ইউরোপের দুই গুরুত্বপূর্ণ মিত্র পোল্যান্ড ও ইউক্রেনের সম্পর্ক আবারও কঠিন পরীক্ষার মুখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ভলিনিয়া হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি ঘিরে শুরু হওয়া নতুন বিরোধ এখন শুধু কূটনৈতিক অস্বস্তিতেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের পথ, সামরিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একসময় যে দিনটি দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সংলাপের প্রতীক ছিল, এবার সেই দিনই পরিণত হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রে।
ইতিহাসের ভিন্ন ব্যাখ্যা
১১ জুলাই পোল্যান্ডে ভলিনিয়া হত্যাকাণ্ড স্মরণ করা হয়। ১৯৪৩ সালে বর্তমান পশ্চিম ইউক্রেন অঞ্চলে ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীদের হাতে প্রায় এক লাখ পোলিশ বেসামরিক নাগরিক নিহত হন বলে পোল্যান্ডের দাবি। পোল্যান্ড এই ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে বিবেচনা করে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের কাছে সেই সময়ের ইউক্রেনীয় বিদ্রোহী বাহিনী সোভিয়েত শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। ফলে একই ঐতিহাসিক ঘটনাকে দুই দেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে, যা দীর্ঘদিন ধরেই সম্পর্কের একটি স্পর্শকাতর বিষয়।
নতুন বিতর্কের সূচনা
গত মে মাসের শেষ দিকে ইউক্রেনের একটি বিশেষ বাহিনীর নাম ইউক্রেনীয় বিদ্রোহী বাহিনীর নামে পরিবর্তন করা হলে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। পোল্যান্ডে এটিকে উসকানিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়।
এরপর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ শুরু হয়। রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রত্যাহার, সম্মাননা ফেরত পাঠানো এবং ইতিহাস নিয়ে কড়া রাজনৈতিক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
ইউক্রেনের পক্ষ থেকেও জানানো হয়, নিজেদের জাতীয় বীর নির্ধারণের অধিকার অন্য কোনো দেশ ঠিক করে দিতে পারে না।
সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব
এই বিরোধের প্রভাব এখন বাস্তব সহযোগিতায়ও পড়তে শুরু করেছে। ইউক্রেনকে যুদ্ধবিমান দেওয়ার পূর্ববর্তী পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে পোল্যান্ড। পাশাপাশি ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে সদস্যপদ পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তির ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি অংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই বিরোধ আরও গভীর হয়, তাহলে সামরিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ইউরোপীয় সংহতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

যুদ্ধের শুরুতে ছিল ভিন্ন চিত্র
রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর পোল্যান্ড ছিল ইউক্রেনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী। পশ্চিমা অস্ত্রের বড় অংশ পোল্যান্ড হয়ে ইউক্রেনে পৌঁছায় এবং লাখো ইউক্রেনীয় শরণার্থী আশ্রয় পান পোল্যান্ডে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। ইউক্রেনের শুল্কমুক্ত কৃষিপণ্য নিয়ে পোলিশ কৃষকদের অসন্তোষ, আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক চাপ নিয়ে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়। এসব বিষয় রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও উসকে দেয়।
নির্বাচনী রাজনীতির প্রভাব
পর্যবেক্ষকদের মতে, দুই দেশেই অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এই বিরোধকে আরও তীব্র করেছে। পোল্যান্ডে আগামী নির্বাচনের আগে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ইউক্রেনেও জাতীয় পরিচয় ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের সামনে আনার প্রবণতা জোরদার হয়েছে।
ফলে ইতিহাস নিয়ে সমঝোতার পরিবর্তে রাজনৈতিক অবস্থান আরও কঠোর হয়ে উঠছে।
ইউরোপের জন্য বাড়ছে উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পোল্যান্ড ও ইউক্রেনের মধ্যে এই দূরত্ব বাড়তে থাকলে তার লাভ হবে রাশিয়ার। ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হতে পারে, সামরিক সহযোগিতা দুর্বল হতে পারে এবং ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোও নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে।
তাই দুই দেশের জন্যই ইতিহাসের বেদনাদায়ক অধ্যায়কে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অস্ত্র না বানিয়ে সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব বাড়ছে।
ইতিহাসের ক্ষত ঘিরে পোল্যান্ড-ইউক্রেন বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই সংকট ইউরোপের নিরাপত্তা, সামরিক সহযোগিতা ও ইউক্রেনের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















