০৩:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্যযুদ্ধ: ট্রাম্পের নীতিতে ভুলের পর ভুল বাংলাদেশে কাতারের এলএনজি সরবরাহ বন্ধ, স্থগিতাদেশ সেপ্টেম্বরের পরও বহাল প্রিমিয়াম ক্রীড়াপোশাকের বাজারে নতুন অস্ট্রেলীয় ব্র্যান্ডের চ্যালেঞ্জ পিরোজপুরে ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতি, এক দিনে ৩৬ ভর্তি ও নারীর মৃত্যু সুন্দরবনে ৩ মাস পর পর্যটক ও জেলেদের প্রবেশ, জীববৈচিত্র্যে মিলেছে স্বস্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত, ৩ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল দেড় শতকের পথে দানাং বন্দর, ১২৫ বছরে স্মার্ট সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্রে রূপান্তর ইনফ্লুয়েন্সার বাছাইয়ে বদলে যাচ্ছে ব্র্যান্ডের কৌশল মুখের যত্নেও বিলাসী সৌন্দর্যের যুগ, ডাইসনের প্রথম টুথব্রাশে নতুন ইঙ্গিত মায়ের পেনশন পেতে ঘুষের দাবি, প্রতিবাদে কিশোরের ‘ঘুষ’ ওয়েবসাইট—৯ দিনে অভিযোগ প্রায় ১০ হাজার

৩০ বছর ধরে সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত ছেলেকে আগলে রাখার মায়ের লড়াই

১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বর। দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এক গ্রামে মাত্র ১৬ বছর বয়সী কেনেইলওয়ে ডিকোমা প্রথমবারের মতো মা হয়েছেন। সন্তান লোরাতো ছিল শান্ত স্বভাবের, হাসতও অনেক। কিন্তু ছয় মাস বয়সে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় চিকিৎসাকর্মীরা বুঝতে পারেন, শিশুটির বিকাশ স্বাভাবিক গতিতে হচ্ছে না। সে তখনও বসতে পারছিল না।

সেখান থেকেই শুরু হয় এক মায়ের দীর্ঘ সংগ্রাম। হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, লোরাতো সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত। তখন এই রোগ সম্পর্কে ডিকোমার কোনো ধারণাই ছিল না। ভয়, অনিশ্চয়তা আর অসহায়তার মধ্যে তাকে শিখতে হয় কীভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানকে সারাজীবন দেখভাল করতে হয়।

জন্মের পরই দেখা দিয়েছিল সংকেত

লোরাতোর জন্ম হয়েছিল একটি গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। জন্মের পর সে কাঁদেনি। কয়েক দিন পর তার খিঁচুনি শুরু হয়। তাকে প্রথমে জেলুকস্প্যান এবং পরে ক্লার্কসডর্প হাসপাতালে নেওয়া হয়। খিঁচুনি কমে গেলে দুই সপ্তাহ পর মা ও শিশুকে বাড়ি পাঠানো হয়। তখনও কেউ বুঝতে পারেনি যে শিশুটি সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত।

সেরিব্রাল পালসি এমন একটি স্থায়ী শারীরিক অবস্থা, যা চলাফেরা, দেহের ভঙ্গি ও পেশি নিয়ন্ত্রণে সমস্যা সৃষ্টি করে। শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতি বা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার কারণে এটি হতে পারে। জন্মের আগে, জন্মের সময় কিংবা শিশুর দুই বছর বয়সের মধ্যে এর কারণ তৈরি হতে পারে।

লোরাতোর ক্ষেত্রে চারটি অঙ্গই আক্রান্ত। তার শরীরের পেশিতে সবসময় টান থাকে। এর ফলে মেরুদণ্ডে তীব্র বক্রতা তৈরি হয়েছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে শরীর কেঁপেও ওঠে। তিনি হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন এবং খাওয়া, গোসল, পোশাক পরা—প্রায় সব কাজেই অন্যের সহায়তা প্রয়োজন হয়।

নিজের মতো করে তৈরি হয়েছে যোগাযোগের ভাষা

লোরাতো কতটা বুঝতে পারেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তার কথা বলার ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। কিছু শব্দ বলতে পারলেও মূলত চোখের নড়াচড়া ও বিভিন্ন ধরনের শব্দের মাধ্যমে নিজের প্রয়োজন বোঝান।

এই ভাষা অপরিচিত মানুষের কাছে দুর্বোধ্য হলেও পরিবার ও গ্রামের মানুষ এখন তা বুঝতে পারেন। ফলে লোরাতো একেবারে বিচ্ছিন্ন নন।

তিনি আনন্দপ্রিয় মানুষ। গ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, জন্মদিন কিংবা শেষকৃত্য—যেখানেই যাওয়ার সুযোগ পান, যেতে চান। ধর্মীয় সংগীত তার বিশেষ পছন্দ। গানের দল টেলিভিশনে এলে শব্দ জোরে দিতে বলেন।

গির্জার মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও গভীর। কোনো রবিবার সেখানে যেতে না পারলে তিনি মনমরা হয়ে পড়েন, কখনও কখনও খেতেও চান না। গির্জার মানুষ তাকে আপন করে নিয়েছে, তার জন্য অনুষ্ঠান করেছে, এমনকি তাকে একা বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনেও যেতে দিয়েছে।

This is how we do it': 30 years of caring for a son with cerebral palsy

এক তরুণী মায়ের জীবনের মোড় ঘুরে যায়

লোরাতোর চিকিৎসার সময় জেলুকস্প্যান জেলা হাসপাতালের শারীরিক পুনর্বাসন বিভাগের প্রধান উন্ডিনে রাউটারের সঙ্গে ডিকোমার পরিচয় হয়।

রাউটার তখন তরুণী। জার্মানি থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় এসে তিনি মানুষের শারীরিক পুনর্বাসনের কাজ শুরু করেছিলেন। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি তাদের ভাষা শেখেন। সেলাইয়ের একটি স্থানীয় দলের নারীরা তাকে ‘ম্মাতুমেলো’ নাম দেন, যার অর্থ বিশ্বাসের মা।

হাসপাতালে তখন অভিভাবক সহায়তা কেন্দ্র নামে একটি বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। সেখানে মা-বাবারা সন্তানদের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ থাকতে পারতেন এবং শিখতেন কীভাবে প্রতিবন্ধী শিশুকে খাওয়াতে, কোলে নিতে, বসাতে ও ব্যায়াম করাতে হয়।

ডিকোমা লোরাতোকে নিয়ে সেখানে ছয় সপ্তাহ ছিলেন।

প্রথম দিকে বাস্তবতাটি মেনে নেওয়া তার জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। কিন্তু চিকিৎসাকর্মীরা তাকে বোঝান, সন্তানকে কীভাবে দেখভাল করতে হবে। ধীরে ধীরে তিনি পরিস্থিতি মেনে নেন।

“সে আমার সন্তান। আমাকে তার যত্ন নিতেই হবে”—এই উপলব্ধিই হয়ে ওঠে তার শক্তি।

চিকিৎসার চেয়ে পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

সেরিব্রাল পালসি পুরোপুরি সারিয়ে তোলার কোনো সহজ উপায় নেই। তবে ওষুধ, অস্ত্রোপচার, শারীরিক পুনর্বাসন এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে এর প্রভাব সামলানো যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাড়িতে নিয়মিত ব্যায়াম ও পেশি শক্তিশালী করার অনুশীলনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।

রাউটারের মতে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ‘ঠিক করে দেওয়া’ই মূল লক্ষ্য নয়। বরং তার সীমাবদ্ধতা ও সক্ষমতাকে বুঝে তাকে পরিবার ও সমাজের অংশ হিসেবে বাঁচার সুযোগ করে দেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

দারিদ্র্যকে আরও কঠিন করে তোলে প্রতিবন্ধকতা

গ্রামীণ এলাকায় সেরিব্রাল পালসি নিয়ে বেঁচে থাকা শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়; দারিদ্র্য প্রতিদিনের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে।

ডিকোমার বাড়ির কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি এখন চলমান স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। সেখানে সবসময় লোরাতোর প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না। তখন তাকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে যেতে হয়।

লোরাতো সাধারণ যাত্রীবাহী গাড়িতে চলাচল করতে পারেন না। তাই হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ডিকোমাকে গাড়ি ভাড়া করতে হয়। যাতায়াতে প্রায় ৩০০ দক্ষিণ আফ্রিকান মুদ্রা খরচ হয়, যা তার মাসিক প্রতিবন্ধী ভাতার বড় একটি অংশ।

ডিকোমা একা হাতে আরও তিন সন্তানকে দেখাশোনা করেন। তার কোনো চাকরি নেই। খাবার, পোশাকসহ পরিবারের সব খরচ ওই সামান্য অর্থ থেকেই চালাতে হয়।

একটি উপযুক্ত শৌচাগারও নেই

তাদের তিন কক্ষের বাড়িতে ঘরের ভেতর পানির ব্যবস্থা নেই। বাইরে একটি পানির ট্যাংক থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়।

লোরাতোর জন্য বাড়ির প্রচলিত শৌচাগার ব্যবহার করা সম্ভব নয়। তিনি নিজে ভারসাম্য রাখতে বা হুইলচেয়ার নিয়ে অসমান মাটির উঠান পেরিয়ে সেখানে যেতে পারেন না।

তাই শৌচকর্মের প্রয়োজন হলে ডিকোমা তাকে বিছানায় শুইয়ে দেন। নিচে বিশেষ কাপড় বা শোষণক্ষম উপকরণ রেখে পরে পরিষ্কার করেন।

তিন দশক ধরে একইভাবে চলছে তাদের জীবন।

ডিকোমার ভাষায়, এটাই তাদের বাস্তবতা—কারণ তার ছেলের জন্য উপযুক্ত শৌচাগার নেই।

কমে গেছে সহায়তার সুযোগ

জেলুকস্প্যান হাসপাতালের অভিভাবক সহায়তা কেন্দ্র একসময় পরিবারগুলোকে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিত। কিন্তু মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে মা ও সন্তানদের সেখানে রাখার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ধীরে ধীরে প্রশিক্ষণের সময় কমতে থাকে। ২০১৬ সালের দিকে অর্থায়ন আরও কমে যায় এবং একপর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

এখন মঙ্গলবার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কিছু সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। আগের মতো নিয়মিতভাবে প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থাও নেই।

পুনর্বাসনের সরঞ্জামের সংকটও রয়েছে। পুরোনো হুইলচেয়ার ও অন্যান্য সরঞ্জাম মেরামত করে যতদিন সম্ভব ব্যবহার করা হচ্ছে। লোরাতোর বর্তমান হুইলচেয়ারটি তার শরীরের মাপ অনুযায়ী নয়। এতে তার ব্যথা হয় এবং বাইরে যাতায়াতও সীমিত হয়ে গেছে।

This is how we do it': 30 years of caring for a son with cerebral palsy |  News24

তবু অন্য মায়েদের পাশে দাঁড়ান ডিকোমা

নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাকে ডিকোমা এখন অন্যদের জন্য কাজে লাগাচ্ছেন। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে তিনি গর্ভবতী নারী ও নতুন মায়েদের বোঝান, শিশুর বিকাশে সমস্যা কীভাবে দ্রুত শনাক্ত করা যায়।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান জন্মের পর অনেক মা লজ্জা ও সামাজিক ভয়ের কারণে সন্তানকে ঘরের মধ্যে লুকিয়ে রাখেন। ডিকোমা তাদের বলেন, সন্তানকে লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই।

তার নিজের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে—শিশুকে গ্রহণ করতে হবে, তার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি সক্ষমতাকেও দেখতে হবে এবং তাকে আনন্দের সঙ্গে সমাজের অংশ করে তুলতে হবে।

৩০ বছরের ভালোবাসা

লোরাতোর ভবিষ্যৎ নিয়ে ডিকোমার ভয় আছে। ছেলেকে হারানোর কথা কল্পনাও করতে পারেন না তিনি।

তিন দশক ধরে প্রতিদিনের অসংখ্য কঠিন কাজের মধ্যেও তিনি ছেলের পাশে থেকেছেন। এখন তার প্রয়োজনগুলোও খুব স্পষ্ট—চিকিৎসাকেন্দ্রে যাতায়াতের জন্য পরিবহন, প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছানোর জন্য পুনর্বাসনকর্মীদের যানবাহন, আরও পর্যাপ্ত প্রতিবন্ধী ভাতা, শরীরের উপযোগী হুইলচেয়ার এবং সবচেয়ে মৌলিক একটি প্রয়োজন—বাড়িতে উপযুক্ত শৌচাগার।

এই গল্প শুধু একজন মায়ের নয়। এটি দেখায়, প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনকে সহজ করতে চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ, পরিবহন, অবকাঠামো এবং সরকারি সহায়তা কতটা জরুরি।

ডিকোমার ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, যথাযথ সহায়তা না থাকলেও একজন মা সন্তানের জন্য অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা করতে পারেন। তবে একটি পরিবারের কাঁধে পুরো দায়িত্ব চাপিয়ে না দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকেও সেই দায়িত্বের অংশ নিতে হয়।

সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত সন্তানকে ৩০ বছর ধরে আগলে রাখা মায়ের এই লড়াই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রতিবন্ধকতা কোনো মানুষের মূল্য কমিয়ে দেয় না; প্রয়োজন শুধু তাকে বাঁচার উপযুক্ত সুযোগ করে দেওয়া।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্যযুদ্ধ: ট্রাম্পের নীতিতে ভুলের পর ভুল

৩০ বছর ধরে সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত ছেলেকে আগলে রাখার মায়ের লড়াই

১২:০৭:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বর। দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এক গ্রামে মাত্র ১৬ বছর বয়সী কেনেইলওয়ে ডিকোমা প্রথমবারের মতো মা হয়েছেন। সন্তান লোরাতো ছিল শান্ত স্বভাবের, হাসতও অনেক। কিন্তু ছয় মাস বয়সে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় চিকিৎসাকর্মীরা বুঝতে পারেন, শিশুটির বিকাশ স্বাভাবিক গতিতে হচ্ছে না। সে তখনও বসতে পারছিল না।

সেখান থেকেই শুরু হয় এক মায়ের দীর্ঘ সংগ্রাম। হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, লোরাতো সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত। তখন এই রোগ সম্পর্কে ডিকোমার কোনো ধারণাই ছিল না। ভয়, অনিশ্চয়তা আর অসহায়তার মধ্যে তাকে শিখতে হয় কীভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানকে সারাজীবন দেখভাল করতে হয়।

জন্মের পরই দেখা দিয়েছিল সংকেত

লোরাতোর জন্ম হয়েছিল একটি গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। জন্মের পর সে কাঁদেনি। কয়েক দিন পর তার খিঁচুনি শুরু হয়। তাকে প্রথমে জেলুকস্প্যান এবং পরে ক্লার্কসডর্প হাসপাতালে নেওয়া হয়। খিঁচুনি কমে গেলে দুই সপ্তাহ পর মা ও শিশুকে বাড়ি পাঠানো হয়। তখনও কেউ বুঝতে পারেনি যে শিশুটি সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত।

সেরিব্রাল পালসি এমন একটি স্থায়ী শারীরিক অবস্থা, যা চলাফেরা, দেহের ভঙ্গি ও পেশি নিয়ন্ত্রণে সমস্যা সৃষ্টি করে। শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতি বা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার কারণে এটি হতে পারে। জন্মের আগে, জন্মের সময় কিংবা শিশুর দুই বছর বয়সের মধ্যে এর কারণ তৈরি হতে পারে।

লোরাতোর ক্ষেত্রে চারটি অঙ্গই আক্রান্ত। তার শরীরের পেশিতে সবসময় টান থাকে। এর ফলে মেরুদণ্ডে তীব্র বক্রতা তৈরি হয়েছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে শরীর কেঁপেও ওঠে। তিনি হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন এবং খাওয়া, গোসল, পোশাক পরা—প্রায় সব কাজেই অন্যের সহায়তা প্রয়োজন হয়।

নিজের মতো করে তৈরি হয়েছে যোগাযোগের ভাষা

লোরাতো কতটা বুঝতে পারেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তার কথা বলার ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। কিছু শব্দ বলতে পারলেও মূলত চোখের নড়াচড়া ও বিভিন্ন ধরনের শব্দের মাধ্যমে নিজের প্রয়োজন বোঝান।

এই ভাষা অপরিচিত মানুষের কাছে দুর্বোধ্য হলেও পরিবার ও গ্রামের মানুষ এখন তা বুঝতে পারেন। ফলে লোরাতো একেবারে বিচ্ছিন্ন নন।

তিনি আনন্দপ্রিয় মানুষ। গ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, জন্মদিন কিংবা শেষকৃত্য—যেখানেই যাওয়ার সুযোগ পান, যেতে চান। ধর্মীয় সংগীত তার বিশেষ পছন্দ। গানের দল টেলিভিশনে এলে শব্দ জোরে দিতে বলেন।

গির্জার মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও গভীর। কোনো রবিবার সেখানে যেতে না পারলে তিনি মনমরা হয়ে পড়েন, কখনও কখনও খেতেও চান না। গির্জার মানুষ তাকে আপন করে নিয়েছে, তার জন্য অনুষ্ঠান করেছে, এমনকি তাকে একা বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনেও যেতে দিয়েছে।

This is how we do it': 30 years of caring for a son with cerebral palsy

এক তরুণী মায়ের জীবনের মোড় ঘুরে যায়

লোরাতোর চিকিৎসার সময় জেলুকস্প্যান জেলা হাসপাতালের শারীরিক পুনর্বাসন বিভাগের প্রধান উন্ডিনে রাউটারের সঙ্গে ডিকোমার পরিচয় হয়।

রাউটার তখন তরুণী। জার্মানি থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় এসে তিনি মানুষের শারীরিক পুনর্বাসনের কাজ শুরু করেছিলেন। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি তাদের ভাষা শেখেন। সেলাইয়ের একটি স্থানীয় দলের নারীরা তাকে ‘ম্মাতুমেলো’ নাম দেন, যার অর্থ বিশ্বাসের মা।

হাসপাতালে তখন অভিভাবক সহায়তা কেন্দ্র নামে একটি বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। সেখানে মা-বাবারা সন্তানদের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ থাকতে পারতেন এবং শিখতেন কীভাবে প্রতিবন্ধী শিশুকে খাওয়াতে, কোলে নিতে, বসাতে ও ব্যায়াম করাতে হয়।

ডিকোমা লোরাতোকে নিয়ে সেখানে ছয় সপ্তাহ ছিলেন।

প্রথম দিকে বাস্তবতাটি মেনে নেওয়া তার জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। কিন্তু চিকিৎসাকর্মীরা তাকে বোঝান, সন্তানকে কীভাবে দেখভাল করতে হবে। ধীরে ধীরে তিনি পরিস্থিতি মেনে নেন।

“সে আমার সন্তান। আমাকে তার যত্ন নিতেই হবে”—এই উপলব্ধিই হয়ে ওঠে তার শক্তি।

চিকিৎসার চেয়ে পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

সেরিব্রাল পালসি পুরোপুরি সারিয়ে তোলার কোনো সহজ উপায় নেই। তবে ওষুধ, অস্ত্রোপচার, শারীরিক পুনর্বাসন এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে এর প্রভাব সামলানো যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাড়িতে নিয়মিত ব্যায়াম ও পেশি শক্তিশালী করার অনুশীলনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।

রাউটারের মতে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ‘ঠিক করে দেওয়া’ই মূল লক্ষ্য নয়। বরং তার সীমাবদ্ধতা ও সক্ষমতাকে বুঝে তাকে পরিবার ও সমাজের অংশ হিসেবে বাঁচার সুযোগ করে দেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

দারিদ্র্যকে আরও কঠিন করে তোলে প্রতিবন্ধকতা

গ্রামীণ এলাকায় সেরিব্রাল পালসি নিয়ে বেঁচে থাকা শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়; দারিদ্র্য প্রতিদিনের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে।

ডিকোমার বাড়ির কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি এখন চলমান স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। সেখানে সবসময় লোরাতোর প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না। তখন তাকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে যেতে হয়।

লোরাতো সাধারণ যাত্রীবাহী গাড়িতে চলাচল করতে পারেন না। তাই হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ডিকোমাকে গাড়ি ভাড়া করতে হয়। যাতায়াতে প্রায় ৩০০ দক্ষিণ আফ্রিকান মুদ্রা খরচ হয়, যা তার মাসিক প্রতিবন্ধী ভাতার বড় একটি অংশ।

ডিকোমা একা হাতে আরও তিন সন্তানকে দেখাশোনা করেন। তার কোনো চাকরি নেই। খাবার, পোশাকসহ পরিবারের সব খরচ ওই সামান্য অর্থ থেকেই চালাতে হয়।

একটি উপযুক্ত শৌচাগারও নেই

তাদের তিন কক্ষের বাড়িতে ঘরের ভেতর পানির ব্যবস্থা নেই। বাইরে একটি পানির ট্যাংক থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়।

লোরাতোর জন্য বাড়ির প্রচলিত শৌচাগার ব্যবহার করা সম্ভব নয়। তিনি নিজে ভারসাম্য রাখতে বা হুইলচেয়ার নিয়ে অসমান মাটির উঠান পেরিয়ে সেখানে যেতে পারেন না।

তাই শৌচকর্মের প্রয়োজন হলে ডিকোমা তাকে বিছানায় শুইয়ে দেন। নিচে বিশেষ কাপড় বা শোষণক্ষম উপকরণ রেখে পরে পরিষ্কার করেন।

তিন দশক ধরে একইভাবে চলছে তাদের জীবন।

ডিকোমার ভাষায়, এটাই তাদের বাস্তবতা—কারণ তার ছেলের জন্য উপযুক্ত শৌচাগার নেই।

কমে গেছে সহায়তার সুযোগ

জেলুকস্প্যান হাসপাতালের অভিভাবক সহায়তা কেন্দ্র একসময় পরিবারগুলোকে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিত। কিন্তু মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে মা ও সন্তানদের সেখানে রাখার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ধীরে ধীরে প্রশিক্ষণের সময় কমতে থাকে। ২০১৬ সালের দিকে অর্থায়ন আরও কমে যায় এবং একপর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

এখন মঙ্গলবার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কিছু সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। আগের মতো নিয়মিতভাবে প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থাও নেই।

পুনর্বাসনের সরঞ্জামের সংকটও রয়েছে। পুরোনো হুইলচেয়ার ও অন্যান্য সরঞ্জাম মেরামত করে যতদিন সম্ভব ব্যবহার করা হচ্ছে। লোরাতোর বর্তমান হুইলচেয়ারটি তার শরীরের মাপ অনুযায়ী নয়। এতে তার ব্যথা হয় এবং বাইরে যাতায়াতও সীমিত হয়ে গেছে।

This is how we do it': 30 years of caring for a son with cerebral palsy |  News24

তবু অন্য মায়েদের পাশে দাঁড়ান ডিকোমা

নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাকে ডিকোমা এখন অন্যদের জন্য কাজে লাগাচ্ছেন। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে তিনি গর্ভবতী নারী ও নতুন মায়েদের বোঝান, শিশুর বিকাশে সমস্যা কীভাবে দ্রুত শনাক্ত করা যায়।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান জন্মের পর অনেক মা লজ্জা ও সামাজিক ভয়ের কারণে সন্তানকে ঘরের মধ্যে লুকিয়ে রাখেন। ডিকোমা তাদের বলেন, সন্তানকে লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই।

তার নিজের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে—শিশুকে গ্রহণ করতে হবে, তার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি সক্ষমতাকেও দেখতে হবে এবং তাকে আনন্দের সঙ্গে সমাজের অংশ করে তুলতে হবে।

৩০ বছরের ভালোবাসা

লোরাতোর ভবিষ্যৎ নিয়ে ডিকোমার ভয় আছে। ছেলেকে হারানোর কথা কল্পনাও করতে পারেন না তিনি।

তিন দশক ধরে প্রতিদিনের অসংখ্য কঠিন কাজের মধ্যেও তিনি ছেলের পাশে থেকেছেন। এখন তার প্রয়োজনগুলোও খুব স্পষ্ট—চিকিৎসাকেন্দ্রে যাতায়াতের জন্য পরিবহন, প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছানোর জন্য পুনর্বাসনকর্মীদের যানবাহন, আরও পর্যাপ্ত প্রতিবন্ধী ভাতা, শরীরের উপযোগী হুইলচেয়ার এবং সবচেয়ে মৌলিক একটি প্রয়োজন—বাড়িতে উপযুক্ত শৌচাগার।

এই গল্প শুধু একজন মায়ের নয়। এটি দেখায়, প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনকে সহজ করতে চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ, পরিবহন, অবকাঠামো এবং সরকারি সহায়তা কতটা জরুরি।

ডিকোমার ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, যথাযথ সহায়তা না থাকলেও একজন মা সন্তানের জন্য অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা করতে পারেন। তবে একটি পরিবারের কাঁধে পুরো দায়িত্ব চাপিয়ে না দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকেও সেই দায়িত্বের অংশ নিতে হয়।

সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত সন্তানকে ৩০ বছর ধরে আগলে রাখা মায়ের এই লড়াই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রতিবন্ধকতা কোনো মানুষের মূল্য কমিয়ে দেয় না; প্রয়োজন শুধু তাকে বাঁচার উপযুক্ত সুযোগ করে দেওয়া।