একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং তার রাজনৈতিক সংস্কৃতি কখনও একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং একটির সাফল্য বা ব্যর্থতা অন্যটির ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। যে সমাজে শিক্ষা মানুষকে মুক্ত চিন্তা, সহনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস শেখাতে ব্যর্থ হয়, সেখানে রাজনীতিও ধীরে ধীরে বিভাজন, সংঘাত এবং অসহিষ্ণুতার পথে এগোয়। আজকের দক্ষিণ কোরিয়ার বাস্তবতা সেই কঠিন সত্যকেই সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
শিক্ষা সম্পর্কে আমরা প্রায়ই পরীক্ষার ফল, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কিংবা কর্মসংস্থানের প্রস্তুতির কথা বলি। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা কি শুধু সঠিক উত্তর মুখস্থ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? একজন শিক্ষিত মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত ভিন্ন মত শুনতে পারার ক্ষমতা, নিজের অবস্থানে আস্থা রেখে যুক্তির মাধ্যমে বিতর্কে অংশ নেওয়ার মানসিকতা এবং মতভেদের মধ্যেও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার সক্ষমতা।
দুঃখজনকভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এই গুণগুলো গড়ে তুলতে পারছে না। বরং শিক্ষার্থীদের এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে, যেন জীবনের প্রতিটি প্রশ্নের একটিই সঠিক উত্তর আছে। পরীক্ষাকেন্দ্রিক এই কাঠামো কৌতূহল, প্রশ্ন করার অভ্যাস এবং সমালোচনামূলক চিন্তাকে ক্রমেই সংকুচিত করে ফেলছে। এর ফলে অনেকেই ভিন্ন মতের মুখোমুখি হলেই সেটিকে শত্রুতা হিসেবে দেখেন, যুক্তি দিয়ে নয়, আবেগ দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান।
এই প্রবণতা আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন শিক্ষা রাজনৈতিক পক্ষপাতের বাহক হয়ে দাঁড়ায়। কোনো শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে ভাবতে শেখানোর পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শ গ্রহণে উৎসাহিত করেন, তাহলে শিক্ষা তার মূল উদ্দেশ্য হারায়। বিদ্যালয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় তখন আর মুক্তবুদ্ধির ক্ষেত্র থাকে না; তা পরিণত হয় মতাদর্শগত পুনরুৎপাদনের প্রতিষ্ঠানে।
আত্মবিশ্বাস এবং একগুঁয়েমিকে আমরা প্রায়ই গুলিয়ে ফেলি। কিন্তু এই দুটি এক জিনিস নয়। প্রকৃত আত্মবিশ্বাস মানুষকে অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে শেখায়। নিজের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত ব্যক্তি ভিন্ন মতকে ভয় পান না। বিপরীতে, অনিশ্চয়তায় ভোগা মানুষই প্রায়শই মতভেদকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে নেন এবং প্রতিটি বিতর্ককে জয়-পরাজয়ের লড়াইয়ে পরিণত করেন।
একটি সুস্থ শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষের মধ্যে সেই মানসিক পরিপক্বতা তৈরি করে, যেখানে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও সংলাপ সম্ভব হয়। সমাজে সংস্কৃতি, শালীনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমার্জন গড়ে ওঠে এই অনুশীলনের মধ্য দিয়েই। কিন্তু যখন মানুষ ভিন্ন মত শুনতেই অস্বীকার করে, তখন সেটি শুধু রাজনৈতিক সংকট নয়; এটি শিক্ষারও ব্যর্থতার প্রমাণ।
দক্ষিণ কোরিয়ায় শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও বিনিয়োগ বিশ্বজুড়েই আলোচিত। কিন্তু এত প্রতিযোগিতা, এত ব্যয় এবং এত শ্রমের পরও যদি শিক্ষা মানুষকে আরও উদার, সহনশীল ও সত্যনিষ্ঠ করে তুলতে না পারে, তাহলে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক। একটি জাতির উন্নয়ন কেবল দক্ষ কর্মী তৈরি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার জন্য দরকার সচেতন নাগরিক, যারা সত্য অনুসন্ধান করবে এবং ভিন্ন মতকে শত্রু নয়, আলোচনার অংশ হিসেবে দেখবে।

এই ব্যর্থতার প্রতিফলন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় রাজনীতিতে। আজ রাজনীতি বলতে অনেকের চোখে ভেসে ওঠে তীব্র দলীয় বিভাজন, পরস্পরের বিরুদ্ধে অবিরাম আক্রমণ, কাদা ছোড়াছুড়ি এবং ক্ষমতার নিরন্তর লড়াই। জনস্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করাই যেন হয়ে উঠেছে মূল লক্ষ্য।
কিন্তু রাজনীতির জন্মই হয়েছে সংঘাতকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার জন্য। রাষ্ট্র পরিচালনার মূল শক্তি অস্ত্র নয়, সংলাপ। একজন রাজনীতিকের ভূমিকা যোদ্ধার নয়; তিনি আলোচক, সমঝোতাকারী এবং সমাজের বিভিন্ন স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। ক্ষমতার ব্যবহার তখনই অর্থবহ, যখন তা উত্তেজনা বাড়ানোর বদলে সংঘাত কমাতে ব্যবহৃত হয়।
বাস্তবে আমরা প্রায়ই উল্টো চিত্র দেখি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেক সময় বিভাজনকে আরও গভীর করে, প্রতিপক্ষকে শত্রুতে পরিণত করে এবং সমঝোতার পরিবর্তে সংঘর্ষকে উৎসাহিত করে। ফলে রাজনীতি মানুষের আস্থা হারায় এবং গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।
আদর্শ রাজনীতিতে মতাদর্শ থাকবে, বিতর্কও থাকবে। কিন্তু সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত কোনটি সঠিক, কোনটি জনকল্যাণে বেশি কার্যকর—ডান বা বাম পরিচয়ের অনন্ত সংঘাত নয়। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তখনই অর্থবহ, যখন তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত সমাজ গঠনের লক্ষ্যকে সামনে রাখে।
ইতিহাসে এমন বহু রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন, যারা সংকটের সময় নিজেদের ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের স্মরণ করার কারণ কেবল তাদের জনপ্রিয়তা নয়; বরং তারা প্রমাণ করেছিলেন, দূরদৃষ্টি, সংযম এবং কূটনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে গভীর সংকটও মোকাবিলা করা সম্ভব।
দক্ষিণ কোরিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই দুই ভিত্তির ওপর—শিক্ষা এবং রাজনীতি। যদি শিক্ষা স্বাধীন চিন্তা, সহনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে পারে এবং রাজনীতি যদি সংঘাতের পরিবর্তে সমঝোতার সংস্কৃতি গ্রহণ করে, তবে সমাজ আরও সুস্থ, স্থিতিশীল ও মানবিক হয়ে উঠবে। অন্যথায় বিভাজন, অবিশ্বাস এবং ক্রমবর্ধমান মেরুকরণই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
কিম সিয়ং-কন 



















