একসময় রাজপরিবারের অলংকার, বিয়ের উপহার কিংবা বয়স্কদের গয়না হিসেবে পরিচিত জেড পাথর এখন দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণ প্রজন্মের কাছে নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গ্রীষ্ম মৌসুমে সিউলের ঐতিহ্যবাহী জুয়েলারি এলাকা জংনোতে ভিড় করছেন জেন জি ক্রেতারা, যাদের লক্ষ্য একটাই—নিজের পছন্দের অনন্য একটি জেড আংটি খুঁজে নেওয়া।
প্রাকৃতিক জেড পাথরের প্রতিটি টুকরোর রং, নকশা ও বৈশিষ্ট্য আলাদা হওয়ায় অনেকেই অনলাইনের বদলে সরাসরি দোকানে গিয়ে আংটি বেছে নিতে পছন্দ করছেন। তরুণদের কাছে এই খোঁজার অভিজ্ঞতাও এখন ফ্যাশনের অংশ হয়ে উঠেছে।
পুরোনো ধারণা ভেঙে নতুন বাজার
সিউলের জংনো এলাকা ১৯৩০-এর দশক থেকে গয়নার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। আগে এখানকার বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান পাইকারি ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে জেডের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী খুচরা বিক্রির দিকে ঝুঁকেন। এখন জেড আবার জনপ্রিয় হওয়ায় ‘ওকসিবাং’ ও ‘ইয়েজাক জুয়েলারি’র মতো বিশেষায়িত দোকানে প্রতিদিনই তরুণ ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে।
একটি দোকানের মালিক জানান, তাদের ৯০ শতাংশেরও বেশি ক্রেতাই তরুণ। এমনকি মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও জেড আংটি কিনতে আসছেন।
তরুণদের জন্য নতুন নকশা
কয়েক বছর আগেও জেডকে অনেকেই ‘দাদির গয়না’ হিসেবে দেখতেন। কিন্তু এখন সেই ধারণা বদলে গেছে। তরুণদের রুচি অনুযায়ী আংটির নকশা হয়েছে আরও সরল, পাতলা ও হালকা রঙের। ফলে দামও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। আংটির দাম শুরু হচ্ছে ৩৫ হাজার ওন থেকে।
সবুজের বিভিন্ন শেডের পাশাপাশি হলুদ, ল্যাভেন্ডার, বাদামি, সাদা ও কালো রঙের জেডও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। শুধু আংটি নয়, কুকুরছানা, ভালুক কিংবা ছোট ড্রাগনের আকৃতির পেনডেন্ট এবং আধুনিক নকশার ব্রেসলেটও তরুণদের আকর্ষণ করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং অনলাইন বিক্রির ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে এসব পণ্য আরও সহজে পৌঁছে যাচ্ছে।

ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের মিশেল
কোরিয়ার ইতিহাসে জেড ছিল সুরক্ষা, সৌভাগ্য ও রাজকীয় মর্যাদার প্রতীক। বিশ্বাস করা হতো, এটি অশুভ শক্তি দূরে রাখে এবং সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও সমৃদ্ধি বয়ে আনে।
আজও সেই বিশ্বাস পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। অনেকেই মনে করেন, জেড আংটি সৌভাগ্য এনে দেয় এবং ব্যবহারকারীকে সুরক্ষা দেয়। পাশাপাশি কোরিয়ার বিয়ের অনুষ্ঠানে কনের ও বরের মায়েদের জন্য জেড আংটি উপহার দেওয়ার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যও এখনো বজায় রয়েছে।
স্থানীয় জেডের বিশেষ পরিচয়
দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব ‘চুনচন জেড’ বা ‘কোরিয়ান জেড’ গ্যাংওন প্রদেশের চুনচন অঞ্চলে পাওয়া যায়। এটি নেফ্রাইট জাতের জেড, যার পরিচিত রং হালকা হাতির দাঁতের মতো সাদা ও উষ্ণ বাদামি।
মিয়ানমার ও গুয়াতেমালায় পাওয়া জেডাইটের তুলনায় নেফ্রাইট বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খনন করা হয় এবং এর মান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। এ কারণে দামও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকে, যা বিশ ও ত্রিশের কোঠার ক্রেতাদের জন্য এটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
তারকাদের প্রভাবেও বাড়ছে জনপ্রিয়তা
জেড আংটির জনপ্রিয়তা বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে কোরিয়ার তারকারাও। বিশেষ করে বিটিএস সদস্য ভি একটি কনসার্টে জেড আংটি পরার পর এটির প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।
জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের দাবি, এরপর থেকে বিদেশি ক্রেতার সংখ্যা বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যটকরাও দোকানে এসে কোরিয়ান জেড আংটি কিনছেন। মেক্সিকো থেকে আসা এক শিক্ষার্থী জানান, প্রতিটি জেড আংটির রং ও নকশা ভিন্ন হওয়ায় নিজের ত্বকের সঙ্গে মানানসইটি খুঁজে নেওয়াই সবচেয়ে আনন্দের বিষয়।
দক্ষিণ কোরিয়ায় ঐতিহ্য, আধুনিক নকশা, সাশ্রয়ী দাম এবং তারকাদের প্রভাব—সব মিলিয়ে জেড আংটি এখন জেন জি প্রজন্মের অন্যতম আলোচিত ফ্যাশন অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় জেন জির মধ্যে ঐতিহ্যবাহী জেড আংটির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। আধুনিক নকশা, সাশ্রয়ী দাম ও তারকাদের প্রভাবে বদলাচ্ছে ফ্যাশনের ধারা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















