বাংলাদেশের অধিকাংশ তরুণ-তরুণী এখনও বিয়ে, পরিবার গঠন এবং সন্তান নেওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তবে অনিশ্চিত চাকরি, আয়-রোজগারের অস্থিরতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো পিছিয়ে দিতে বাধ্য করছে। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) নতুন প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
এবারের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন—আজ ও আগামীর জন্য’। ইউএনএফপিএ বলছে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিনের সাফল্যের পর বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তরুণদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিবার গঠনের ইচ্ছা এখনও প্রবল
ইউএনএফপিএর বৈশ্বিক প্রতিবেদন ‘লাইভস, চয়েসেস অ্যান্ড ফিউচারস’-এর জন্য বাংলাদেশসহ ৭৩টি দেশের ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী এক লাখ আট হাজারের বেশি মানুষের ওপর জরিপ চালানো হয়।
জরিপে অংশ নেওয়া ৭৩ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, জীবনে একজন সঙ্গী এবং সন্তান—দুটিই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে ৪৫ শতাংশের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি উত্তরদাতা মনে করেন, বিয়ে তাদের আদর্শ জীবনপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ফলে তরুণ প্রজন্ম পরিবার গঠন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে—এমন ধারণার সঙ্গে জরিপের ফলের মিল পাওয়া যায়নি।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাই বড় বাধা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ তরুণের কাছে আর্থিক নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্থায়ী চাকরি, নিশ্চিত আয় এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন সম্পর্ক, বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে।
অনেক তরুণ জানিয়েছেন, তারা পরিবার গড়তে চান, কিন্তু তার আগে প্রয়োজন স্থায়ী আয়, নিরাপদ কর্মসংস্থান এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ।
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে ইউএনএফপিএর প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং বলেন, তরুণদের পরিবার বা সন্তান নেওয়ার গুরুত্ব আলাদা করে বোঝানোর প্রয়োজন নেই, কারণ তারা নিজেরাই পরিবারকে অত্যন্ত মূল্য দেন।
জনসংখ্যা নীতিতে বদলে যাচ্ছে অগ্রাধিকার
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে জনসংখ্যা নীতির মূল লক্ষ্য একসময় ছিল জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা। এখন সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। বর্তমান বাস্তবতায় জনসংখ্যাগত পরিবর্তনকে টেকসই উন্নয়নের শক্তিতে রূপ দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গত পাঁচ দশকে দেশে জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ১৯৭০-এর দশকে একজন নারীর গড়ে প্রায় সাতটি সন্তান জন্ম হলেও বর্তমানে তা প্রায় ২ দশমিক ৪-এ নেমে এসেছে। একই সময়ে মানুষের গড় আয়ুও বেড়েছে।
এখনও দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কর্মক্ষম বয়সে থাকায় বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা ভোগ করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই সুযোগ স্থায়ী নয়। একই সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও ধীরে ধীরে বাড়ছে, ফলে ভবিষ্যতের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

বার্ধক্য ও সামাজিক সুরক্ষার প্রস্তুতি
ইউএনএফপিএ বলছে, জন্মহার কমে যাওয়া এবং আয়ু বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে প্রবীণ জনগোষ্ঠীনির্ভর সমাজের দিকে এগোচ্ছে। এ বাস্তবতায় স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, প্রবীণদের পরিচর্যা এবং জীবনব্যাপী সহায়তা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
সংস্থাটির মতে, জাতীয় জনসংখ্যা নীতি-২০২৫ এবং জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশল (২০২৫-২০৩০) এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।
যুব কর্মসংস্থানই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকলেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল পাওয়া যায় না। এর জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, দেশে যুব বেকারত্বের হার প্রায় ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। পাশাপাশি অনেক তরুণ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ কিংবা কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত নন। আবার বিপুলসংখ্যক তরুণ অনানুষ্ঠানিক ও অনিরাপদ কাজে নিয়োজিত থাকায় তাদের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
ইউএনএফপিএর মতে, মানসম্মত শিক্ষা, ভবিষ্যৎ উপযোগী দক্ষতা, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে তরুণরা ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী হতে পারবেন।
তরুণীদের সমান সুযোগের ওপর জোর
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তরুণ নারীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত না করলে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না। যদিও মেয়েদের শিক্ষায় অগ্রগতি হয়েছে, তবুও বাল্যবিয়ে, কিশোরী মাতৃত্ব, অবৈতনিক পরিচর্যার দায়িত্ব এবং কর্মসংস্থানে বৈষম্য এখনও বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
ইউএনএফপিএ মনে করে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও লিঙ্গসমতায় আরও বিনিয়োগ, মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্বাধীন ও সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।
আর্থিক অনিশ্চয়তায় বিয়ে-সন্তানের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাচ্ছে, ইউএনএফপিএর নতুন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতার চিত্র উঠে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















