ভারতের অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে। চলতি বছরের শেষ প্রান্তিকে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বের অনেক বড় অর্থনীতির তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট শক্তিশালী। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করার যে স্বপ্ন, সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য বর্তমান প্রবৃদ্ধির গতি যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
২০৪৭ সালের লক্ষ্য কতটা কঠিন
ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তিতে অর্থাৎ ২০৪৭ সালে ভারতকে উন্নত দেশে পরিণত করতে চান মোদি। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আগামী ২১ বছর ভারতের অর্থনীতিকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ হারে বাড়তে হবে বলে হিসাব করা হয়েছে।
তবে গত দুই দশকের বেশি সময়ের প্রবৃদ্ধির চিত্র সেই লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভারতের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। বর্তমানে ভারতের সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে বলে মনে করা হলেও, ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ বা তার বেশি প্রবৃদ্ধি গত ৫০ বছরে মাত্র তিনবার দেখা গেছে।

অর্থনীতির আকার যত বড় হবে, একই হারে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাও তত কঠিন হয়ে উঠবে। ফলে ২০৪৭ সালের লক্ষ্য অর্জনের জন্য ভারতকে দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিক শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে হবে।
মাথাপিছু আয়ে বিশাল ব্যবধান
উন্নত দেশের পর্যায়ে পৌঁছাতে ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো মাথাপিছু আয় বাড়ানো। ২০২৫ সালে ভারতের মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ২ হাজার ৮১৩ মার্কিন ডলার। উন্নত অর্থনীতির উচ্চ আয়ের সীমা অতিক্রম করতে ২০৪৭ সালের মধ্যে এই আয় ছয় গুণেরও বেশি বাড়িয়ে প্রায় ১৮ হাজার ডলারে নিতে হবে।
বর্তমান প্রবৃদ্ধির গতি অব্যাহত থাকলে এই ব্যবধান পূরণ করা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে মজুরি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা একই গতিতে না বাড়ে, তাহলে ভারত মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
শিল্প খাতেই বড় দুর্বলতা
ভারতের উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার পথে উৎপাদনশিল্পকে আরও শক্তিশালী করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনে উৎপাদনশিল্পের অংশ প্রায় ১৬ থেকে ১৭ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে।
অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য রপ্তানি বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো গেলে অর্থনীতির গতি আরও বাড়ানো সম্ভব।

বিশ্বের পণ্য রপ্তানিতে ভারতের অংশ ২ শতাংশেরও কম। বিপরীতে চীনের অংশ ১৪ শতাংশের বেশি। শিল্পশক্তি হিসেবে চীনের সঙ্গে ব্যবধান কমাতে হলে ভারতকে উৎপাদন ও রপ্তানি—দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের অগ্রগতি করতে হবে।
বিদেশি বিনিয়োগেও প্রশ্ন
ভারত গত কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সেই অর্থ দীর্ঘমেয়াদে দেশে ধরে রাখা যাচ্ছে না। একই সময়ে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশে বিনিয়োগ বেড়েছে এবং দেশটির নতুন উদ্যোগগুলোতে বিনিয়োগ করা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ আগের বিনিয়োগ দ্রুত তুলে নিচ্ছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমার আরেকটি কারণ হিসেবে ভারতের অর্থনীতির কিছু কাঠামোগত ঝুঁকির কথা বলা হচ্ছে। চলতি হিসাবের ঘাটতি, বাজেট ঘাটতি এবং বৈদেশিক ভারসাম্য রক্ষায় অস্থির বিদেশি মূলধনের ওপর নির্ভরতা এসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
চলতি বছর এশিয়ার মুদ্রাগুলোর মধ্যে ভারতীয় রুপির দরপতনও উল্লেখযোগ্য। বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের দিক থেকেও ভারতের অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়েছে।
সঞ্চয় ও কর্মসংস্থান বড় প্রশ্ন
ভারতের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির সঞ্চয়ের হার বিশ্বের গড়ের চেয়ে বেশি হলেও এশিয়ার কয়েকটি বড় অর্থনীতির তুলনায় তা কম, বিশেষ করে চীনের তুলনায় ব্যবধান অনেক।
কম মাথাপিছু আয়ও সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের ক্ষমতা সীমিত করে। অথচ নতুন কারখানা, অবকাঠামো ও অন্যান্য বিনিয়োগের জন্য তুলনামূলক কম খরচের দেশীয় মূলধন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সঞ্চয় কমে গেলে ভারতকে আরও বেশি বিদেশি মূলধন অথবা ব্যয়বহুল ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মসংস্থানের সংকট। ভারতের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী আগামী প্রায় তিন দশক দেশটির জন্য জনমিতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে। কিন্তু পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান ও দক্ষতা তৈরি করা না গেলে এই সুবিধাই উল্টো বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
এক সাম্প্রতিক সরকারি গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখ ভারতীয় কাজ, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ—কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত ছিল না। মানসম্মত চাকরির অভাবে দেশটির প্রায় ৬০ শতাংশ শ্রমশক্তি স্বনিয়োজিত কাজে যুক্ত, যার বড় অংশ কৃষিতে। কৃষি সাধারণত তুলনামূলক কম আয়ের কর্মসংস্থান তৈরি করে।
মোদির স্বপ্নের সামনে মূল পরীক্ষা
ভারতের সামষ্টিক অর্থনীতি তুলনামূলক স্থিতিশীল এবং সরকার সংস্কারের কথা বলছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি বিনিয়োগের গতি কেন দুর্বল, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের নিট প্রবাহ কেন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান কেন তৈরি হচ্ছে না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাই যদি কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখা আরও বড় চ্যালেঞ্জ। অথচ ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারত গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এমন উচ্চ প্রবৃদ্ধিই প্রয়োজন।
তাই ভারতের সামনে এখন শুধু দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রশ্ন নয়; বরং সেই প্রবৃদ্ধিকে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা, শিল্পায়ন, রপ্তানি ও মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করার পরীক্ষাও রয়েছে। এই জায়গায় বড় পরিবর্তন আনতে না পারলে ২০৪৭ সালের উন্নত ভারতের স্বপ্ন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারত গড়তে ভারতের অর্থনীতিকে উচ্চ প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও মাথাপিছু আয় বাড়ানোর বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















