চল্লিশের শেষভাগে এসে শরীরে হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া, পেটের চারপাশে মেদ জমা, মুখে গভীর ভাঁজ পড়া—এসব পরিবর্তন অনেক নারীর কাছেই অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে। বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তনকে মেনে নেওয়ার বদলে অনেকে তা আড়াল করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইতালির দক্ষিণাঞ্চলে গিয়ে এক নারীর অভিজ্ঞতা বদলে দিয়েছে বয়স ও সৌন্দর্য সম্পর্কে তাঁর ধারণা।
ওষুধ কিংবা অস্ত্রোপচার নয়, সুখের সন্ধান ইতালিতে
শরীরের বাড়তি ওজন কমাতে তিনি একসময় ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহার করেছিলেন। তাতে ওজন কমলেও শরীরের আকৃতিতে এমন কিছু পরিবর্তন আসে, যা তাঁর কাছে কাঙ্ক্ষিত ছিল না। পাশাপাশি চিকিৎসার খরচও ছিল যথেষ্ট বেশি। শেষ পর্যন্ত তিনি সেই পথ থেকে সরে আসেন।
সৌন্দর্য ধরে রাখতে অস্ত্রোপচার কিংবা মুখে বয়সের ছাপ কমানোর নানা প্রসাধনী চিকিৎসাও তাঁর কাছে স্থায়ী সমাধান হয়ে ওঠেনি। বরং তিনি বুঝতে শুরু করেন, বয়সকে মুছে ফেলার চেষ্টার চেয়ে বয়সের সঙ্গে শরীরের পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করাই হয়তো বেশি স্বস্তির।
এই উপলব্ধির বড় অংশ আসে ইতালির সরেন্তো ভ্রমণের সময়।
সরেন্তোর সৈকতে অন্যরকম দৃশ্য
নেপলসের দক্ষিণে অবস্থিত সরেন্তো তার নীলাভ সমুদ্র, পাহাড়ি উপকূল, সুস্বাদু খাবার এবং লেবুর জন্য পরিচিত। সেখানে পরিবারের সঙ্গে কয়েক দিন কাটানোর সময় তিনি একটি সমুদ্রসৈকত কেন্দ্রে এমন দৃশ্য দেখেন, যা তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলে।

সৈকতে নানা বয়সের নারী-পুরুষ আনন্দে সময় কাটাচ্ছিলেন। তবে সবচেয়ে বেশি তাঁর নজর কাড়েন সত্তরের বেশি বয়সী নারীরা। তাঁদের কারও শরীরে ছিল বাড়তি মেদ, কারও ত্বকে ছিল বয়সের ছাপ, কোথাও ছিল ভাঁজ কিংবা ঝুলে যাওয়া চামড়া। তবু তাঁরা নিজেদের শরীর নিয়ে বিন্দুমাত্র সংকোচে ছিলেন না।
তাঁরা স্বাভাবিক পোশাকে সমুদ্রে নামছিলেন, বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে গল্প করছিলেন, হাসছিলেন এবং আনন্দ করছিলেন। শরীর ঢাকার জন্য বারবার তোয়ালে টেনে নেওয়া কিংবা নিজের চেহারা নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশের কোনো লক্ষণ ছিল না।
বয়সের সঙ্গে লড়াই নয়, বয়সকে গ্রহণ
এই দৃশ্যের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল সৌন্দর্য নয়, স্বস্তি। লেখকের মনে হয়েছিল, ওই নারীরা যেন বয়সের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন না। তাঁরা নিজেদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করার বা সময়ের চিহ্ন মুছে ফেলার কোনো প্রতিযোগিতায়ও নেই।
অন্যদিকে নিজের দেশে সৈকতে গিয়ে তিনি প্রায়ই এমন নারীদের দেখেন, যাঁদের শরীর অত্যন্ত ছিপছিপে, সাজানো বা কৃত্রিমভাবে পরিবর্তিত বলে মনে হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবে বয়সী শরীরগুলো তাঁর চোখেই যেন হারিয়ে যায়।
ইতালিতে গিয়ে তিনি উল্টো চিত্র দেখলেন। সেখানে বয়স্ক মানুষের শরীরকে লুকিয়ে রাখা হয়নি। তাঁরা নিজেদের প্রাপ্য জায়গা নিয়েই প্রকাশ্যে ছিলেন। বয়স তাঁদের অস্তিত্বকে সংকুচিত করেনি।
সৌন্দর্যের সংজ্ঞা বদলে গেল

লেখকের উপলব্ধি ছিল, ওই বয়স্ক নারীদের দেখে তাঁর প্রথম চিন্তা ছিল না যে তাঁরা কতটা সুন্দর। বরং তাঁর মনে হয়েছিল, তাঁরা কতটা স্বচ্ছন্দ।
শিশুকালের নিখুঁত সৌন্দর্য থেকে শুরু করে বার্ধক্যের বলিরেখা—মানবদেহ সময়ের সঙ্গে বদলাবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমাজ যখন বারবার তারুণ্য ধরে রাখাকে সৌন্দর্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে তুলে ধরে, তখন স্বাভাবিক বার্ধক্যকেও অনেকের কাছে ব্যর্থতা বলে মনে হতে পারে।
সরেন্তোর অভিজ্ঞতা তাঁকে সেই ধারণা থেকে কিছুটা মুক্ত করেছে। সেখানে তিনি দেখেছেন, বয়সী মানুষও আনন্দ করতে পারেন, সমুদ্র উপভোগ করতে পারেন এবং নিজের শরীর নিয়ে লজ্জিত না হয়েও সুন্দরভাবে বাঁচতে পারেন।
নিজের শরীরকে নিজের করে নেওয়ার শিক্ষা
এই ভ্রমণ তাঁর কাছে কেবল একটি ছুটি ছিল না। বরং বয়স বাড়ার ভয়, শরীর নিয়ে অস্বস্তি এবং নিজেকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করার অভ্যাস থেকে সাময়িক মুক্তি পাওয়ার সুযোগ ছিল।
তিনি উপলব্ধি করেছেন, সুখীভাবে বয়স বাড়ার জন্য হয়তো সবসময় শরীরকে বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের পরিবর্তিত শরীরকে গ্রহণ করা, বয়সকে স্বাভাবিক জীবনের অংশ হিসেবে দেখা এবং অন্যের দৃষ্টির চেয়ে নিজের স্বস্তিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়াই হতে পারে বড় অর্জন।
দক্ষিণ ইতালির সৈকতে দেখা সেই নারীরা তাঁকে যেন একটি সহজ বার্তাই দিয়েছেন—বয়স থামানো যায় না, কিন্তু বয়সের প্রতিটি পর্যায়কে উপভোগ করা যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















