বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার চার মাস পর, দুই সপ্তাহ আগে তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে যান। সফরের প্রথম গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া, এরপর তিনি চীন সফর করেন। তবে এখনো তিনি ভারত সফর করেননি। তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে নয়াদিল্লির প্রতিক্রিয়া ছিল দ্রুত, তীক্ষ্ণ, কিন্তু অনেকটাই পুরোনো ধাঁচের—যেখানে কৌশলগত বিশ্লেষণের আড়ালে মূলত অভিযোগের পুনরাবৃত্তিই দেখা গেছে। অনেকেই বলেছেন, নতুন বাংলাদেশি নেতাদের প্রচলিত প্রথম গন্তব্য ভারত হলেও তিনি সেটি এড়িয়ে গেছেন, যা ভারতের পূর্ব সীমান্তের দুর্বলতার ইঙ্গিত। আবারও নাকি বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছে আরেক প্রতিবেশী। এসব আলোচনা এক ধরনের পুরোনো অভিজ্ঞতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। মালদ্বীপ ও নেপালের ক্ষেত্রেও আমরা একই দৃশ্য দেখেছি, এবং ভবিষ্যতেও সম্ভবত আবার দেখব।
তাহলে প্রশ্ন হলো, প্রতিবেশী দেশের নতুন নির্বাচিত নেতারা প্রথম বিদেশ সফরে কোথায় যান, সেটি কি সত্যিই এত গুরুত্বপূর্ণ? বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ভারতে পর্যটক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে, তখন তাদের সফরের গন্তব্য নিয়ে এত উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন আছে কি? (অবশ্য তারা কেন ভারতে কম আসছেন, সেটি ভিন্ন আলোচনার বিষয়।)

স্পষ্ট করে বললে, কোনো প্রতিবেশী দেশের নেতা প্রথমে কোথায় সফরে গেলেন, তা দুই দেশের সম্পর্কের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে খুব সামান্যই ধারণা দেয়। তাই সফরের সূচিকেই পররাষ্ট্রনীতির ফলাফল হিসেবে দেখা বন্ধ করা উচিত। কারণ আমরা যদি সেটিকেই ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করতে থাকি, তাহলে অন্তত আমাদের মানসিকতায় সেটিই বাস্তবতায় পরিণত হবে।
বরং আমাদের বিশ্লেষণ করা উচিত, প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজধানীতে এমন সিদ্ধান্তের পেছনে আসলে কী কাজ করে। অর্থনৈতিক সংকটে থাকা একটি দেশের সদ্য দায়িত্ব নেওয়া প্রধানমন্ত্রী স্বাভাবিকভাবেই সেখানে যাবেন, যেখানে তিনি অর্থনৈতিক সহায়তার সম্ভাবনা দেখেন। তারেক রহমানের প্রথম গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া—চীন নয়—কারণ তিনি বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজছিলেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশি শ্রমিকদের গ্রহণ করার ব্যাপারে ভারত নিজেই খুব উৎসাহী নয়। এরপর তিনি বেইজিংয়ে যান, যেখানে বিনিয়োগ ফোরামে অংশ নেন, চীনা ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা চেয়েছেন বলে জানা যায়।
নিরপেক্ষভাবে দেখলে বোঝা যায়, এই সফরের মূল প্রেরণা কৌশলগতের চেয়ে অর্থনৈতিক ছিল। তারেক রহমানের অবস্থানে থাকা যে কোনো নেতা স্বাভাবিকভাবেই সেই পক্ষের দিকে ঝুঁকবেন, যারা অর্থায়ন করতে সক্ষম। ভারত অতিরিক্ত বাংলাদেশি শ্রমিক নেবে না, আবার চীনের মতো বড় অঙ্কের অর্থ সহায়তাও দেবে না। তাহলে এতে অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ কী?
এর সঙ্গে শেখ হাসিনার বিষয়টিও যোগ করা উচিত। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর হলে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রশ্ন আবারও সামনে আসবে। বাস্তবে, এমন প্রশ্ন যত কম ওঠে, ভারতের জন্য ততই সুবিধাজনক।
নির্বাচনের পর প্রতিবেশী দেশগুলোর নেতাদের প্রথম সফরের রেকর্ডও একরকম নয়। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে বেইজিং যাওয়ার আগে নয়াদিল্লি সফর করেছিলেন। আবার কেউ কেউ প্রথমে ভারত বা চীন—কোনোটিতেই যান না; যেমন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু তৃতীয় কোনো দেশকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তাই সফরের সূচিকে প্রতিবেশীরা ভারতকে কতটা গুরুত্ব দেয় তার অকাট্য প্রমাণ হিসেবে দেখা বাড়াবাড়ি। এতে কেবল আমাদের কৌশলগত মহলের উদ্বেগই বাড়ে।
এটি বহুমুখী কূটনৈতিক ভারসাম্যের যুগ। ভারত নিজেও সেটিই অনুসরণ করে এবং তা নিয়ে গর্বও করে। পশ্চিমা চাপ উপেক্ষা করে আমরা রাশিয়ার তেল কিনি, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করি, আবার একই সঙ্গে তাকে ভারসাম্যে রাখার চেষ্টা করি। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করি, আবার মস্কোকেও কাছে রাখি—কারণ অস্থির বিশ্বে আমরা নিজেদের বিকল্প বাড়াতে চাই। কিন্তু বাংলাদেশ বা নেপাল যখন ভারত ও চীনের মধ্যে একই ধরনের ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করে, তখন অনেকেই সেটিকে বিশ্বাসঘাতকতা বলে আখ্যা দেন।
আমাদের প্রতিবেশীরা কি আমাদের সঙ্গে ঠিক সেই আচরণই করছে না, যেটি আমরা বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে করি? তাই বহুমুখী কূটনৈতিক ভারসাম্যকে সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে হবে এবং এর সঙ্গে মানিয়ে চলতে হবে। অবশ্য এটিকে পরিবর্তনের চেষ্টা করা যেতে পারে, কিন্তু তা সম্ভব না হলে অভিযোগ করে লাভ নেই।
আরেকটি বাস্তবতাও স্বীকার করা দরকার, যদিও আমরা সহজে তা মানতে চাই না। চীন এখন আমাদের অধিকাংশ প্রতিবেশী দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি অপরিহার্য অংশীদারে পরিণত হয়েছে। আঞ্চলিক বাণিজ্য, পর্যটকের সংখ্যা, চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থী কিংবা অবকাঠামো ঋণের পরিসংখ্যান দেখলেই তা স্পষ্ট হয়। দিল্লির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যতই ক্ষোভ প্রকাশ করা হোক না কেন, এই বাস্তবতা বদলাবে না। তাই প্রতিবেশীরা চীনের বদলে ভারতকে বেছে নেবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়, কারণ তাদের পক্ষে তা করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব নয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় চীন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল কেন? এর সহজ উত্তর হলো—চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা। বেইজিং আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে বিপুল বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত। তবে এর পেছনে আরও একটি কারণ রয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশে চীন বাইরের একটি শক্তি। এই অঞ্চলের সঙ্গে তার সম্পর্ক ঔপনিবেশিক স্মৃতি, ধর্মীয়, ভাষাগত কিংবা জাতিগত জটিলতার সঙ্গে জড়িত নয়। অন্যদিকে ভারতের ইতিহাস ও ভূরাজনীতি এই অঞ্চলের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত, আর সেই ইতিহাসের সঙ্গে রয়েছে নানা সংবেদনশীলতা। তাই এই অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক হওয়া উচিত আরও ধৈর্যশীল, সংবেদনশীল ও সহমর্মিতাপূর্ণ—তাৎক্ষণিক ফল পাওয়ার তাড়াহুড়ো নয়।
প্রতিবেশীদের সফরসূচি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার পরিবর্তে ভারত আরও অনেক কিছু করতে পারে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি যখন ভেঙে পড়েছিল, তখন নয়াদিল্লি বিলিয়ন ডলারের সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছিল, যেখানে অন্যরা—বিশেষ করে চীন—দ্বিধায় ছিল। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে ভারত স্বাভাবিকভাবেই এই অঞ্চলের প্রথম সাড়া-দাতা। কে কোথায় প্রথম সফর করল, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এই অঞ্চলের জটিল প্রয়োজনগুলোর প্রতি ধারাবাহিক মনোযোগ ও সহায়তা। প্রকৃত কৌশলগত ফলাফল সেখান থেকেই আসে। বরং প্রতিবেশীরা প্রথমে কোথায় গেল তা নিয়ে ক্ষুব্ধ হওয়া ভারতের ‘প্রভাবশালী বড় ভাই’ ভাবমূর্তিকেই আরও শক্তিশালী করবে।
হ্যাঁ, তারেক রহমান নয়াদিল্লির আগে বেইজিং গেছেন। কিন্তু সময় হলে তিনি ভারতেও যাবেন। কারণ ভৌগোলিক অবস্থান, অভিন্ন নদী, বাণিজ্য এবং দীর্ঘ সীমান্ত—সব মিলিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা ছাড়া বিকল্প নেই। এর মধ্যে আমরা চাইলে প্রতিবেশীদের সফরসূচি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারি, অথবা প্রকৃত ও গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলের দিকে মনোযোগ দিতে পারি।
হ্যাপিমন জ্যাকব কাউন্সিল ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স রিসার্চ-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক এবং INDIA’S WORLD সাময়িকীর সম্পাদক। ( লেখাটি হিন্দুস্থান টাইমস থেকে বাংলায় অনূদিত)
হ্যাপিমন জ্যাকব 



















