বরং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে।
ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও এখনও অনিশ্চিত। ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ কেবল ট্যাংক কিংবা যুদ্ধবিমান দিয়ে নির্ধারিত হবে না। ড্রোন, সাইবার সক্ষমতা, তথ্যযুদ্ধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন এখন সংঘাতের ফলাফল বদলে দিতে পারে। ইউরোপকে তাই শুধু প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ালেই চলবে না; যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা থেকেও শিক্ষা নিতে হবে।
এসব পরিবর্তনের অর্থ একটাই—যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কয়েক দশক ধরে তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল, তা আর আগের অবস্থায় নেই। বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই এখন শক্তির রাজনীতি আরও স্পষ্ট। ফলে প্রতিরক্ষা খাতে বড় বিনিয়োগ এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। কিন্তু সেই অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটিই সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক প্রশ্ন। কর বাড়ালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, আবার সীমাহীন ঋণও টেকসই সমাধান নয়। তাই সরকারের জন্য কঠিন অগ্রাধিকার নির্ধারণ অনিবার্য হয়ে উঠবে।
তবে এই পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। শিল্পবিপ্লব যেমন অর্থনীতি ও সমাজকে আমূল বদলে দিয়েছিল, তেমনি AI আরও দ্রুত গতিতে রাষ্ট্র, ব্যবসা এবং জনসেবার কাঠামো পুনর্গঠন করতে পারে। যেসব দেশ দ্রুত এই পরিবর্তন গ্রহণ করবে, তারাই আগামী দশকের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে।
বিশেষ করে জনসেবা খাতে AI ব্যবহারের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বয়স্ক জনগোষ্ঠী বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় এবং প্রশাসনিক চাপ—এসব মোকাবিলায় প্রযুক্তি ব্যবহার না করলে ভবিষ্যতের আর্থিক বোঝা সামাল দেওয়া কঠিন হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের কাছে রাষ্ট্রের কার্যকারিতা প্রমাণ করারও এটি একটি বড় সুযোগ।
কিন্তু প্রযুক্তির সম্ভাবনার পাশাপাশি একটি বড় ঝুঁকিও রয়েছে। যদি কর্মজীবী মানুষ নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ না পান, তাহলে AI চাকরির অনিশ্চয়তা তৈরি করবে। সেই উদ্বেগ থেকে প্রযুক্তিবিরোধী জনমত, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ হ্রাসের একটি নেতিবাচক চক্র সৃষ্টি হতে পারে। ফলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সমান্তরালভাবে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতের কর্মশক্তির বড় অংশ ইতোমধ্যেই শ্রমবাজারে রয়েছে; তাই কেবল শিক্ষাক্রম পরিবর্তন নয়, কর্মরত মানুষদের পুনঃপ্রশিক্ষণও জরুরি।
অবশেষে একজন প্রধানমন্ত্রী হয়তো নিজস্ব রাজনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়ে ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু খুব দ্রুতই তিনি উপলব্ধি করেন, বিশ্বের পরিবর্তিত বাস্তবতা তার কর্মসূচিকে নতুনভাবে সাজাতে বাধ্য করছে। আজকের যুগে সফল নেতৃত্ব নির্ভর করে কে কত ভালোভাবে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সামলাতে পারে, প্রযুক্তিগত রূপান্তরকে কাজে লাগাতে পারে এবং একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সক্ষমতা শক্তিশালী করতে পারে তার ওপর। ভবিষ্যতের ইতিহাস সেই নেতাদেরই মনে রাখবে, যারা পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে তাকে নিজেদের শক্তিতে পরিণত করতে পেরেছেন।
ঋষি সুনাক 


















