গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি সরকার সংসদে কতটি আসন পেয়েছে, সেটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—সরকার জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারছে কি না। সংসদে আরামদায়ক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও যদি দুর্নীতির অভিযোগ একের পর এক সামনে আসে, নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তা দেখা দেয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় দৃশ্যমান সাফল্য অনুপস্থিত থাকে, তাহলে সেই সরকারের রাজনৈতিক ভিত্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। থাইল্যান্ডের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ভূমজাইথাই পার্টির নেতৃত্বে যে জোট সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন অনেকেই ধারণা করেছিলেন দেশটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল সময়ে প্রবেশ করছে। রক্ষণশীল ক্ষমতাকাঠামোর সমর্থন, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং চার বছরের পূর্ণ মেয়াদের সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে সরকারকে শক্ত অবস্থানে মনে হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সেই প্রত্যাশা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সরকারের সবচেয়ে বড় সংকট এখন সংসদে নয়, জনমনে। প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল দায়িত্ব নেওয়ার আগেই দুটি বড় বিতর্কের মুখোমুখি ছিলেন—সিনেট নির্বাচন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এবং রাষ্ট্রীয় জমি দখল সংক্রান্ত কাও ক্রাডং বিতর্ক। ক্ষমতায় আসার পর এই অভিযোগগুলোর দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য নিষ্পত্তি না হওয়ায় বরং জনমনে সন্দেহ আরও বেড়েছে যে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তদন্ত প্রক্রিয়া ধীর করা হচ্ছে।
একটি নতুন সরকার অতীতের বিতর্ক পেছনে ফেলতে চাইলে সাধারণত নীতিগত সাফল্য দিয়ে নতুন আস্থা তৈরি করার চেষ্টা করে। কিন্তু এখানেই বর্তমান সরকারের দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়েছে। দৃশ্যমান সংস্কার, শক্তিশালী অর্থনৈতিক রূপরেখা কিংবা ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সুস্পষ্ট পরিকল্পনার বদলে সরকারকে বারবার ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে নতুন নতুন বিতর্ক নিয়ে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। জনগণকে স্বস্তি দিতে বিপুল অঙ্কের আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করা হলেও বিরোধীদের অভিযোগ, এর একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যদিও সাংবিধানিক আদালত এটিকে বৈধ বলেছে, তবুও নীতির কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক থামেনি।
এর মধ্যেই আরও একটি আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রকল্প। প্রকল্পটির ব্যয়, দরপত্র প্রক্রিয়া, কারিগরি শর্ত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ততা এই বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে বিষয়টি কেবল একটি প্রকল্পের সীমায় আটকে থাকেনি; এটি স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে জনঅসন্তোষ সবচেয়ে তীব্র হয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। হাজার হাজার পরীক্ষার উত্তরপত্রে হস্তক্ষেপ এবং ঘুষের মাধ্যমে সরকারি চাকরি বাণিজ্যের অভিযোগ সামনে আসার পর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দ্রুত বেড়ে যায়। কারণ স্থানীয় প্রশাসনের এই পদগুলো শুধু চাকরি নয়, দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক স্থিতিশীলতারও প্রতীক। যদি এসব পদ অর্থের বিনিময়ে বণ্টিত হয়, তাহলে পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার দক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়।
এই ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক দায়ও সামনে এসেছে। থাইল্যান্ডের প্রশাসনিক কাঠামোয় এই মন্ত্রণালয় ঐতিহ্যগতভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বিস্তৃত আমলাতান্ত্রিক নেটওয়ার্ক—সবই এর অধীনে পরিচালিত হয়। ফলে এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে সংঘটিত অনিয়মের রাজনৈতিক দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েই গিয়ে পড়ে।
দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি নীতিগত অচলাবস্থাও সরকারের অবস্থানকে দুর্বল করছে। একসময় যে “ল্যান্ড ব্রিজ” প্রকল্পকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, সেটি এখন কার্যত স্থবির। তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে লজিস্টিকস হাব তৈরির পরিকল্পনাও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ সহজ করার উদ্যোগ কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য আলোচনার মতো কিছু ইতিবাচক প্রচেষ্টা থাকলেও সেগুলো এখনো দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কৌশলের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।
অবশ্য থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে সবকিছু নেতিবাচক নয়। ডেটা সেন্টার, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং প্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে। পর্যটন খাতও স্থিতিশীল আয় দিচ্ছে। কিন্তু এসব ইতিবাচক প্রবণতাকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তিতে রূপ দিতে প্রয়োজন স্পষ্ট নেতৃত্ব, ধারাবাহিক নীতি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। সেসব ক্ষেত্রেই সরকারকে অনিশ্চিত মনে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের আলোচনা জোরালো হচ্ছে। দক্ষ প্রশাসক, অর্থনীতিবিদ ও নীতিবিশেষজ্ঞদের দায়িত্বে আনার দাবি বাড়ছে। কিন্তু সেই পরিবর্তন বাস্তবায়ন করাই প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা হতে পারে। কারণ সরকারে আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব থাকলেও জোটের ভেতরে প্রকৃত ক্ষমতার ভারসাম্য অন্য জায়গায় অবস্থান করছে বলে ব্যাপক ধারণা রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় সংস্কারের রাজনৈতিক স্বাধীনতা তাঁর হাতে কতটা আছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
যদি সরকার দুর্নীতির অভিযোগ মোকাবিলায় দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেয় এবং একই সঙ্গে অর্থনীতি ও প্রশাসনে বাস্তব সাফল্য দেখাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে জনগণের হতাশা আরও বাড়বে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও জনসমর্থন কমতে থাকলে সেই ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত রাজপথেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আজকের থাইল্যান্ডের সংকট মূলত সংখ্যার নয়, বৈধতার। সরকার সংসদে টিকে আছে, কিন্তু জনগণের আস্থা ধরে রাখার লড়াইয়ে ক্রমেই কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কোনো সরকারের স্থায়িত্ব নির্ধারণ করে কেবল রাজনৈতিক জোট নয়; নির্ধারণ করে সুশাসন, জবাবদিহি, নীতিগত স্পষ্টতা এবং মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনার সক্ষমতা। সেই পরীক্ষাতেই এখন থাইল্যান্ডের বর্তমান সরকারকে উত্তীর্ণ হতে হবে।
থিতিনান পংসুধিরাক 


















