কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় খনিজ উত্তোলনের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে সামনে এসেছে আদিবাসী অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তের জটিলতা। একদিকে একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী খনি প্রকল্প থেকে কর্মসংস্থান ও আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে, অন্যদিকে সীমান্তের ওপারে থাকা আরেকাধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠী আশঙ্কা করছে, এসব প্রকল্প তাদের নদী, জীবিকা ও সংস্কৃতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
এক খনি, দুই ভিন্ন বাস্তবতা
প্রায় এক দশকেরও বেশি আগে তাহলতান আদিবাসীরা তাদের পূর্বপুরুষদের ভূমিতে একটি তামার খনি নির্মাণ ঠেকাতে আন্দোলন করেছিল। শেষ পর্যন্ত খনি চালু হলেও দীর্ঘ আলোচনার পর তারা উল্লেখযোগ্য সুবিধা আদায় করে। বর্তমানে ওই খনি তাদের জন্য শত শত কর্মসংস্থান তৈরি করেছে এবং রয়্যালটি ও বিভিন্ন অনুদানের মাধ্যমে বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধাও দিচ্ছে।
এখন সেই খনির আরও বড় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা চলছে। প্রকল্পটি ইতোমধ্যে সরকারি অনুমোদন ও তাহলতান জনগোষ্ঠীর সমর্থন পেয়েছে। ফলে অনেকের কাছে এটি আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি সফল উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সীমান্তের ওপারে বাড়ছে উদ্বেগ
তবে একই প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার খনিজসমৃদ্ধ এলাকায় একের পর এক নতুন খনি গড়ে উঠছে। এসব খনির অনেকগুলো এমন নদীর উজানে, যেগুলো পরে আলাস্কার দিকে প্রবাহিত হয়েছে।
আলাস্কার আদিবাসীদের অভিযোগ, এসব প্রকল্প থেকে তারা কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা পায় না, সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তাদের কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু খনির বর্জ্য বা দূষণ হলে তার প্রভাব সরাসরি তাদের নদী, মাছ, বন এবং জীবনযাত্রার ওপর পড়বে।
নদীকেন্দ্রিক জীবন ও সংস্কৃতির শঙ্কা
সীমান্ত অতিক্রম করে প্রবাহিত নদীগুলো শুধু পানির উৎস নয়, বহু আদিবাসী সম্প্রদায়ের খাদ্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নদী থেকে ধরা স্যামন মাছ, আশপাশের বনাঞ্চলে শিকার এবং ঐতিহ্যবাহী মাছের তেল সংগ্রহ—সবকিছুই এই নদীকেন্দ্রিক জীবনধারার সঙ্গে জড়িত।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, খনির দূষণ ছড়িয়ে পড়লে শুধু পরিবেশ নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা জীবনযাত্রাও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।

অতীতের অভিজ্ঞতা বাড়াচ্ছে অবিশ্বাস
খনি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেও সীমান্তবর্তী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সেই আশ্বাস নিয়ে আস্থা নেই। অতীতে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার বিভিন্ন শিল্পপ্রকল্প থেকে নদী ও জলাধার দূষণের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে একটি তামার খনির বর্জ্যাধার ভেঙে বিপুল পরিমাণ খনিবর্জ্য নদী ও হ্রদে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা এখনও তাদের মনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে।
আদালত ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লড়াই
আলাস্কার ত্লিংগিট, হাইডা ও সিমশিয়ান আদিবাসীরা দাবি করছে, তাদের ঐতিহাসিক ভূখণ্ড বর্তমান কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তের দুই পাশেই বিস্তৃত ছিল। তাই উজানের খনি প্রকল্প নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাদের মতামত দেওয়ার অধিকার থাকা উচিত।
এই দাবিতে তারা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যায়ে অভিযোগ দায়েরের পাশাপাশি কানাডার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। তাদের লক্ষ্য, সীমান্তের কারণে যেন ঐতিহাসিক অধিকার ও পরিবেশগত স্বার্থ উপেক্ষিত না হয়।
অবস্থানে অনড় কানাডার অংশের আদিবাসীরা
অন্যদিকে তাহলতান নেতৃত্ব স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা নিজেদের ভূখণ্ডে আলাস্কার আদিবাসীদের কোনো দাবি স্বীকার করে না। প্রাদেশিক সরকারও একই অবস্থান নিয়েছে। সাম্প্রতিক আইনি পরিবর্তনের মাধ্যমে সীমান্তের ওপারের আদিবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে কার্যত বাইরে রাখা হয়েছে।
তবুও আলাস্কার আদিবাসী সংগঠনগুলো তাদের আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের বিশ্বাস, সীমান্ত আলাদা হলেও একই নদী, পরিবেশ ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে এই লড়াই কেবল জমির নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব রক্ষারও প্রশ্ন।
কানাডার খনি সম্প্রসারণকে ঘিরে আদিবাসী অধিকার, সীমান্ত রাজনীতি ও নদী দূষণের আশঙ্কা নতুন আইনি ও পরিবেশগত বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















