চীন দীর্ঘদিন ধরেই তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রশান্ত মহাসাগরে একটি সাবমেরিন থেকে আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরল পরীক্ষা চালানোর ঘোষণা নতুন করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরীক্ষা শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রদর্শন নয়, বরং চীনের পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিতও বহন করছে।
সাবমেরিন থেকে বিরল ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা
চীনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একটি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন আন্তর্জাতিক জলসীমার দিকে একটি অনুশীলনমূলক আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রটিতে প্রকৃত পারমাণবিক ওয়ারহেডের পরিবর্তে পরীক্ষামূলক ওয়ারহেড ব্যবহার করা হয়। তবে ক্ষেপণাস্ত্রটি কোথায় গিয়ে পড়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে চীন সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করলেও তা সাধারণত নিজস্ব উপকূলের কাছাকাছি সীমাবদ্ধ ছিল। এবার প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তৃত এলাকায় এই পরীক্ষা দেশটির সামরিক কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
পারমাণবিক সক্ষমতার নতুন ধাপ
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই পরীক্ষার মাধ্যমে চীন স্থল, সমুদ্র ও আকাশ—তিন মাধ্যম থেকেই দূরপাল্লার পারমাণবিক হামলা চালানোর সক্ষমতা পূর্ণাঙ্গ করার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। এমন সক্ষমতা একটি দেশের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তোলে।
সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী সময়ে আকাশ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষাও দেখা যেতে পারে, যা এই সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের উদ্বেগ
বিদেশি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে চীন এ ধরনের পরীক্ষা আরও নিয়মিতভাবে চালাতে পারে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন অস্ত্রের কার্যকারিতা যাচাই করা হবে, অন্যদিকে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের কাছেও শক্ত বার্তা পৌঁছে দেওয়া হবে।
এদিকে চীনের দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার সম্প্রসারণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশটির সক্রিয় পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে আরও নীরব ও উন্নত প্রযুক্তির সাবমেরিন নির্মাণও অব্যাহত রয়েছে।

তাইওয়ান ইস্যুতে বাড়ছে শঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ানকে ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং সামরিক প্রস্তুতির সঙ্গে এই পরীক্ষার সম্পর্ক থাকতে পারে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত বড় আকার ধারণ করলে তা পারমাণবিক উত্তেজনায়ও রূপ নিতে পারে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পরীক্ষায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রটি সম্ভবত দীর্ঘপাল্লার আধুনিক নৌভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা চীনের উপকূলীয় এলাকা থেকেই দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া
চীন পরীক্ষার আগে অঞ্চলের কয়েকটি দেশকে আগাম অবহিত করলেও অনেক দেশ এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, এমন সামরিক পদক্ষেপ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কাও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
যদিও বিশ্বের অন্যান্য বড় পারমাণবিক শক্তিও নিয়মিতভাবে সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায়, তবু চীনের দ্রুত সামরিক সম্প্রসারণ এবং তাইওয়ানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার কারণে এই পরীক্ষা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
চীনের সাবমেরিন থেকে আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















