বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কিশোর অপরাধ বেড়ে যাওয়ার উদ্বেগের মধ্যে শিশুদের ফৌজদারি দায়বদ্ধতার ন্যূনতম বয়স কমানোর উদ্যোগ জোরালো হচ্ছে। সরকারের যুক্তি, কঠোর আইন অপরাধ দমন এবং সংগঠিত অপরাধচক্রে শিশুদের ব্যবহার কমাতে সাহায্য করবে। তবে বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ সতর্ক করে বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত উল্টো শিশুদের আরও গভীর অপরাধচক্রে ঠেলে দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ কমানোর বদলে বাড়িয়ে দিতে পারে।
বাড়ছে আইন কঠোর করার প্রবণতা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুইডেন, আর্জেন্টিনা, মালদ্বীপ, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে শিশুদের ফৌজদারি দায়বদ্ধতার বয়স কমানোর প্রস্তাব বা সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। কোথাও আবার শিশুদের জন্য শাস্তির মাত্রাও বাড়ানো হয়েছে।
সুইডেনে বর্তমানে ফৌজদারি দায়বদ্ধতার বয়স ১৫ বছর। তবে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে সেটি ১৪ বছরে নামিয়ে আনার আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে ১৫ বছর বয়সী দণ্ডপ্রাপ্তদেরও কারাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। আর্জেন্টিনাও সম্প্রতি দায়বদ্ধতার বয়স ১৬ থেকে ১৪ বছরে নামিয়েছে।
গ্যাং অপরাধে শিশুদের ব্যবহার বাড়ছে
বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বলছে, সংগঠিত অপরাধচক্র এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করছে। কারণ কম বয়সী হওয়ায় তারা অনেক ক্ষেত্রে কঠোর আইনি শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে।
সুইডেনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্দুক হামলা ও বিস্ফোরণের একাধিক ঘটনায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের সম্পৃক্ততা দেখা গেছে। একই ধরনের প্রবণতা লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশেও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। অপরাধচক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অল্প বয়সী কিশোরদের টাকার লোভ দেখিয়ে অপরাধে জড়িয়ে ফেলছে।
জনমতের চাপেই বদলাচ্ছে আইন
উচ্চপ্রচার পাওয়া কয়েকটি নৃশংস অপরাধের পর অনেক দেশে জনমতের চাপ বেড়েছে। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্বও কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করেছে।
আর্জেন্টিনায় এক হত্যাকাণ্ডে ১৫ বছরের এক কিশোরের সম্পৃক্ততার অভিযোগের পর জনমতের বড় অংশ দায়বদ্ধতার বয়স কমানোর পক্ষে অবস্থান নেয়। ফিলিপাইনেও সাম্প্রতিক এক স্কুলে গুলির ঘটনায় কিশোরদের জড়িত থাকার অভিযোগ নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ কোথায়?
শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কম বয়সী শিশুদের মানসিক বিকাশ এখনো পূর্ণতা পায় না। তারা ঝুঁকি সম্পর্কে পরিণত মানুষের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এ কারণে আন্তর্জাতিকভাবে অন্তত ১৪ বছর বয়সকে ন্যূনতম ফৌজদারি দায়বদ্ধতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনার সুপারিশ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের দ্রুত কারাগারে পাঠানো সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। বরং অল্প বয়সে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হলে তারা সমাজে ফিরে এসে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।

অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা
ডেনমার্ক একসময় ফৌজদারি দায়বদ্ধতার বয়স ১৫ থেকে ১৪ বছরে নামিয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, কম বয়সে অপরাধী হিসেবে বিচার হওয়া শিশুদের মধ্যে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার হার বেড়ে যায়। পরে দেশটি আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসেও অল্প বয়সে কারাভোগ করা শিশুদের একটি বড় অংশ মুক্তির এক বছরের মধ্যেই আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
কঠোর আইনই কি সমাধান?
বিশ্লেষকদের মতে, কেবল শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে শিশু অপরাধ কমানো সম্ভব নয়। অপরাধচক্র নতুন নতুন কৌশলে আরও কম বয়সী শিশুদের টার্গেট করতে পারে। ফলে শুধু আইন কঠোর করার পরিবর্তে শিক্ষা, পরিবার, সামাজিক সুরক্ষা এবং অপরাধচক্রের নিয়োগ নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপকে বেশি কার্যকর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, শিশুদের অপরাধী নয়, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে পুনর্বাসন, মানসিক সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করাই ভবিষ্যতে অপরাধ কমানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে শিশুদের ফৌজদারি দায়বদ্ধতার বয়স কমানোর প্রবণতা নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। একদিকে জননিরাপত্তার দাবি, অন্যদিকে শিশু অধিকার ও পুনর্বাসনের প্রশ্ন—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই এখন নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
শিশু অপরাধ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশে ফৌজদারি দায়বদ্ধতার বয়স কমানোর উদ্যোগ নিয়ে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে।
Sarakhon Report 


















